ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

সনদ যাচাই বিড়ম্বনা এবং প্রতিবাদী কর্মসূচি ব্যবচ্ছেদ

সনদ যাচাই বিড়ম্বনা এবং প্রতিবাদী কর্মসূচি ব্যবচ্ছেদ
×

মাহফুজুর রহমান মানিক

প্রকাশ: ০৮ এপ্রিল ২০২৬ | ০৬:৫৮

| প্রিন্ট সংস্করণ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা মঙ্গলবার এক অভিনব কর্মসূচি পালন করেছেন। প্রতিবাদ কর্মসূচি হলেও বিষয়টি শিক্ষণীয়; বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রশাসনিক ভবনের কর্মকর্তাদের ইমেইল যাচাই বা ভেরিফিকেশন এবং ফোনে কথা বলা-বিষয়ক প্রশিক্ষণ। ভেরিফিকেশন জটিলতায় সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই শিক্ষার্থীর বিদেশে উচ্চশিক্ষার সুযোগ হাতছাড়া হওয়ার প্রেক্ষাপটেই শিক্ষার্থীদের মঙ্গলবারের এ কর্মসূচি। সম্প্রতি দুই শিক্ষার্থীর দেশের বাইরে ভর্তির বিষয়টি সংবাদমাধ্যমে আসে এবং সামাজিক মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনও তাদের বক্তব্য দিয়েছে। 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার ভবনে শিক্ষার্থীদের সনদ সংক্রান্ত কাজ হয়। পরীক্ষাসহ প্রশাসনিক সব কাজ এ ভবনেই হয়ে থাকে। সেখানে গিয়ে ভোগান্তির শিকার হন অনেকেই। বিশেষ করে বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য ট্রান্সক্রিপ্ট তুলতে ও সনদ যাচাইয়ে বেশি সমস্যায় পড়তে হয়। বিশ্ববিদ্যালয়টির সাবেক শিক্ষার্থী হিসেবে এবং বিভিন্ন সময়ে এ সংক্রান্ত খবর সংবাদমাধ্যমে আসার কারণেও সেখানকার পরিস্থিতি জানার সুযোগ হয়েছে। সেখান থেকে সেবা নিয়েছেন অথচ ‘লাঞ্চের পরে আসেন’– এ কথা শোনেননি, এমন কাউকে হয়তো পাওয়া যাবে না।

যদিও কয়েক বছর ধরে রেজিস্ট্রার ভবনের সেবাগুলো অনলাইনে চলছে, তারপরও কিছু জটিলতা রয়ে গেছে। এক দশক আগে আমরা দেখেছি, রেজিস্ট্রার ভবনের সেবার জন্য যে চার্জ নেওয়া হতো, তা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই টিএসএসিতে গিয়ে জনতা ব্যাংকে জমা দিতে হতো। অথচ ভবনটির নিচতলাতেই সোনালী ব্যাংকের শাখা রয়েছে। এখন অনলাইনে টাকা জমা দেওয়া গেলেও শিক্ষার্থীকে আবার আবাসিক হলে যেতে হয় প্রভোস্টের স্বাক্ষরের জন্য। অনাবাসিক শিক্ষার্থী বিশেষ করে ছাত্রীদের জন্য এটি এক বিড়ম্বনা। স্বাক্ষরের জন্য হলে দুবার যাওয়ার চেয়ে পুরো প্রক্রিয়াই অনলাইনে করা যেতে পারে।  
যা হোক, সনদ যাচাইয়ের সাম্প্রতিক ঘটনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ৫ এপ্রিল যে বক্তব্য দিয়েছে, তার মূল কথা হলো, ইউরোপ-আমেরিকাসহ বিভিন্ন দেশের বিশ্ববিদ্যালয় মধ্যস্থতাকারী তৃতীয় প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার সনদ যাচাই করে। সেই প্রতিষ্ঠানগুলোই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে ইমেইল করে। প্রশাসন স্বীকার করেছে, তারা ৪ মার্চ একজন শিক্ষার্থীর সনদ ভেরিফিকেশনের অনুরোধ সুইডেন থেকে ইমেইলে পেয়েছে। কিন্তু নির্দিষ্ট ফি না পাওয়ায় তারা প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করেনি। প্রশ্ন হলো, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ কি বিষয়টি শিক্ষার্থীকে জানিয়েছে? শেষ পর্যন্ত সুইডেনের বিশ্ববিদ্যালয় ভেরিফিকেশন করতে না পারায় ওই শিক্ষার্থী ভর্তির জন্য বিবেচিত হননি। অথচ একটি সংবাদমাধ্যমে তিনি জানিয়েছেন, সুইডেনে ভর্তির কাগজপত্র প্রস্তুত করতে কীভাবে রেজিস্ট্রার ভবনে বারবার ধরনা দিতে হয়েছে। কাগজপত্র পাঠিয়েছেন, অনলাইন সাক্ষাৎকার দিয়েছেন। শেষ পর্যন্ত ভেরিফিকেশনে এসে আটকে গেছে, যার দায় রেজিস্ট্রার ভবন এড়াতে পারে না। 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বিশ্বব্যাপী কেবল পড়াশোনাই করছেন না; বিশ্বের নামিদামি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতাও করছেন। বিশ্ববিদ্যালয়টির সনদ নিয়ে জালিয়াতি হতে পারে বলেই বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলো যাচাই করে নিশ্চিত হতে চায়। এ নিশ্চিতকরণের বিষয়টি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চাইলেই বিনামূল্যে করতে পারে। এ বিষয়ে ২০১৫ সালের সিনেটের মিটিংয়ে ৫০ ডলার নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে বটে, এখন চাইলে সিনেট শিক্ষার্থীদের স্বার্থে ফি বাতিল করতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয়ের অফিসিয়াল ইমেইল গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে সংবেদনশীল কারও এটি পরিচালনা করা উচিত। মনে রাখতে হবে, বিদেশে উচ্চশিক্ষা লাভ করা খুব সহজ নয়। সব প্রক্রিয়া শেষ করে যদি এমন ভেরিফিকেশনের জন্য সে সুযোগ আটকে যায়, তার চেয়ে বেদনাদায়ক আর কী হতে পারে!

রেজিস্ট্রার ভবনের দায়িত্বপ্রাপ্তদের শিক্ষার্থীদের প্রতি আন্তরিক হওয়ার বিকল্প নেই। এটি কেবল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্যই না; সব বিশ্ববিদ্যালয় ও উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের উচিত শিক্ষার্থীদের সনদ, উচ্চশিক্ষাসহ তাদের সকল বিষয়ে স্বতঃস্ফূর্তভাবে সহযোগিতা করা। সরকারি অফিসের মতো আচরণ কিংবা আমলাতান্ত্রিক জটিলতা অন্তত বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন থেকে কেউই প্রত্যাশা করেন না। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উত্তীর্ণ হওয়ার পর শিক্ষার্থীরা কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করেন। চাকরির বাজারে অনিশ্চয়তা, সরকারি চাকরিতে প্রবল প্রতিযোগিতায় কর্মসংস্থান নিয়ে চিন্তায় থাকেন অধিকাংশ শিক্ষার্থী। পাশাপাশি অনেক শিক্ষার্থী দেশের বাইরে উচ্চশিক্ষার জন্য চেষ্টা করেন। এ সময়টায় তাদের এক ধরনের সহানুভূতি দরকার। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সহযোগিতামূলক আচরণ পেলে তারা সংকটকালেও কিছুটা স্বস্তি পেতে পারেন। আর সব প্রক্রিয়াও শিক্ষার্থীবান্ধব হওয়া জরুরি। সে জন্য রেজিস্ট্রার ভবনের কর্মকর্তাদের ইমেইল যাচাই বা ভেরিফিকেশন এবং ফোনে কথা বলা-বিষয়ক প্রশিক্ষণ আসলে শিক্ষার্থীদের প্রতীকী কর্মসূচি। এই কর্মসূচির ইমেইল পরিচালনার সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষার্থীদের প্রতি সহানুভূতিশীল থাকা উচিত, যাতে একজন কর্মকর্তা ইমেইল পেয়ে ফি দেননি বলে বসে না থেকে অন্তত শিক্ষার্থীকে জানানোর গরজ অনুভব করেন।

মাহফুজুর রহমান মানিক: জ্যেষ্ঠ সহসম্পাদক, সমকাল
[email protected]
 

আরও পড়ুন

×