ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

তিস্তা মহাপরিকল্পনা এবং উত্তরাঞ্চলের বাঁচার লড়াই

তিস্তা মহাপরিকল্পনা এবং উত্তরাঞ্চলের বাঁচার লড়াই
×

তিস্তা মহাপরিকল্পনাকে কেবল একটি অবকাঠামো প্রকল্প হিসেবে না দেখে মানুষের জীবন-জীবিকার প্রকল্প হিসেবে বিবেচনা করতে হবে

নজরুল ইসলাম হক্কানী

প্রকাশ: ২৭ এপ্রিল ২০২৬ | ১২:৪০

বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের মানুষের কাছে তিস্তা শুধু একটি নদী নয়; তাদের জীবন, জীবিকা এবং টিকে থাকার প্রতীক। অথচ এই নদীই আজ তাদের কাছে এক অনিশ্চয়তার নাম। শুষ্ক মৌসুমে পানির জন্য হাহাকার, বর্ষায় ভয়াবহ বন্যা– এই দ্বিমুখী সংকটের স্থায়ী সমাধান হিসেবে বহুদিন ধরে আলোচিত হচ্ছে ‘তিস্তা মহাপরিকল্পনা’। কিন্তু আজ অবধি এর বাস্তবায়ন নিয়ে কোনো পদক্ষেপ গৃহীত হয়নি।
তিস্তা মহাপরিকল্পনা মূলত একটি সমন্বিত নদী ব্যবস্থাপনা উদ্যোগ; যার লক্ষ্য নদী খনন, পানি সংরক্ষণ, বন্যা নিয়ন্ত্রণ, আধুনিক সেচ ব্যবস্থা এবং নদীকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়ন। চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান পাওয়ার কনস্ট্রাকশন করপোরেশন অব চায়নার (পাওয়ার চায়না) পক্ষ থেকে তিস্তাকে কেন্দ্র করে একটি বৃহৎ উন্নয়ন করিডোর গড়ে তোলার প্রস্তাব দেওয়া হয়। এ নিয়ে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয় ২০১৬ সালে। সেই অনুসারে পাওয়ার চায়না ও বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (২০১৬-১৯) তিন বছরব্যাপী সমীক্ষা  শেষে ‘তিস্তা রিভার কমপ্রিহেন্সিভ ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড রেস্টোরেশন প্রজেক্ট’ (টিআরসিএমআরপি)– বাংলায় তিস্তা নদী সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্প নামক এক মহাপরিকল্পনা চূড়ান্ত করে।
এই সমীক্ষায় নদী ড্রেজিং, দুই তীরে বাঁধ নির্মাণ, জলাধার সৃষ্টি এবং নদীর দুই পাশে আধুনিক নগরায়ণের পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়। প্রকল্পের মোট প্রাক্কলিত ব্যয় ছিল ৯৮৩ দশমিক ২৭ মিলিয়ন ডলার। প্রকল্প বাস্তবায়নে চীন কারিগরি সহযোগিতা ও বিনিয়োগে আগ্রহী হলেও ‘ভূরাজনীতির দ্বৈরথে’ তা শেষমেশ তিস্তা চুক্তির মতো ঝুলে যায়।
অন্তর্বর্তী সরকার প্রকল্পটির প্রথম ধাপের ব্যয় মূল্যায়ন করেছে। পাঁচ বছর মেয়াদি প্রথম ধাপে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৯ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে প্রায় ছয় হাজার ৭০০ কোটি টাকা চীনের কাছ থেকে ঋণ হিসেবে চাওয়ার প্রত্যাশা আছে। বাকি অর্থ রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে দেওয়া হবে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, প্রকল্পের বেশির ভাগ আনুষ্ঠানিকতা ইতিমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে– এখন মূলত চীনের সঙ্গে চূড়ান্ত চুক্তি স্বাক্ষর বাকি।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতিও উল্লেখযোগ্য। ড. ইউনূস সরকার ঘোষণা দিয়েছিল, ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি থেকে প্রকল্পের কাজ শুরু  হবে। কিন্তু তাঁর পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা শেষমুহূর্তে তিস্তা প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়ভার নির্বাচিত সরকারের কাঁধে চাপিয়ে বিদায় নেন। 
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে উত্তরাঞ্চলে প্রধান ইস্যু ছিল ‘তিস্তা মহাপরিকল্পনা’। সব রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতারা অববাহিকায় বসবাসকারী মানুষকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তা বাস্তবায়নের। কিন্তু বাস্তবে বহুকাঙ্ক্ষিত তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ নির্বাচিত  সরকারের পক্ষ থেকে এখনও ঘোষণা করা হয়নি– যা জনমনে নতুন করে প্রশ্ন ও সংশয় তৈরি করেছে।
তিস্তা প্রশ্নে দীর্ঘদিন ধরে যে ভূরাজনৈতিক টানাপোড়েন ছিল, সেটিও এখন এক নতুন বাস্তবতায় প্রবেশ করছে। ভারত ও চীনের মধ্যে সাম্প্রতিক সময়ে বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক সম্পর্কের উন্নতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এই পরিবর্তিত পরিস্থিতি দক্ষিণ এশিয়ার জন্য একটি সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিতে পারে– যদি এই দুই শক্তিধর দেশ প্রতিযোগিতার পরিবর্তে সমন্বয়ের পথে হাঁটে। এ ক্ষেত্রে আমাদের সরকারের পক্ষ থেকেও অব্যাহত রাখতে হবে ‘বুদ্ধিদীপ্ত কূটনৈতিক’ প্রচেষ্টা।
তিস্তা একটি হিমালয় থেকে জন্ম নেওয়া নদী। হিমালয় থেকে গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্রও জন্ম নিয়েছে, যেখানে জড়িয়ে আছে নেপাল, ভুটান ও চীন। যদি চীন-ভারত-নেপাল-ভুটান-বাংলাদেশ একসঙ্গে একটি অভিন্ন নদী ও পানি ব্যবস্থাপনা কাঠামো গড়ে তুলতে পারে, তাহলে (বিদ্যুৎ, পানি, সেচ, আঞ্চলিক যোগাযোগ ও বাণিজ্য) তা হবে বিশ্বে এক অনন্য উদাহরণ। সেখানে তিস্তা নিয়ে আলাদা করে ভাবতে হবে না। গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও তিস্তা– এই তিনটি প্রধান নদী ঘিরে সমতা-ন্যায্যতার ভিত্তিতে একটি বহুপক্ষীয় সহযোগিতা কাঠামো গড়ে উঠলে তা দক্ষিণ এশিয়ায় পানি নিরাপত্তা, কৃষি উন্নয়ন, বাণিজ্য, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং আঞ্চলিক শান্তির নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে।
তবে তিস্তা মহাপরিকল্পনা এই বৃহত্তর সহযোগিতার একটি সূচনাবিন্দু হতে পারে। বিশেষ করে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে যদি ভারত ও চীনের মধ্যে সমন্বয় তৈরি করা যায়, তাহলে তা উভয় দেশের জন্যই কল্যাণকর হবে। এতে ভারতের নিরাপত্তা ও কৌশলগত উদ্বেগ অনেকটাই কমে আসবে, একই সঙ্গে বাংলাদেশও পাবে একটি কার্যকর উন্নয়ন প্রকল্প। সবচেয়ে বড় কথা, শুষ্ক মৌসুমে তিস্তার পানির প্রবাহ নিশ্চিত করার একটি বাস্তবসম্মত পথ তৈরি হতে পারে।
এই সমীকরণটা জটিল, সন্দেহ নেই। তবে উত্তরাঞ্চলের মানুষের জন্য তিস্তা মহাপরিকল্পনা কোনো বিলাসিতা নয়, এটি বেঁচে থাকার উপায়। এই মহাপরিকল্পনা আটকে গেলেও তিস্তা পারের কৃষকদের সংগ্রাম চলবেই।
এই লড়াইকে সংগঠিত রূপ দিয়েছে ‘তিস্তা বাঁচাও নদী বাঁচাও সংগ্রাম পরিষদ’ ও ‘তিস্তা নদী রক্ষা আন্দোলন’। ‘জাগো বাহে তিস্তা বাঁচাই’ স্লোগানে দীর্ঘদিন ধরে তারা মিছিল, মানববন্ধন, মশাল প্রজ্বালনসহ নানা কর্মসূচির মাধ্যমে একটি সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ দাবি করে আসছে। তাদের কণ্ঠে এখন একটাই স্লোগান— প্রতিশ্রুতি নয়, বাস্তবায়ন চাই। সংগঠনগতভাবে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে সরকারের কাছে তাদের দাবি–
১) দ্রুত একনেক সভায় তিস্তা মহাপরিকল্পনায় রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে  প্রাক্কলিত দুই হাজার ৪০০ কোটি টাকা অনুমোদন সাপেক্ষে আগামী শুষ্ক মৌসুমে তিস্তা প্রকল্পের প্রথম ধাপের কাজের উদ্বোধন ও প্রকল্প বাস্তবায়নে সুনির্দিষ্ট ও সময়বদ্ধ রোডম্যাপ ঘোষণা।
২) ‘সরকারিভাবে তিস্তা বন্ড’ চালু করে জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা এবং জাতীয় বাজেটে বিশেষ বরাদ্দ রাখা।
৩) তিস্তার বালু ও পাথর উত্তোলনে সরকারি ব্যবস্থাপনা এবং সেই অর্থ প্রকল্পে বিনিয়োগ।
৪) তিস্তা ব্যারাজ সেচ খালের সম্প্রসারণ ও তিস্তা তীর সংরক্ষণে বিক্ষিপ্ত এবং বিচ্ছিন্নভাবে অর্থ ব্যয়, অপচয় ও দুর্নীতি বন্ধ করে তা ‘সমন্বিত তিস্তা প্রকল্পে’ বিনিয়োগ।
৫) প্রকল্প পরিচালক (পিডি) নিয়োগ।
৬) ধাপে ধাপে প্রকল্প বাস্তবায়নে ‘তিস্তা বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ’ গঠন। 
সরকার পরম্পরায় তাদের প্রতিশ্রুতির ঘাটতি নেই, কিন্তু বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ধীরগতি মানুষের আস্থা ক্ষুণ্ণ করছে। এখন প্রয়োজন স্পষ্ট সময়সূচি, স্বচ্ছ অর্থায়ন কাঠামো এবং দৃশ্যমান অগ্রগতি। চীনের সঙ্গে চুক্তি দ্রুত সম্পন্ন করা, একই সঙ্গে আঞ্চলিক কূটনীতিতে সক্রিয় থেকে একটি বহুপক্ষীয় পানি ব্যবস্থাপনার উদ্যোগ নেওয়া– এই দুই দিকেই সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
সবচেয়ে বড় কথা, তিস্তা মহাপরিকল্পনাকে কেবল একটি অবকাঠামো প্রকল্প হিসেবে না দেখে মানুষের জীবন-জীবিকার প্রকল্প হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। উন্নয়ন যেন মানুষের জন্য হয়– এই নীতি সামনে রেখে এগোতে হবে।
তিস্তা আজ একটি পরীক্ষার নাম– রাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতি, আঞ্চলিক কূটনীতি এবং জনগণের দাবির প্রতি দায়বদ্ধতার পরীক্ষা। এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতেই হবে সরকারকে।

নজরুল ইসলাম হক্কানী: সভাপতি, তিস্তা বাঁচাও নদী বাঁচাও সংগ্রাম পরিষদ
[email protected]

আরও পড়ুন

×