জন্মদিন
ড. কামাল হোসেন এবং সংশপ্তক সংবিধান
ড. কামাল হোসেন
এম এম খালেকুজ্জামান
প্রকাশ: ২০ এপ্রিল ২০২৬ | ১১:০৮
ড. কামাল হোসেন, বাংলার মানুষের কাছে কিংবা বনেদি কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের সেমিনারে পরিচিত নাম। তিনি এই বাংলার ভূমিপুত্র। এই জাতীয়তাকে তিনি লালন করেন। ড. কামাল হোসেনের মতো মেধাবী ও প্রাজ্ঞ হলে পুরো পৃথিবী তাঁকে নিতে প্রস্তুত।
২.
অর্ধশতকের বেশি কাল পরিক্রমায় বাংলাদেশের সংবিধানের অনুশীলন খুব গভীরতা পায়নি। পেয়েছে কিছু কায়েমি কৌটিল্যসুলভ সাংবিধানিক রেফারেন্স। এই সময়ে সংবিধান অনুশীলনের দুটি মুখ্য ধরনকে শনাক্ত করা যায়। যার একটি তুলনীয় হতে পারে প্রবাহিত নদীর ওপর সেতুতে অবস্থান নিয়ে স্রোত সমীক্ষা করা (পানিতে না নেমে)। অন্য ধরনটি, সতত সঞ্চরণশীল নদীতে স্রোতের বিপরীতে নৌযান চালানো (সারেং)।
প্রথমটি মূলত বিদ্যায়তনিক পরিসরে চালিয়ে যাচ্ছেন আইন ও সংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে কাজ করা শিক্ষক ও গবেষকগণ। আর দ্বিতীয়টি করে থাকেন বিচারকগণের পৌরোহিত্যে আইনজীবী তথা ব্যবহারজীবীগণ মূলত আদালতে আইনচর্চার মাধ্যমে। ড. কামাল হোসেন বিস্ময়কর সাফল্য নিয়ে এই দুই ধরনের সংবিধানচর্চা করে গেছেন; দেশি-বিদেশি নামজাদা সব ল স্কুলে আর বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট ছাড়াও দুনিয়ায় নানা প্রান্তের বিভিন্ন এক্তিয়ারের আদালতে, কোনো রাষ্ট্রীয় সীমাবদ্ধতা না মেনে।
৩.
সংবিধান প্রণয়ন-পরবর্তী সময় থেকেই এই রাষ্ট্র পরিচালনার ম্যানুয়াল নিয়ে বালখিল্যতা চলে এসেছে; এক আলোচনায় বলেছিলেন সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. কাজী জাহেদ ইকবাল। এ দেশে সংবিধান স্থগিত করা হয়েছিল একাধিকবার। ২০ আগস্ট ১৯৭৫ থেকে ১৯৭৯ সালের ৯ এপ্রিল অর্থাৎ প্রায় চার বছর এবং ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ থেকে ১৯৮৬ সালের ১০ নভেম্বর পর্যন্ত অর্থাৎ সাড়ে চার বছর; এক অর্থে এই আট বছর সংবিধান স্থগিত ছিল। এইচএম এরশাদই একমাত্র শাসক, যিনি সংবিধানকে ইচ্ছামতো বিতর্কিত করে আবার একেই ভিত্তি করে নিজের বৈধতা অর্জন করতে চেয়েছেন। সে সময়ে সংবিধানের এত পরিবর্তন করা হয়েছে যে, সংবিধানের মূল চরিত্রই পাল্টে গেছে।
৪.
বাংলাদেশের সংবিধান পূর্ণাঙ্গ শাসনতন্ত্র, যেটি নিয়ে অ্যান্থনি মাসকারেনহাস তাঁর আলোচিত ‘বাংলাদেশ: আ লিগ্যাসি অব ব্লাড’ গ্রন্থে বলেছেন, ‘প্রশাসনিক ব্যর্থতা সত্ত্বেও বাংলাদেশ এমন একটি সংবিধান প্রণয়ন করেছিল, যা নিয়ে যে কোনো দেশই গৌরব বোধ করতে পারে।’
এই বাংলার আম্বেদকর ড. কামাল হোসেন। আর কী কপাল! দুজনই তথাকথিত উপমহাদেশীয় স্বার্থান্ধ নীচ রাজনৈতিক হুজ্জতের বলি। আম্বেদকরকে যেমন কংগ্রেসের দরকার ছিল স্বাধীন ভারতের সংবিধান প্রণয়নের জন্য। কিন্তু যখন প্রয়োজন শেষ হয়ে যায় তখন মতপার্থক্যের কারণে নিমেষেই পিঠ দেখায় কংগ্রেস। ড. কামাল গোসেন একই পরিণতির শিকার। আসলে শিকার বলা হচ্ছে, কিন্তু তাঁকে শুনলে আওয়ামী লীগ আজ এই পরিণতির শিকার হতো?
৫.
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর সংবিধান পুনর্লিখনের যে রব উঠেছিল; ড. কামাল হোসেন মনে করেন, সেটা একটা ভুল ধারণা। এটা ঠিক, সংস্কারের প্রয়োজন আছে। সংস্কার বিবেচনাযোগ্য। বিস্তর আলোচনার পর যদি ঐকমত্য হয়, তখন সংবিধান সংশোধন করা যায়। তিনি বলেছিলেন, সংবিধান আমাদের জাতির সংগ্রামের ফসল। এটি কেবল আইনের দলিল নয়, বরং আমাদের স্বপ্ন, আকাঙ্ক্ষা ও সংগ্রামের প্রতিচ্ছবি। সময়ের প্রয়োজনে সংবিধান পর্যালোচনা ও সংস্কারের আলোচনা নতুন কিছু নয়।
ড. কামাল হোসেন সংবিধানকে জনগণের সম্পদ অভিহিত করে বলেছিলেন, আমরা প্রতিনিধিত্বশীল গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত করেছি, কিন্তু কার্যকর করতে পারিনি। প্রতিনিধিত্বশীল গণতন্ত্র কার্যকর করার বাধাগুলো চিহ্নিত করার জন্য সকলকে আহ্বান জানান তিনি। প্রত্যেক নাগরিকের অধিকার এবং স্বার্থ জড়িত যে সংবিধানে, সে সংবিধানে কী পরিবর্তন আসছে– জানার অধিকার সকলের আছে বলে তিনি মনে করেন।
৬.
সময় বড় অদ্ভুত। গল্পের চাইতেও চমক জাগানো সব ঘটনা আপনাকে অভিজ্ঞতা লাভের সুযোগ করে দেবে। আওয়ামী লীগের শাসনকাল আপাত-অটল মনে হচ্ছিল, যদিও তা ছিল সংবিধানের সংশ্রবহীন। সংবিধানের নিরন্তর অবমাননায় রাষ্ট্রব্যবস্থা ভেঙে পড়তে পারে– সেটা বিবেচনায় নেয়নি স্বাধীনতা ও সংবিধান প্রণয়নে পুরোধা দলটি।
যা হওয়ার নয় তা-ই হয়েছে গত চব্বিশের আগস্টে। সরকার ও দল রক্ষার যে রক্ষাকবচ ‘সংবিধান’, সেটি গুঁড়িয়ে দিয়ে নতুন সংবিধান এবং দ্বিতীয় প্রজাতন্ত্র ঘোষণার মতো অভিনব প্রপঞ্চ; তাও দেখার জন্য এক দীর্ঘ জীবন পেয়েছেন প্রথানুরাগী সংবিধানের শাস্ত্রীয় ঘরানার অনুসারী ড. কামাল হোসেন। সংবিধান বিশ্লেষক আরিফ খান বলেন, সংবিধানের প্রেমিক কম; নিন্দুক বেশি। কিন্তু এত রাজনৈতিক বিরোধিতা সত্ত্বেও সাড়ে পাঁচ দশক পেরিয়ে আমাদেরকে সেই সংবিধানেরই শরণ নিতে হয়। এটিই প্রমাণ করে এর সামর্থ্য। যেটিকে সামর্থ্যবান করতে বাংলাদেশ পেয়েছিল একজন ড. কামাল হোসেনকে।
ড. কামাল হোসেন কি কেবলই একজন সংবিধানবেত্তা, নাকি ঐতিহাসিকভাবে নির্বাচিত কোনো নায়ক? ‘সাংবিধানিক ভক্তিবাদ’ সরিয়ে রেখে বলা যায়, তাঁর নেতৃত্বে যে সংবিধান রচিত, সেটিই টিকে আছে। সামরিক শাসন, সুশীল আক্রমণ আর নিন্দা সত্ত্বেও আমাদের সংবিধানের সংশপ্তক চারিত্র্য-বৈশিষ্ট এর অন্তর্নিহিত কারণ।
এম এম খালেকুজ্জামান: আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট; ‘কনস্টিটিউশন অব বাংলাদেশ: সার্চ ফর আ জাস্ট সোসাইটি’ বইয়ের লেখক ও সহসম্পাদক
[email protected]
- বিষয় :
- ড. কামাল হোসেন
