চারদিক
আগে কী সুন্দর দিন কাটাইতাম
এম. আতিকুল ইসলাম বুলবুল
প্রকাশ: ২২ এপ্রিল ২০২৬ | ০৬:৪৫ | আপডেট: ২২ এপ্রিল ২০২৬ | ২৩:১৫
| প্রিন্ট সংস্করণ
আমি চলনবিল জনপদের বাসিন্দা। চলনবিলে আশি বা নব্বই দশকে সব শ্রেণির মানুষের অনেক ধরনের চিত্তবিনোদনের ব্যবস্থা ছিল। অধিকাংশই এখন হারিয়ে গেছে। সুস্থ, নির্মল, উপভোগ্য, শেখা-জানার মতো বিনোদন সম্পর্কে তরুণরা আজ অজ্ঞই বলা চলে। স্কুলের নানান আয়োজন অর্থাৎ ২৬ মার্চ, ১৬ ডিসেম্বর, নবীনবরণ, বিদায় অনুষ্ঠান বা বার্ষিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে রাত জেগে নাটক, গম্ভীরা, কাওয়ালি, বেহুলার ভাসান, নছিমন, মাদারের গান বা নানান বিনোদনমূলক অনুষ্ঠান উপভোগ করার অংশীদার ছিলাম আশি বা নব্বই দশকের স্কুল-কলেজেপড়ুয়া অনেকের সঙ্গে আমিও। তখনকার কিছু নস্টালজিয়া এখনও ভাবায় ৪৫ বা ৫০ বছর বয়সের মধ্যে যারা অবস্থান করছেন তাদের।
লাল, সবুজ, নীল, হলুদসহ নানা রঙের কাগজ আঠা দিয়ে বা সুতলিতে গেঁথে খেলার মাঠের মাঝখানে লম্বা বাঁশ পুঁতে চমৎকার করে সাজানো হতো বিদ্যালয় চত্বর। তোরণ সাজানো হতো কলাগাছ দিয়ে। প্রত্যন্ত এলাকা হওয়ায় বিদ্যালয়ের একটার পর একটা বেঞ্চ সাজিয়ে তৈরি হতো নাটকের মঞ্চ। ওই সময়ে গ্রামে গ্রামে সন্ধ্যায় কুপি বাতি জ্বালিয়ে কোনো একটি বাড়ির উঠানে খড় বিছিয়ে অথবা খেজুর, তালপাতার পাটিতে বসে নারী-পুরুষ, তরুণ-তরুণীরা হাসিকান্নায় ভরপুর পুঁথি বা পাঠকের সুরেলা কণ্ঠে বিষাদ সিন্ধুর কাহিনি মনোযোগ দিয়ে শুনতেন। অনেক গ্রামেই যুবক-তরুণরা বারবার না হলেও বছরের একটি দিন আয়োজন করতেন নাটক, যাত্রা, পালা, জারি, ফকিরান্তি, সারি গানের।
গ্রামের বিচিত্রা অনুষ্ঠানে কিংবদন্তি শিল্পী আব্দুল আলীম, আব্বাসউদ্দীন আহ্মদ, ফরিদা পারভীনের গাওয়া গানগুলো স্থানীয় শিল্পীরাই গাইতেন। বলতেই হয়, এ সময়ে আয়োজকরা ছিলেন যারপরনাই উদ্যমী। তারা মাইলের পর মাইল হেঁটে নামিদামি শিল্পীর বায়না করতেন। মাথায় করে বাদ্যযন্ত্র বয়ে আনতেন। এ স্মৃতি এখন ধূসর অতীত।
১৯২৭ সালে ঢাকার নবাব পরিবারের তরুণ নির্মাতাদের মাধ্যমে নির্বাক ছবির যাত্রা হলেও ১৯৫৬ সালে আব্দুল জব্বার খানের পরিচালনায় ‘মুখ ও মুখোশ’ নামে প্রথম সবাক সিনেমা নতুন ইতিহাস রচনা করে। তারপর ভালো, রুচিশীল, নিখাদ বিনোদনে বাংলা সিনেমা নব্বই দশক পর্যন্ত মোটামুটি সোনালি পালকেই ঢাকা ছিল। সাদা-কালো সিনেমা যেমন– চিত্রা নদীর পারে, নবাব সিরাজউদ্দৌলা, বেদের মেয়ে জোস্না, পদ্মা নদীর মাঝি, সাত ভাই চম্পা, আবেহায়াত, ধীরে বহে মেঘনা, উসিলা, ভাত দে, নালিশ বা নিকট অতীতের দাঙ্গা, ইতিহাস, তোমাকে চাই ইত্যাদি সিনেমা হাজার হাজার মানুষের বিনোদনের অমলিন দাগ কেটে আছে হৃদয়ে।
এখন এসে আমরা ভুলেই যাচ্ছি নবাব সিরাজউদ্দৌলা, মা মাটি মানুষ, গলি থেকে রাজপথ, ভিখারীর ছেলে, জীবন নদীর তীরে, এক ফোঁটা বিষ দাও, বিজয় নিশান, দেবী সুলতানা, রূপবানসহ নানা যাত্রাপালার নাম। গ্রামে আয়োজিত সাধু সমাবেশে গাওয়া গানগুলো ছিল আকৃষ্ট করার মতো। পুরোনো দিনের বয়স্কদের আয়োজনে উপচে পড়া দর্শকের উপভোগ্য লাঠি খেলাও এখন বিপন্নপ্রায়।
গ্রামের ঘরে ঘরে এখন টেলিভিশন। নেই লাল পিরান, অয়োময়, উঠান, কোথাও কেউ নেই, বহুব্রীহি, সুখতারা, আজ রবিবার, নক্ষত্রের রাত, এইসব দিনরাত্রি, যারা বৃষ্টিতে ভিজেছিল ইত্যাদি নাটক দেখার জন্য অ্যান্টেনা টানানো, ব্যাটারি চার্জ দেওয়ার উৎপাত। টিভি আছে এমন বাড়ির খোঁজ করে রাতে নাটক দেখতে যাওয়ার তাড়া নেই। তাই বলতে চাই, সুস্থ বিনোদন ব্যবস্থা ফেরাতে সকলকে উদ্যোগী হওয়া এখন জরুরি, যা সময়ের দাবিও বটে।
এম. আতিকুল ইসলাম বুলবুল: শিক্ষক ও সমকালের তাড়াশ প্রতিনিধি
- বিষয় :
- চারদিক
