ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

জনজীবন

মন্ত্রীদের বাড়িতেও লোডশেডিং হয়?

মন্ত্রীদের বাড়িতেও লোডশেডিং হয়?
×

সাদিয়া মাহ্জাবীন ইমাম

সাদিয়া মাহ্জাবীন ইমাম

প্রকাশ: ২৭ এপ্রিল ২০২৬ | ০৮:১৮

গ্রাম-গঞ্জে লোডশেডিংয়ের অবস্থা চরম আকার ধারণ করলে ২০২২ সালে মন্ত্রী ও এমপিদের বাড়িতেও লোডশেডিংয়ের আহ্বান জানিয়েছিলেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং তৎকালীন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের।

জনসাধারণে দুর্ভোগ নিয়ে বিদ্রূপ করছেন বলে তাঁর এই আহ্বানে কেউ কেউ ব্যথিত হয়েছিলেন। তৎকালীন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বলেছিলেন, ‘মন্ত্রীদের বাড়িতেও লোডশেডিং চলছে এবং সবাইকেই কমবেশি এই সংকটের আওতায় আসতে হচ্ছে।’ বোধ করি ওবায়দুল কাদেরের আহ্বান আর নসরুল হামিদের সেই সংকটের আওতায় আসার স্বীকারোক্তির প্রভাবেই ঠিক এক বছর পর ২০২৩ সালে জানা গিয়েছিল, একজন মন্ত্রীর বাড়িতে টানা চার মাস ধরে বিদ্যুৎ বিল এসেছে ৩৭ টাকা করে। যেখানে পোস্টপেইড মিটারে আবাসিক গ্রাহকদের জন্য প্রতি মাসে সর্বনিম্ন চার্জ ১০০ থেকে ১৫০ টাকা। 

২০২৩ সালের এপ্রিল থেকে জুলাই মাসে তৎকালীন সমাজকল্যাণমন্ত্রী নুরুজ্জামান আহমেদের লালমনিরহাটের কালীগঞ্জের বাড়ির বিদ্যুৎ বিল ছিল সেটি। বিল করেছিল নর্দান ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই কোম্পানি (নেসকো)। মন্ত্রীপুত্র জানিয়েছিলেন, সব ঘরে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত যন্ত্র থাকলেও ওই বাড়িতে তারা নিয়মিত থাকেন না। কেয়ারটেকার দেখাশোনা করেন। অথচ এই গ্রামেরই কৃষক নুরনবীর বিরুদ্ধে ১৮ হাজার টাকা বকেয়ার কারণে তখন মামলা দায়ের করেছিল নেসকো। 

দেশ যখন আবার লোডশেডিংয়ের কবলে তখন মনে উঁকি দিল প্রশ্নটি। মন্ত্রী-এমপিদের বাড়িতে কি লোডশেডিং হয়? কারও বাড়ির বিদ্যুৎ বিল কি এখনও ৩৭ টাকা আসে? 

বাংলাদেশে বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনা মূলত জাতীয় গ্রিডের মাধ্যমে পরিচালিত। সব গ্রাহক এ ব্যবস্থার আওতায় থাকলেও বিদ্যুৎ সরবরাহে কিছু অগ্রাধিকারভিত্তিক এলাকা রয়েছে। যেমন রাষ্ট্রপতি ভবন, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, গুরুত্বপূর্ণ সরকারি স্থাপনা, হাসপাতাল এবং কিছু কূটনৈতিক এলাকা। এসব জায়গায় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে আলাদা ব্যবস্থা থাকে– ব্যাকআপ জেনারেটর, সাবস্টেশন বা বিশেষ লাইন। তবে মন্ত্রীদের বাড়ির বিদ্যুৎ সংযোগে আলাদা ব্যবস্থা থাকে না বলে সমকালের প্রতিবেদককে জানিয়েছেন ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড-ডিপিডিসির একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। 

তবে সরকারি বাসভবন বা মন্ত্রিপাড়ার অ্যাপার্টমেন্টে সাধারণত উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন অটোমেটিক জেনারেটর বা ব্যাকআপ সুবিধা থাকে। ফলে মন্ত্রী-এমপিদের বাড়ির সদস্যরা বুঝতে পারেন না প্রায় ৪০ ডিগ্রি তাপমাত্রা কেমন অনুভূত হয়। 

মন্ত্রীদের বাড়িতেও সাধারণ গ্রাহকদের মতো মিটার থাকে এবং বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করতে হয়। তবে অনেক সময় মন্ত্রীদের ব্যক্তিগত বা নির্বাচনী এলাকার বাসভবনে বকেয়া বিল বা অস্বাভাবিক কম বিলের খবর আমরা দেখি। মন্ত্রী-এমপিদের বাসার বিদ্যুৎ ব্যবস্থা কারিগরিভাবে সাধারণ বিতরণ ব্যবস্থার অংশ হলেও অবস্থানগত কারণে তারা জনসাধারণের তুলনায় অনেক কম লোডশেডিংয়ের সম্মুখীন হন। কারণ নিরাপত্তা, প্রশাসনিক কার্যক্রম এবং জরুরি যোগাযোগের জন্য তাদের বাসস্থানকে অনেক সময় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ফলে সাধারণ নাগরিক যেখানে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লোডশেডিং সহ্য করেন, সেখানে মন্ত্রীদের বাসায় হয়তো বিদ্যুৎ বিভ্রাট স্বল্পস্থায়ী। তাও বিকল্প ব্যবস্থায় সামাল দেওয়া হয় এবং এর সব খরচই রাষ্ট্র বহন করে। 

মুজিববর্ষে ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ আরও সহজলভ্য করতে সাময়িক একটু বর্ধিত দাম মেনে নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন ওবায়দুল  কাদের। কিন্তু ‘সাময়িক’ থেকে দফায় দফায় দাম বৃদ্ধি জনজীবনে সংকট তৈরি করেছিল। সম্ভবত বিষয়টি বিবেচনায় রেখে নির্বাচনের পরপরই বর্তমান সরকার অন্তত দুই বছর বিদ্যুতের দাম না বাড়ানোর কথা বলেছিল। কিন্তু এখন বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রক্রিয়া চলছে। পাইকারি ও খুচরা দাম বৃদ্ধির প্রস্তাব তৈরি হয়েছে। আবাসিক গ্রাহকদের ক্ষেত্রে ইউনিটপ্রতি ৭০ পয়সা থেকে ১ টাকা ৮০ পয়সা পর্যন্ত দাম বাড়ানোর প্রস্তাব তৈরি হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্য সংকটে জ্বালানি তেল, এলএনজি সরবরাহে চাপ এবং ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় ভর্তুকি কমাতেই এমন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। যে কারণেই হোক, জনগণের নিস্তার নেই– এ কথা সর্বৈব সত্য। 

সারাদেশে সাড়ে ১৮ লাখের বেশি এসএসসি পরীক্ষার্থীর পরীক্ষা চলছে। অনেক শিক্ষার্থীর জন্য মায়ের হাতপাখাই এখন ভরসা। কলকারখানার উৎপাদন মারাত্মক ব্যাহত হচ্ছে। ডিজেল ও বিদ্যুৎ সংকটে হুমকিতে বোরো উৎপাদন। পোলট্রি ও মৎস্য খাত থেকে কোল্ডস্টোরেজ; সবখানে শুরু হয়েছে সংকট। চাহিদার তুলনায় দিনে গড়ে দুই থেকে আড়াই হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কম উৎপাদন হচ্ছে। ঘাটতি সামাল দিতে গিয়ে বৈষম্যের শিকার হচ্ছে মফস্বল আর গ্রামীণ জনপদ। 

কৃষকদের সেচ সুবিধা নিশ্চিত করতে এবং গ্রাম-শহরের বৈষম্য কমাতে ঢাকাসহ সারাদেশের শহরাঞ্চলেও প্রয়োজন অনুযায়ী লোডশেডিংয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এখন রাজধানীর মানুষও ভালোভাবে ভাগ করে নিচ্ছেন লোডশেডিংয়ের যন্ত্রণা। কিন্তু সংকটের সময় দেশের সব মানুষের এই কষ্টকে মেনে নেওয়া, সেই কষ্টের তাপ কি কখনও পৌঁছায় মিন্টো রোড, ন্যাম ভবন, হেয়ার রোড, গুলশান, বনানীতে? 

এসব বাস্তবতাই সাধারণ মানুষের মধ্যে বৈষম্যের অনুভূতি তৈরি করে। একজন নাগরিক প্রশ্ন করতেই পারেন, রাষ্ট্রের সেবা কি সবার জন্য সমান হওয়া উচিত নয়? বিদ্যুৎ যেমন মৌলিক প্রয়োজন, তেমনি এর বণ্টনে স্বচ্ছতা ও ন্যায়পরায়ণতা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

বিদ্যুৎ খাতে সংকটের মূল কারণ অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, জ্বালানি সরবরাহের ঘাটতি এবং ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা। এসব সমস্যার সমাধান না করে কেবল অগ্রাধিকারভিত্তিক সরবরাহ ব্যবস্থা করলে দীর্ঘ মেয়াদে বৈষম্য বাড়বে। গরম, আঁধার সবার ঘরে সমানভাবে না নামলে কি আর আলো-আঁধারের বিভাজন মুছে দেওয়া যায়? এই বিভাজনই ক্ষমতার কাঠামোকে প্রতিফলিত করে। 

সাদিয়া মাহ্জাবীন ইমাম, সহকারী সম্পাদক, সমকাল

আরও পড়ুন

×