ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

সংস্কার

দুদকের অচলাবস্থা দূর করুন

দুদকের অচলাবস্থা দূর করুন
×

আদিত্য আরাফাত

প্রকাশ: ২৪ এপ্রিল ২০২৬ | ০৭:৫৯

| প্রিন্ট সংস্করণ

ধরা যাক, কোনো এক রেস্তোরাঁয় একজন সরকারি কর্মকর্তা ও সেবাগ্রহীতার মধ্যে বড় অঙ্কের ঘুষ লেনদেন হচ্ছে। কোনো সচেতন নাগরিক সেটি দেখে দুদকের টোল-ফ্রি ১০৬ নম্বরে ফোন করলেন। নিয়ম অনুযায়ী, এমন পরিস্থিতিতে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়ার কথা। এজন্য আলাদা অ্যানফোর্সমেন্ট ইউনিটও আছে। বাস্তবতা হলো, বড় ছোট যে দুর্নীতিই হোক, দুদকের কর্মকর্তারা এখন কিছুই করতে পারবেন না। আইন অনুযায়ী, কমিশন ছাড়া দুর্নীতির মামলা, অভিযোগপত্র অনুমোদনসহ গুরুত্বপূর্ণ কোনো সিদ্ধান্তই দিতে পারেন না। দেড় মাসের বেশি কমিশন নেই দুদকে।

৩ মার্চ ড. আবদুল মোমেনের নেতৃত্বাধীন কমিশনের সবাই পদত্যাগের পর সংস্থাটি কার্যত নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছে। সিদ্ধান্ত দেওয়ার কেউ নেই তাই মামলা, অভিযোগপত্র, গ্রেপ্তারসহ দুর্নীতিবিরোধী প্রায় সব কার্যক্রম বন্ধ দুদকে। রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ একটা প্রতিষ্ঠান দেড় মাসের বেশি সময় অচল, এটা স্বাভাবিক হতে পারে না। 

দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই সুশাসনের বড় মাপকাঠি। বর্তমান সরকারও নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিতে দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্সের কথা বলেছে। কিন্তু সরকারের দুর্নীতিবিরোধী পদক্ষেপ বাস্তবায়নের আইনি প্রতিষ্ঠান দুদকই যদি থেমে যায়, তার প্রভাব পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থায় পড়ে।

দুর্নীতি দমন কমিশন একসময় ছিল প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীন দুর্নীতি দমন ব্যুরো। প্রতিষ্ঠানটিকে স্বাধীন সংস্থা হিসেবে গড়ে তোলার জন্য নাগরিক সমাজে, সংবাদমাধ্যমে, এমনকি সংসদেও আওয়াজ ওঠে। ২০০৪ সালে দুর্নীতি দমন ব্যুরো প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের প্রভাবমুক্ত দুর্নীতি দমন কমিশন হয়। তৎকালীন বিএনপি সরকারের এমন পদক্ষেপ প্রশংসিত হয়। 
ব্যুরো থেকে কমিশন গঠন করা হলেও বাস্তবে প্রতিবার রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পরই দুদকের নেতৃত্বও বদলেছে। অথচ স্বাধীন প্রতিষ্ঠান হিসেবে তা হওয়ার কথা নয়। আমরা দেখেছি, বিএনপি সরকারের সময় দুদক চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ পাওয়া বিচারপতি সুলতান হোসেন খান মেয়াদপূর্তির আগেই ওয়ান ইলেভেন সরকারের সময় ‘ব্যক্তিগত’ কারণে সরে যান। ওয়ান ইলেভেন সরকারের সময় নিয়োগ পাওয়া সাবেক সেনাপ্রধান হাসান মশহুদ চৌধূরীও আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসা মাত্রই ‘ব্যক্তিগত’ কারণে পদত্যাগ করেন। আওয়ামী লীগ টানা সাড়ে পনেরো বছর ক্ষমতায় থাকায় গোলাম রহমান, বদিউজ্জামান ও ইকবাল মাহমুদ মেয়াদ পূর্ণ করেন। তবে ২০২১ সালে নিয়োগ পাওয়া সাবেক সিনিয়র সচিব মঈনউদ্দীন আবদুল্লাহকেও জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ‘ব্যক্তিগত’ কারণে সরে যেতে হয় দুই কমিশনারসহ। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় নিয়োগ পাওয়া সাবেক সিনিয়র সচিব আবদুল মোমেনসহ দুই কমিশনার ‘ব্যক্তিগত’ কারণে পদত্যাগ করে বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার কয়েক দিনের মধ্যে।

এভাবে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের কারণে কাগজে কলমে স্বাধীন সংস্থাটির চেয়ারম্যানসহ পূর্ণ কমিশনকে ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে সরে যেতে হওয়ায় ব্যুরো থেকে কমিশনে রূপান্তরিত সংস্থাটি কার্যত কতটা প্রভাবমুক্ত, সে প্রশ্ন থেকেই যায়! কী রাজনৈতিক সরকার, কী অরাজনৈতিক, সব আমলে দুদক সরকারের বলয় থেকে বের হতে পারেনি। নির্বাচিত-অনির্বাচিত সব সরকারই ‘স্বাধীন’ সংস্থাটিকে ব্যবহার করেছে।

আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, প্রতিবার রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর নেতৃত্ব শূন্যতায় সংস্থাটি অচল হয়ে পড়ে। জনবল কাঠামোতে একজন সচিব এবং আটজন মহাপরিচালক থাকলেও তারা অভিযোগের অনুসন্ধান–তদন্ত, মামলা বা চার্জশিটের অনুমোদন দিতে পারেন না। এ কারণে গত দেড় মাসে নতুন কোনো দুর্নীতির মামলা বা চার্জশিট হয়নি। দুদকের প্রধান কার্যালয়সহ বিভিন্ন বিভাগ ও জেলা কার্যালয়ে প্রতিদিন নানা ধরনের দুর্নীতির অভিযোগ জমা পড়লেও একটিরও বিষয়ে অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়নি। এ সময়ে  দুর্নীতি থেমে না থাকলেও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া যায়নি।
দুদক আইনে বলা আছে, চেয়ারম্যান ও কমিশনার অর্থাৎ কমিশন সভা ছাড়া অনুসন্ধান, মামলা, অভিযোগপত্রের অনুমোদন দেওয়া যায় না। এখন যেহেতু কোনো কমিশন নেই ফলে পুরো সংস্থাই সিদ্ধান্তহীন হয়ে পড়েছে। কাজ করার মতো জনবল আছে, অভিযোগ আছে, কিন্তু সিদ্ধান্ত দেওয়ার কেউ নেই। 

এমনিতেই দুদকের ওপর সাধারণ মানুষের আস্থাহীনতার সংকট রয়েছে। কেউ যদি দুর্নীতির অভিযোগ দিয়ে কোনো সাড়া না পায়, তাহলে আস্থাহীনতার সংকট আরও প্রকট হয়। 
এখন সবচেয়ে জরুরি, নিয়ম অনুযায়ী বাছাই কমিটি গঠন করে দুদকে দ্রুত যোগ্য নতুন নেতৃত্ব নিয়োগ। পাশাপাশি ভাবতে হবে, ভবিষ্যতে দুদকের চেয়ারম্যান ও দুই কমিশনার পদত্যাগ করলে সংস্থাটি কীভাবে সক্রিয় থাকবে? কে সিদ্ধান্ত দেবে? এ বিষয়ে আইন বিধি ঠিক করা সময়ের দাবি।

আদিত্য আরাফাত: সাংবাদিক
[email protected]
 

আরও পড়ুন

×