ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

চারদিক

একাত্তরের মুক্তাঞ্চলের শহীদ মিনার

একাত্তরের মুক্তাঞ্চলের শহীদ মিনার
×

এসকে মজিদ মুকুল

প্রকাশ: ২৬ মার্চ ২০২৬ | ০৭:৩৪

| প্রিন্ট সংস্করণ

মুক্তিযুদ্ধকালের প্রবাসী বা অস্থায়ী সরকারের বেসরকারি প্রশাসন শুরু হয়েছিল মুক্তাঞ্চল রৌমারীতে। আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষিত মুক্তাঞ্চলের কেন্দ্রস্থল রৌমারীতে অবস্থিত এই শহীদ মিনার। মুক্তাঞ্চলে প্রশাসনিক কার্যক্রমের শুভ উদ্বোধন করেন তৎকালীন মেজর জিয়াউর রহমান। তিনি এই শহীদ মিনারে নীরবতা পালনের মধ্য দিয়ে রৌমারী ডাকঘর উদ্বোধন করেন। সেদিন শহীদ মিনার, শহীদ স্মৃতি পাঠাগার ক্লাব ও ডাকঘর চত্বরে সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। 

জেড ফোর্সের অধিনায়ক জিয়াউর রহমান বীরউত্তম ডাক বিভাগের পর শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনায় ১০০ জন প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগসহ শিক্ষা কার্যক্রমেরও উদ্বোধন করেন। অতঃপর প্রবাসী সরকারের মন্ত্রী এএইচএম কামারুজ্জামান কর্তৃক কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ সাপেক্ষে রাজস্ব আদায়ের জন্য কাস্টমস অ্যান্ড এক্সাইজ বিভাগ এবং প্রশাসনিক কার্যক্রম শুরু হয় রৌমারী মুক্তাঞ্চল থেকে। অথচ সেই শহীদ মিনারটি অবহেলিত থাকে। সেখানে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষে একটি শহীদ মিনার নির্মাণ করা হয়েছে। অথচ আলোচিত শহীদ মিনারটি সংস্কার-পুনর্নির্মাণ করলেই দুটি ‘ঐতিহাসিক স্মৃতি’ সমুন্নত থাকত। পর্যটকদেরও দৃষ্টি আকর্ষণ করত। 

ভৌগোলিক অবস্থানগত দিক থেকে রৌমারীকেন্দ্রিক মুক্তাঞ্চলের গুরুত্ব সর্বাধিক। একাত্তরে বৃহত্তর রংপুর জেলা ও আংশিক ময়মনসিংহ জেলাধীন অঞ্চলের ব্রহ্মপুত্র নদের পূর্বপার ও ভারতের আসাম সীমান্তঘেঁষা চরাঞ্চল নিয়ে গঠিত মুক্তাঞ্চলটি। এতে অন্তর্ভুক্ত ছিল কুড়িগ্রাম জেলার রৌমারী-রাজীবপুর (সাবেক ইউনিয়ন), উলিপুর ও চিলমারী উপজেলা, গাইবান্ধা জেলা সদর, সুন্দরগঞ্জ ও ফুলছড়ি উপজেলার চরাঞ্চল এবং জামালপুর জেলার দেওয়ানগঞ্জের পুরাতন ব্রহ্মপুত্রের উত্তরপারের চরাঞ্চল। ফলে তিন জেলার মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই যোগাযোগ বিদ্যমান ছিল। 
দ্বিতীয়ত, ব্রহ্মপুত্র নদসহ হলহলি, সোনাভরি, জিঞ্জিরাম এবং আরও কটি শাখা-উপশাখা নদী ও বিশাল চরবিশিষ্ট বৃহৎ মুক্তাঞ্চলে যুদ্ধ শুরু থেকে শেষাবধি এক দিনের জন্যও হানাদার বাহিনীর দখল তো দূরের কথা, ব্রহ্মপুত্রেরই পূর্বপারে নামতে পারেনি। বরং মুক্তাঞ্চল রক্ষায় নিয়োজিত থাকা জেড ফোর্সের অধীন থার্ড বেঙ্গল রেজিমেন্টের বিশেষ কোম্পানি ‘২ এমএফ কোম্পানি’ ও সংযুক্ত বিলুপ্ত ভাসানী বাহিনীর গেরিলা মুক্তিযোদ্ধাদের কৌশলী ফাঁদে পা দিয়ে ভারত সীমানার মুক্তাঞ্চলটি দখলে দিশেহারা হয়ে হানাদার বাহিনী ব্যাপক শক্তি নিয়ে ফাঁদে প্রবেশ করে। সংঘটিত হয় ঐতিহাসিক কোদালকাটি যুদ্ধ। গানবোট ও বিমান থেকে ফায়ারিং সাপোর্টের মধ্য দিয়ে ভোর থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত সময়ে সম্মুখ যুদ্ধে সাড়ে চার শতাধিক পাকিস্তানি সেনা প্রাণ হারায়। দুই দিনব্যাপী লাশগুলো লঞ্চযোগে নিয়ে যায়। এই যুদ্ধে জেড ফোর্সের অধিনায়ক ‘মেজর জিয়া’ ছিলেন ২ এমএফ কোম্পানি কমান্ডার সুবেদার আফতাব আলী আলতাফের সঙ্গে সোনাভরি নদীর পারে। আর রৌমারী মুক্তাঞ্চল ঐতিহাসিক মুক্তাঞ্চল এবং মুক্তাঞ্চল ঘোষণার স্মৃতিবিজড়িত এই ঐতিহাসিক শহীদ মিনার। 

ঐতিহাসিক রৌমারী মুক্তাঞ্চলে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বীরউত্তমের ভূমিকা মূল্যায়ন করা সময়ের দাবি। মুক্তাঞ্চলের প্রথম শহীদ মিনার, স্মৃতিবিজড়িত চাঁদমারিসহ অন্যান্য স্থাপনা যথাযথ সংরক্ষিত হতে হবে ঐতিহাসিক বিবেচনায় বিশেষ প্রকল্পের আওতায়। সেখানকার উন্নয়নের মাধ্যমে মুক্তাঞ্চলবাসীর ত্যাগের স্বীকৃতিও দেওয়া সম্ভব হবে।

এসকে মজিদ মুকুল: মুক্তিযোদ্ধা ও সাংবাদিক 
 

আরও পড়ুন

×