ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

চারদিক

ফসল রক্ষার বাঁধ, না ফসলহানির ফাঁদ

ফসল রক্ষার বাঁধ, না ফসলহানির ফাঁদ
×

রাসেল আহমদ

প্রকাশ: ০৫ এপ্রিল ২০২৬ | ০৬:৫২

| প্রিন্ট সংস্করণ

দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের হাওর আবারও এক দুঃস্বপ্নের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে। টানা বৃষ্টি, উজানের ঢল এবং নদীর পানির অস্বাভাবিক আচরণ মিলিয়ে কৃষকের চোখের সামনে ডুবে যাচ্ছে বোরো ধানের সোনালি স্বপ্ন। অথচ আর মাত্র দুই সপ্তাহ পরই যেসব ক্ষেত থেকে ধান ঘরে ওঠার কথা ছিল, সেখানে এখন কোথাও কোমরসমান, কোথাও বুকসমান পানি। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের হিসাব বলছে, এ পর্যন্ত জেলার ১২ উপজেলায় এক হাজার ১৮৯ হেক্টর জমি ডুবে গেছে। এ পরিস্থিতিতে প্রশাসন থেকে পানি নিষ্কাশন কিংবা হাওর রক্ষায় কার্যকর তেমন উদ্যোগ নেই (দৈনিক সমকাল, ১ এপ্রিল ২০২৬)।
কৃষকদের দাবি, বাস্তবে ক্ষতির পরিমাণ আরও বড়। কারণ অনেক ক্ষেত্রেই পানির নিচে থাকা ধানের প্রকৃত ক্ষতি ধরা পড়ে পরে; যখন দেখা যায় শীষ পচে গেছে, দানা নষ্ট হয়ে গেছে কিংবা ফলন অর্ধেকে নেমে এসেছে। এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি আবার সামনে এসেছে– হাওরের ফসল রক্ষা বাঁধ কি সত্যিই ফসল রক্ষা করছে, নাকি উল্টো ফসলহানির ফাঁদে পরিণত হচ্ছে?

২০১৭ সালের ভয়াবহ বন্যার পর হাওর রক্ষার নামে যে প্রবণতা শুরু হয়েছে, প্রতিবছর আরও উঁচু ও দীর্ঘ বাঁধ নির্মাণ, তা বাস্তবে কতটা কার্যকর– সে প্রশ্ন আজ নতুন করে সামনে এসেছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) প্রতিবছর প্রকল্প কাগজ-কলমে এসব খাল পুনর্খনন ও সংস্কারের জন্য বাজেট দেখালেও বাস্তব চিত্র ভিন্ন। স্থানীয়দের অভিজ্ঞতা বলছে, গত এক থেকে দেড় দশকে এই খালগুলোর ন্যূনতম রক্ষণাবেক্ষণও হয়নি। ফলে খালগুলোর গভীরতা ও প্রবাহক্ষমতা ক্রমেই কমে গেছে, যা এখনকার জলাবদ্ধতাকে আরও দীর্ঘস্থায়ী ও তীব্র করে তুলেছে।

এবারের পরিস্থিতি তাই কেবল প্রাকৃতিক দুর্যোগের ফল নয়। এটি দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা, অবহেলা ও অপরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণের একটি যৌথ পরিণতি। হাওরের জলাবদ্ধতা এখন আর সাময়িক সমস্যা নয়। এটি এক কাঠামোগত সংকটে রূপ নিয়েছে, যা মোকাবিলায় প্রয়োজন মৌলিক নীতি পরিবর্তন, বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনা এবং কঠোর জবাবদিহি।

হাওরের কৃষকদের জন্য বোরো ধানই একমাত্র প্রধান ফসল। এই একটি মৌসুমের ওপরই নির্ভর করে তাদের পুরো বছরের জীবনযাপন। সেই ফসল যখন পানিতে ডুবে যায়, তখন তা শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতি নয়, একটি পরিবারের অস্তিত্বের সংকট হয়ে দাঁড়ায়। অনেকেই ঋণ নিয়ে চাষ করেছেন। গত বছরের ঋণ শোধ না করতেই এবার নতুন ঋণের বোঝা মাথায় চাপছে। এই পরিস্থিতিতে কৃষকদের সামনে কখনও কখনও একমাত্র পথ– বাঁধ কেটে দেওয়া। কারণ পানি আটকে থাকলে ফসল নিশ্চিতভাবে নষ্ট হবে। বাঁধ কেটে দিলে অন্তত পানি দ্রুত নামার সুযোগ তৈরি হয়। কিন্তু এই সিদ্ধান্ত আবার অন্য এলাকার জন্য হঠাৎ বন্যার ঝুঁকি তৈরি করে।

এ জন্য কিছু মৌলিক পরিবর্তন জরুরি। বাঁধ নির্মাণে বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনা নিশ্চিত করতে হবে। কোথায় বাঁধ প্রয়োজন, কোথায় নয়– তা নির্ধারণে হাইড্রোলজিক্যাল বিশ্লেষণ বাধ্যতামূলক করা উচিত। দ্বিতীয়ত, খাল ও প্রাকৃতিক পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থাকে পুনরুদ্ধার করতে হবে। নিয়মিত খনন ও রক্ষণাবেক্ষণ ছাড়া হাওরের জলাবদ্ধতা কখনও কমবে না। তৃতীয়ত, স্লুইসগেট ও পানি নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাকে আধুনিক ও কার্যকর করতে হবে। শুধু বাঁধ দিয়ে পানি আটকে রাখা সমাধান নয়। নিয়ন্ত্রিত প্রবাহ নিশ্চিত করাই মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত। চতুর্থত, প্রকল্প বাস্তবায়নে কঠোর জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। কাগজে বাজেট দেখিয়ে বাস্তবে কাজ না করার সংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে।

স্থানীয় কৃষকদের পরিকল্পনা প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ত করতে হবে। তাদের অভিজ্ঞতাই হতে পারে সবচেয়ে কার্যকর দিকনির্দেশনা। হাওরের ফসল রক্ষা বাঁধ আজ এক কঠিন বাস্তবতার প্রতীক। এটি যেমন কৃষকের আশা, তেমনি অনেক ক্ষেত্রে তাদের হতাশারও কারণ। প্রশ্নটি তাই বাঁধ থাকবে কি থাকবে না– এখানে সীমাবদ্ধ নয়। প্রশ্নটি হলো, আমরা কীভাবে হাওরকে বুঝছি; কীভাবে পরিকল্পনা করছি এবং কার স্বার্থকে প্রাধান্য দিচ্ছি। 

রাসেল আহমদ: সাংবাদিক 
[email protected]

আরও পড়ুন

×