ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

জন্মদিন

সত্যেন সেনের সংগীত

সত্যেন সেনের সংগীত
×

সত্যেন সেন (১৯০৭-১৯৮১)

অমিত রঞ্জন দে

প্রকাশ: ২৮ মার্চ ২০২৬ | ০৬:৫২

| প্রিন্ট সংস্করণ

আমাদের সংস্কৃতিজগতের কিংবদন্তি সত্যেন সেন (১৯০৭-১৯৮১) প্রগতিশীল চিন্তাধারাকে সমাজের তলদেশ পর্যন্ত পৌঁছে দিতে নিরলসভাবে কাজ করেছেন। সংস্কৃতিকে তিনি জীবনের সঙ্গে যুক্ত করেছিলেন, তাই তাঁর কর্মভান্ডার বিশাল ও বহুমাত্রিক। সাহিত্যের বিভিন্ন ধারা শুধু নয়, সংগীতেও তাঁর বিচরণ ছিল অবাধ ও স্বচ্ছন্দ।

তিনি নিজে সুকণ্ঠের অধিকারী ছিলেন এবং একাধারে গান লিখতেন, সুর করতেন ও গাইতেন। গানে ব্যক্ত হয়েছে তাঁর দর্শন, মানবিকতা, লোকমুখিতা ও সংগ্রামী চেতনা।
সত্যেন সেনের ভাবনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল মানুষ। তাই তাঁর গানে বারবার উঠে এসেছে মানুষের অধিকার, মর্যাদা ও সংগ্রামের কথা। তিনি বিশ্বাস করতেন মানুষের জন্যই গান, মানুষের জন্যই শিল্প। তাঁর একটি গানে তিনি লিখেছেন–‘মানুষের কাছে পেয়েছি যে বাণী তাই দিয়ে রচি গান/ মানুষের লাগি ঢেলে দিয়ে যাব মানুষের দেয়া প্রাণ।’

দেশভাগের সময় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার বিরুদ্ধে তিনি মানুষের ঐক্যের ডাক দেন। তাঁর গানে দাঙ্গাবিরোধী বার্তা স্পষ্টভাবে উচ্চারিত হয়েছে। তিনি লিখেছেন, ‘ও যারা দাঙ্গা করে মানুষ মারে/ বুঝে নারে পথের গতি/ ও যারা দাঙ্গা করে/ সে কি কভু চিন্তা করে/ এটাই আমার দেশের ক্ষতি [...]। একইভাবে নারী জাগরণেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। ‘মেয়েরা জাগো জাগো’ গানের মাধ্যমে তিনি নারীকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান এবং সামাজিক কুসংস্কারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে উদ্বুদ্ধ করেন।

তাঁর গানগুলোতে মুক্তির আকাঙ্ক্ষা, সংগ্রামের প্রেরণা এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের সুর স্পষ্ট। একই সঙ্গে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন দুঃখ-কষ্টও তিনি মর্মস্পর্শীভাবে প্রকাশ করেছেন। সে কারণে তিনি জুলুমের জিঞ্জির ভেঙে বেরিয়ে আসার জন্য মুক্তি সেনানীর প্রতি তাঁর আহ্বান জানিয়ে লিখেছেন, ‘আজি সপ্তসাগর ওঠে উচ্ছলিয়া/ [...] মুক্তির সেনানীরা ছুটে আয়/ মৃত্যু ও জীবনের মোহনায়/ জানি পথ দুর্গম 
তবু চল দুর্দম/ মুক্তির রণরোলে ছেয়েছে আকাশ’

ভাষা আন্দোলনের সময়ও তাঁর গান মানুষকে উজ্জীবিত করেছে। একুশে ফেব্রুয়ারির চেতনা তাঁর গানে প্রতিবাদের শক্তি হিসেবে ধ্বনিত হয়েছে। তিনি বিশ্বাস করতেন, জাগ্রত জনগণকে কোনো শক্তিই দমিয়ে রাখতে পারে না। তাই সত্যেন সেন বাহান্নর ভাষা আন্দোলনের প্রস্তুতিপর্বে যখন পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ ঐক্যবদ্ধ হচ্ছে সে সময় লিখলেন, “আগুন নিভাইবো কেরে/ [...]আগুন নিভে নিভে নিভে না/ [...] তোমার ঐ জঙ্গী আইন চলবে ক’দিন যতই করো জারি/ ঘরে ঘরে ডাক পাঠাই একুশে ফেব্রুয়ারি।”
কারাজীবনেও তিনি গানকে সঙ্গী করেছিলেন। কয়েদিদের জন্য গান লিখে তিনি তাদের মনোবল বাড়াতেন। নিজেও জীবনের একটা বড় সময় কাটিয়েছেন কারাগারের অন্তরালে। সেখানকার দুঃখ বেদনা সরিয়ে তিনি কয়েদিদের গান গেয়ে মাতিয়ে রাখতেন। কয়েদিদের জন্য তিনি একটি বিশেষ গান লিখেছিলেন। গানটি হলো–‘পায়খানাতে যাই জলভরে খাই/এই ঘটিতে সব চলে/জেলখানাতে দুঃখ আছে কে বলে?’

একইভাবে আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটেও তিনি সচেতন ছিলেন। সমাজতান্ত্রিক বিভাজনের সময় তিনি ঐক্যের আহ্বান জানিয়ে গান রচনা করেন– ‘ও আমার দেশের ভাইরে আমার মিনতি শোনো শোনো/ শোনোরে ভাই দেশের মানুষ মুখ তুলিয়া চাও/ ঘরের ইন্দুর বাঁধ কাটে ভাই দেখতে কি না পাও।’ এমনি করে সমাজের সর্বস্তরের অসংগতিগুলো তাঁর গানের মধ্যে ধরা পড়েছে।
সত্যেন সেনের গণসংগীতে ভাষার বৈচিত্র্য লক্ষণীয়। কখনও তিনি প্রমিত ভাষা ব্যবহার করেছেন, কখনও লোকভাষা। তাঁর গানে রবীন্দ্রপ্রভাবও দেখা যায়। তবে সবকিছুর মধ্যেই তাঁর নিজস্ব স্বকীয়তা স্পষ্ট।
সার্বিকভাবে, সত্যেন সেন ছিলেন মুক্তিপথের এক নিরলস অভিযাত্রী। তাঁর গান শুধু অতীতের দলিল নয়, আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। তাঁর সব গান যদি সংরক্ষিত থাকত, তবে আমাদের সাংস্কৃতিক ভান্ডার আরও সমৃদ্ধ হতো। তবুও যে গানগুলো আছে, সেগুলোর আলোয় আমরা এগিয়ে যেতে পারি এবং প্রগতির সংগ্রামকে আরও শক্তিশালী করতে পারি।

অমিত রঞ্জন দে: সাধারণ 
সম্পাদক, উদীচী

আরও পড়ুন

×