ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

আইন-আদালত

‘অ্যাটর্নি অ্যাট লার্জ’ হয়ে ওঠার চ্যালেঞ্জ 

‘অ্যাটর্নি অ্যাট লার্জ’ হয়ে ওঠার চ্যালেঞ্জ 
×

এম এম খালেকুজ্জামান

এম এম খালেকুজ্জামান

প্রকাশ: ০৬ এপ্রিল ২০২৬ | ০৮:৩১

অন বিহাফ অব স্টেট বা রাষ্ট্রের পক্ষে, মানে সবার পক্ষে। যেহেতু দেশ-জনতা নিয়েই রাষ্ট্র। রাষ্ট্রকে প্রতিনিধিত্ব করা মানে সবাইকে প্রতিনিধিত্ব করা। কিন্তু লিগ্যাল আয়রনি হচ্ছে, রাষ্ট্রকে প্রতিনিধিত্ব করতে গেলে সেই রাষ্ট্রের ইনডিভিজুয়ালের (ব্যক্তি  বা নাগরিক) বিপক্ষে বা বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হয় কখনও কখনও অ্যাটর্নি জেনারেলকে।

কারণ, আমাদের রাষ্ট্র কখনও কখনও ব্যক্তি বা নাগরিকের বিরুদ্ধে অযাচিত এবং অধিকার লঙ্ঘনকারক নানা পদক্ষেপ নেয়। এতে  নাগরিক সংক্ষুব্ধতার কারণ দেখা দেয়। রাষ্ট্র না হলেও রাষ্ট্রের প্রতিনিধি হিসেবে রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংস্থা অহরহ নাগরিক অধিকার পদদলিত করে। অধিকার লঙ্ঘনের প্রতিকার চেয়ে উচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হন নাগরিক। তার বিপক্ষে রাষ্ট্রকে প্রতিনিধিত্ব করে অ্যাটর্নি জেনারেল অফিস। আর রাষ্ট্রকে প্রতিনিধিত্ব করতে গিয়ে রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা  হিসেবে অ্যাটর্নি জেনারেলকে অনেক সময় আদালতে সমষ্টির (নাগরিক) বিপক্ষে দাঁড়াতে হয়। সওয়াল করতে হয় রাষ্ট্রের হয়ে। সেই অর্থে রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা অনেক আইনজীবীর ক্ষণিক বিপক্ষ অবলম্বনকারী। কিন্তু আইন পেশার অন্তর্গত সৌন্দর্য মেনে কোর্ট রুমের বাইরে সেই তারাই (অ্যাটর্নি জেনারেল ও অধিকার বিঘ্নিত নাগরিকের আইনজীবী) আবার বিজ্ঞ বন্ধু সমুদয়। নতুন অ্যাটর্নি জেনারেল প্রকৃত অ্যাটর্নি অ্যাট লার্জ হবেন– এমন প্রত্যাশা সব আইনজীবীর।

দেশের ১৮তম অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে নিয়োগ পেলেন সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল। তিনি বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য ও জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। তিনি সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সম্পাদক ছিলেন। এ ছাড়া বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের সদস্য নির্বাচিত হয়ে এক্সিকিউটিভ কমিটির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। তাঁর তিন দশকের বেশি দীর্ঘ ক্যারিয়ারে সংবিধানের ত্রয়োদশ ও পঞ্চদশ সংশোধনী চ্যালেঞ্জ করে দাখিল করা মামলায় তিনি প্রতিনিধিত্ব করেন। তাঁর অসাধারণ আইনি ও সাংবিধানিক যুক্তি সিদ্ধান্ত গ্রহণে আদালতকে দারুণ সাহায্য করেছে।

আইনজীবী হিসেবে মামলা পরিচালনার ক্ষেত্রে ক্লায়েন্টের স্বার্থকে সর্বোচ্চ নিষ্ঠার সঙ্গে রক্ষা করতেন। বিচারসেবা প্রাপ্তিতে দুর্নীতি ও অনিয়ম বিষয়ে তিনি  উচ্চকণ্ঠ। সততা ও নিষ্ঠার ঘাটতির বিষয়ে তিনি দল ও মতের ঊর্ধ্বে তাঁর অবস্থানের কথা বলতে দ্বিধা করেননি কখনও।

তিনি নিজে জ্ঞানানুরাগী এবং প্র‍্যাক্টিসিং জুনিয়র আইনজীবীদের সবসময় আইন অনুরাগী হতে উৎসাহ দেন। সম্পাদক থাকাকালীন প্রাজ্ঞ বিচারপতি ও অভিজ্ঞ সিনিয়র আইনজীবীদের তত্ত্বাবধানে আইন-আদালত প্রসিডিং সংক্রান্ত নানা সেশনের আয়োজন করেছেন।

ওয়াটারগেট ও নিক্সন প্রায় সমার্থক। কিন্তু অনেকেই ভুলে যান এ মামলায় অ্যাটর্নি জেনারেলের ভূমিকার কথা। এই বিচার প্রক্রিয়ায় অ্যাটর্নি জেনারেল এলিয়ট রিচার্ডসন প্রসিকিউটর হিসেবে আর্চিবাল্ড কক্সকে নিয়োগ দেন। মামলার তদন্তকাজের অংশ হিসেবে নিক্সনের কাছে ১৯৭২ সালের নির্বাচন-পূর্ববর্তী সব টেপ চান কক্স। নিক্সন টেপ দিতে বাধ্য হন, সেই সঙ্গে প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে কক্সের বরখাস্তের নির্দেশ জারি করেন। কিন্তু এর প্রতিবাদে ওই রাতেই অ্যাটর্নি জেনারেল এলিয়ট রিচার্ডসন স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেন। আমেরিকান মিডিয়া অ্যাটর্নি জেনারেলসহ বেশ কয়েকজনের পদত্যাগের ঘটনাকে নাম দেয় ‘স্যাটারডে নাইট ম্যাসাকার’ হিসেবে। পদ রক্ষার ওজরে শাসনতন্ত্র রক্ষার পবিত্র দায়িত্ব পালনে সূচ্যগ্র ছাড় না দেওয়ার নজির যেমন আছে, এর অন্যতর উদাহরণও আছে। সংস্কৃতিগত কারণে আমাদের দেশের ক্ষেত্রে এমন ঘটনা খুব দেখা যায় না।

অ্যাটর্নি জেনারেলের কাজ সুনির্দিষ্ট। একজন আইন উপদেষ্টা হিসেবে আমার ভূমিকা হলো প্রণীত আইনগুলোর সাংবিধানিক বৈধতা রক্ষা করা।– জেফ্রি চেইসা।

অনেকে মনে করেন, নিউ জার্সির অ্যাটর্নি জেনারেল জেফ্রি চেইসা যেভাবে বলেছেন, অনেকটা তেমনই ছকে বাঁধা দায়িত্ব পালন করে থাকেন বাংলাদেশের অ্যাটর্নি জেনারেলরা।

রাজনৈতিক বিবেচনার অ্যাটর্নি জেনারেলরা আদালত নির্বিশেষে তাদের সার্বত্রিক অতন্দ্র উপস্থিতি নিশ্চিত করে নিজেদের প্রমাণ করতে সচেষ্ট ট্রাস্টেড অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে। তবে সেটাই শেষ কথা নয়। সংবিধানের অভিপ্রায় অনুযায়ী বিচার বিভাগ জনগণের স্বাধীনতা, সংবিধানের সার্বভৌমত্ব ও মর্যাদা সমুন্নত রাখার দায়িত্বও পালন করার জন্য দায়বদ্ধ।

এ কথা সত্য, অ্যাটর্নি জেনারেল একটি রাজনৈতিক নিয়োগ। যেহেতু রাজনৈতিক দল সরকার গঠন করে, তাই অ্যাটর্নি জেনারেলকে সরকার ও দলের রাজনৈতিক দর্শন সামনে রেখে আদালতে দায়িত্ব পালন করতে হয়। জুলাই সনদ ছাড়াও সাংবিধানিক নানা বিতর্কিত বিষয় তাঁকে আদালতে সামাল দিতে হবে।

জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে রাষ্ট্রপতির আদেশ কি অসাংবিধানিক– এই মর্মে কিছুদিন আগে প্রথম আলোতে তিনি যে অভিমত বিশ্লেষণ করেছেন, তার উপসংহার... রাষ্ট্রপতি সাংবিধানিক কাঠামোতে জাতীয় সংসদ কর্তৃক নির্বাচিত। অর্থাৎ রাষ্ট্রপতি নিজেও সংবিধানের ঊর্ধ্বে নন। সুতরাং রাষ্ট্রপতি কর্তৃক জারিকৃত ২০২৫ সালের ১ নম্বর আদেশ রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক ক্ষমতাবহির্ভূত। (সূত্র-প্রথম আলো ১৭-০৩-২০২৬)। অ্যাটর্নি জেনারেলের শাস্ত্রীয় সাংবিধানিকতার প্রতীতি প্রণিধানযোগ্য।

সাংবিধানিক নানা অনুচ্ছেদের ব্যবচ্ছেদে তাঁর অবস্থান সাংবিধানিক সর্বোচ্চতা বা কনস্টিটিউশনাল সুপ্রিমেসির প্রতিই প্রতীয়মান।

বাংলাদেশের অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে সাংবিধানিক ধ্রুপদি ধারাকে তিনি সমুন্নত রাখবেন– এমনটাই প্রত্যাশা। কারণ চব্বিশের পরে সংবিধান কোনো কোনো রাজনৈতিক দলের বালখিল্য বিরোধিতার সম্মুখীন হয়েছে।

কেবল সরকারের না হয়ে সদর্থক অর্থে অ্যাটর্নি অ্যাট লার্জ হয়ে ওঠার রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বাতাবরণ সৃষ্টি করাই বরং কঠিন এক চ্যালেঞ্জ নতুন অ্যাটর্নি জেনারেলের সামনে। 

এম এম খালেকুজ্জামান: আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট

আরও পড়ুন

×