ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

শিক্ষাঙ্গন

উপাচার্য নিয়োগে সার্চ কমিটির তবে কাজ কী?

উপাচার্য নিয়োগে সার্চ কমিটির তবে কাজ কী?
×

জোবাইদা নাসরীন

জোবাইদা নাসরীন

প্রকাশ: ২৫ এপ্রিল ২০২৬ | ০৭:২২ | আপডেট: ২৫ এপ্রিল ২০২৬ | ১১:৩৭

| প্রিন্ট সংস্করণ

গত ২ এপ্রিল বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের খবর থেকে জানা গেল, সরকার সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য নিয়োগের জন্য মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিবের নেতৃত্বে ছয় সদস্যের একটি সার্চ কমিটি গঠন করেছে। কিন্তু ১৩ এপ্রিল শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ থেকে পৃথক দুটি প্রজ্ঞাপনে যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আবদুল মজিদের জায়গায় নতুন একজনকে বসানো হলো। মজার বিষয়, ওই প্রজ্ঞাপন যখন জারি হয় তখন আবদুল মজিদ শিক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি অনুষ্ঠানে ছিলেন। অনুষ্ঠানে বসেই চেয়ার হারানোর সংবাদ পেয়েছিলেন উপাচার্য। সার্চ কমিটি গঠনের মাত্র ১১ দিনের মাথায় কী এমন ঘটল যে, কমিটিকে পাশ কাটিয়ে একজন উপাচার্যকে সরিয়ে আরেকজনকে বসানো হলো? 

১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বড় ধরনের সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে ১৭ ফেব্রুয়ারি সরকার গঠন করেছে বিএনপি। এর এক মাস পর ১৭ মার্চ, এক দিনে বিএনপি সরকার সাতটি বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য নিয়োগ দিয়েছে। এ উপাচার্যদের মধ্যে একজন সরাসরি বিএনপির পদধারী নেতা। বাকি ছয়জনও বিএনপিপন্থি শিক্ষক সংগঠনের সাবেক ও বর্তমান নেতা (প্রথম আলো, ১৭ মার্চ ২০২৬); তাদের কয়েকজন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আসনে নির্বাচনী প্রচারণায় সরাসরি অংশগ্রহণ করেছিলেন। তবে কি তারেক রহমানের নির্বাচনী প্রচারণায় অংশগ্রহণ উপাচার্য নিয়োগে বাড়তি যোগ্যতা হিসেবে কাজ করেছে? এটি দলীয় শিক্ষকদের আরও বেশি দলীয় কার্যক্রমে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে উৎসাহ দেবে।

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য নিয়োগে অতীতে অবশ্য খুব কম ক্ষেত্রেই নিয়ম মানা হয়েছে। আইনবলে স্বায়ত্তশাসিত চারটি বিশ্ববিদ্যালয়ে–ঢাকা, রাজশাহী, চট্টগ্রাম ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়–উপাচার্য নিয়োগের সুনির্দিষ্ট নিয়মনীতি থাকলেও বেশির ভাগ সময় তা মান্যতা পায়নি। ১৯৭৩-এর বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশ (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে তা ‘আদেশ’) অনুযায়ী, উপাচার্য নিয়োগ হওয়ার কথা সংশ্লিষ্ট সিনেট মনোনীত তিনজনের প্যানেল থেকে। বিগত সরকারের সময়ে দেখা গেছে, সাময়িক বা ভারপ্রাপ্ত হিসেবে নিয়োগ পেয়েই উপাচার্যরা আর সিনেট নির্বাচন দিতে চান না, এভাবেই পার করে দিয়েছেন প্রায় পুরো মেয়াদ। এমনকি এসব উপাচার্য এক মেয়াদের পর আরেক মেয়াদে থাকার বৈধতা অর্জন করেছেন সরকারি ঘোষণায় এবং ‘আচার্যের ক্ষমতাবলে’। অন্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে উপাচার্য নিয়োগের নির্দিষ্ট কোনো নিয়ম বা নীতি নেই। ফলে সরকারের ইচ্ছা-অনিচ্ছাই এগুলোর শীর্ষ পদে কে কত সময়ের জন্য থাকবেন তা নির্ধারণ করে। 

মূলত ৯০ দশকের শুরু থেকেই, দেশ যখন এক গণঅভ্যুত্থানের ফসল হিসেবে গণতন্ত্রের পথে নবযাত্রা শুরু করে, উপাচার্য নিয়োগে ক্ষমতাসীন দলের অনুগতদের প্রাধান্য চলে আসছে। সে হিসেবে বলা যায়, বর্তমান সরকার অন্য অনেক ক্ষেত্রের মতো উপাচার্য নিয়োগে পুরোনো পথেই হেঁটেছে। 

শুধু উপাচার্যই নয়, উপ-উপাচার্য, কোষাধ্যক্ষ এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পদেও সরাসরি রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগ হয়। এতে অবশ্য উপাচার্য এবং অন্যরা নিজেদের ব্যাপক ক্ষমতাবান মনে করেন। কারণ, সরকারের আশীর্বাদ ভোগ করার পাশাপাশি তারা দলীয় ক্ষমতাও উপভোগ করেন। তাদের কাছে ভিন্ন মত বা আদর্শের শিক্ষকেরা খুব একটা পাত্তা পান না। এমনকি নিজ শিবিরের ভিন্নমতাবম্বীদেরও তিনি বা তারা স্মরণ করিয়ে দেন যে, দলের আস্থা তাঁর বা তাদের প্রতি আছে, সুতরাং অন্যরা আস্থা না রাখলেও চলবে।

এর ফল কী হয় তা কারও অজানা নয়। শিক্ষক নিয়োগ তো বটেই, এমনকি একাডেমিক কার্যক্রমেও দলীয় রাজনীতির ছাপ ব্যাপক হয়ে পড়ে। দলীয় বিবেচনায় নিয়োগ পেয়ে অনেক শিক্ষকই দলীয় কার্যক্রমে বেশি মনোযোগী হন। তাদের গবেষণা কার্যক্রম এবং একাডেমিক দায়দায়িত্বও তখন লাটে ওঠে।

২ এপ্রিল যে সার্চ কমিটি আমাদের সামনে উপস্থাপন করা হয়েছিল, সেটিও কিন্তু দলীয় বিবেচনার ঊর্ধ্বে ছিল না। কমিটিতে সদস্য হিসেবে আছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের একজন সদস্য ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন অধ্যাপক। আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, মাধ্যমিক উচ্চশিক্ষা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (বিশ্ববিদ্যালয়) এই কমিটিতে সদস্য সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। কমিটির কাঠামোটি বিশ্লেষণ করলে যেটি দাঁড়ায় তা হলো, চারজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সে কমিটিতে আছেন মূলত দলীয় বিবেচনায়। দলীয় বিবেচনায় উপাচার্য হওয়া, দলীয় রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকা শিক্ষকরা কী দলীয় রাজনীতির বাইরে গিয়ে উপাচার্য নিয়োগ দেবেন? কিন্তু এ কমিটিরও ওপর সরকার ভরসা রাখতে পারল না!

 আর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব কেন এই কমিটির সভাপতি? ঢাকা ও রাজশাহীর মতো পুরোনো স্বায়ত্তশাসিত বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য কী প্রটোকলে সচিবের নিচে? উপাচার্য নির্বাচনে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কাজই বা কী? এখানে থাকার কথা বরেণ্য শিক্ষাবিদদের, আন্তর্জাতিক স্কলারদের। নিকট অতীতে তো সেটিই দেখা গেছে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে সার্চ কমিটির গঠন এবং কার্যক্রম কী আমাদের দেশের এই খাতের কারোরই জানা নেই? এই কমিটির নানা উপকমিটি থাকবে, যেখানে সংশ্লিষ্ট আমলারা থাকবেন, যারা নিয়োগ প্রক্রিয়ার বিভিন্ন ধাপ সম্পন্ন করবেন। বস্তুত ওই সার্চ কমিটির মাথায় যখন একজন আমলাকে বসিয়ে দেওয়া হয় তখনই বোঝা গেছে, এ কমিটি কী করতে পারে এবং সরকারই বা কতটুকু দাম দেয় কমিটিকে। 

জুলাই অভ্যুত্থানের পর বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম থেকে ‘কেমন বিশ্ববিদ্যালয় চাই’ নামে বিভিন্ন ধরনের সভা-সেমিনারের আয়োজনের করা হয়েছিল। সেখানেও সার্চ কমিটির আলোচনা জোরেশোরে এসেছিল। তবে যারা সেই প্রস্তাব রেখেছিলেন, তাদেরই কেউ কেউ এই কমিটিতে আছেন। তারা কী এই ধরনের সার্চ কমিটিই চেয়েছিলেন? 

বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল বৈশিষ্ট্যই হলো মুক্ত জ্ঞান চর্চার সঙ্গে নতুন জ্ঞানের আবিষ্কার। কিন্তু দলীয় শিক্ষকদের সঙ্গে নিয়ে মন্ত্রণালয়ের সচিব; যাকে বা যাদের উপাচার্য পদের জন্য বেছে নেবেন, তিনি বা তারা আর যা হোক স্বাধীনচেতা হবেন না, তা হলফ করে বলা যায়। সব মিলিয়ে, উপাচার্য নিয়োগ আগের মতো প্রশ্নবিদ্ধই থেকে যাচ্ছে।

জোবাইদা নাসরীন: শিক্ষক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, 
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]
 

আরও পড়ুন

×