চারদিক
ম্যানগ্রোভ নার্সারির সুফল
বিভূতি ভূষণ মিত্র
প্রকাশ: ৩০ মার্চ ২০২৬ | ১০:২৬
সম্প্রতি দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় জেলা সাতক্ষীরা ও খুলনার চারটি উপজেলায় দুর্যোগ মোকাবিলায় গাছপালা ও বনভূমি বাড়াতে ম্যানগ্রোভ প্রজাতির উদ্ভিদের নার্সারির উদ্যোগ আমরা দেখেছি। এসব নার্সারিতে উৎপাদিত হবে কেওড়া, কাঁকড়া, গেওয়ার মতো লবণাক্ততা সহনশীল সুন্দরবনের উদ্ভিদ।
ম্যানগ্রোভ নার্সারি বলতে এমন নার্সারি বোঝায়, যেখানে নিয়ন্ত্রিত পরিবেশ জোয়ার-ভাটা অঞ্চলের লবণাক্ততা সহনশীল গাছের চারা তৈরি করা হয়। এ ধরনের নার্সারি উপকূলীয় এলাকায় বনভূমি বাড়াতে ও হারিয়ে যাওয়া বনভূমি ফিরিয়ে আনতে চারা জোগান দেবে। এই চারার মাধ্যমে তৈরি করা হবে সবুজ বেষ্টনী। এর ফলে জীববৈচিত্র্য যেমন রক্ষা পাবে, তেমনি এলাকার মানুষ বিশেষ করে নারীদের জন্য তৈরি হবে আরও একটি কর্মসংস্থানের।
আমাদের দেশের অন্যান্য বাস্তুতন্ত্র থেকে ম্যানগ্রোভ বাস্তুতন্ত্র আলাদা। কেননা, এরা সমুদ্রের উপকূলবর্তী। লবণাক্ত পরিবেশে এই গাছগুলো বড় হয়। ম্যানগ্রোভ বাস্তুতন্ত্রে শতাধিক গাছ দেখা যায়। এসব গাছের মধ্যে ২৮টি উদ্ভিদকে সম্পূর্ণ ম্যানগ্রোভ বলা হয়। এখানকার উল্লেখযোগ্য গাছ– সুন্দরী, গরান, গেওয়া, কেওড়া, গোলপাতা ইত্যাদি। এসব গাছে বিশেষ ধরনের ঠেস মূল দেখা যায়। এর মাধ্যমে গাছ ঠেস দিয়ে দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে পারে। এদের এক ধরনের শ্বাসমূল থাকে। অর্থাৎ এদের মূলগুলো জলের ওপরে উঠে থাকে। সেসব মূলে নিউম্যাটাফোর নামের ছিদ্র থাকে। এটি দিয়েই গাছ শ্বাস নেয়। এ ধরনের গাছের আরও একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো এদের বীজে জরায়ুজ অঙ্কুরোদ্গম দেখা যায়। সাধারণত বীজ মাটিতে পড়েই অঙ্কুরোদ্গম হওয়ার কথা। কিন্তু এদের ক্ষেত্রে মাটিতে পড়ার আগেই অর্থাৎ ফলের মধ্যেই অঙ্কুরিত হয়। এদের জরায়ুজ অঙ্কুরোদ্গম বলা হয়।
বাংলাদেশের সুন্দরবন বিশ্বের একক বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন। এর আয়তন প্রায় ১০ হাজার বর্গ কিলোমিটার, যা মোট আয়তনের ৪.০৭ ভাগ ম্যানগ্রোভ বন। এসব বনের অধিকাংশ এলাকায় জোয়ার-ভাটা হয়। ফলে এ বনের গাছপালা বেশ লবণাক্ততা সহনশীল হয়ে থাকে। সুন্দরী, গেওয়া, গরান, বাইন, ধুন্দুল, কেওড়া, গোলপাতা এসব বনের প্রধান বৃক্ষ। এ ছাড়া এখানকার উল্লেখযোগ্য বন্যপ্রাণী হলো রয়েল বেঙ্গল টাইগার, চিত্রা হরিণ, বানর ইত্যাদি। সুন্দরবনে ২৮৯ প্রজাতির স্থলজ প্রাণীর বসবাস।
উপকূলবর্তী হওয়ায় এই বনটি সমুদ্র দ্বারা প্রভাবিত। সৈকত, মোহনা, জলাভূমি, মাটি প্রকৃতির কারণে এটি একটি স্বতন্ত্র বাস্তুতন্ত্র গঠন করেছে। এর ওপর জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব রয়েছে। ইউনেস্কোর প্রতিবেদন অনুযায়ী সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে সুন্দরবনের ৭৫ শতাংশ ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। বিভিন্ন সময়ে আইলা, আম্ফান ও ইয়াসের মতো ঘূর্ণিঝড়ের কারণে সুন্দরবন ক্ষতিগ্রস্ত। ঘূর্ণিঝড়ের ফলে বনে লবণাক্ত পানি প্রবেশ করে। মিষ্টিপানির প্রবাহ কমে যায়। এতে সুন্দরবনের প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যায়। ফলে সুন্দরী, কেওড়া, গোলপাতাসহ বিভিন্ন গাছ মারা যায়। কিছুদিন আগে ঘূর্ণিঝড় রিমালের কারণে সুন্দরবনের অনেক জায়গা ক্ষতিগ্রস্ত। উপকূলীয় এসব এলাকার প্রাকৃতিক দুর্যোগ ঠেকানোর একটি উপায় হচ্ছে ম্যানগ্রোভ উদ্ভিদ রোপণ।
ম্যানগ্রোভ নার্সারি থেকে ম্যানগ্রোভ প্রজাতির বিভিন্ন চারা এখন উপকূলীয় এলাকায় রোপণ করা হচ্ছে। সেখানকার বন্যাকবলিত বেড়িবাঁধ ঘেঁষে ম্যানগ্রোভ গাছ লাগানোর ফলে সৃষ্টি হয়েছে মিনি সুন্দরবন। এতে সামুদ্রিক এলাকার বাস্তুসংস্থান ফিরে এসেছে। নার্সারির চারা উৎপাদন করে একটি নতুন আয়ের পথ পেয়েছেন স্থানীয়রা। এতে নতুন কর্মসংস্থান হচ্ছে। নারীরাও যুক্ত হচ্ছেন এই পেশায়। পাশাপাশি গরুর খাদ্য পাওয়া যাচ্ছে এসব থেকে। হাঁস-মুরগি ও পশুপালন করতে পারছেন।
ম্যানগ্রোভ নার্সারির মাধ্যমে এভাবে স্থানীয় ম্যানগ্রোভ উদ্ভিদ রোপণ করা হলে সুন্দরবন আরও সুন্দর হয়ে উঠবে। ফিরে পাবে তার হারানো যৌবন।
ড. বিভূতি ভূষণ মিত্র: পরিবেশবিষয়ক লেখক
- বিষয় :
- চারদিক
