সমকালীন প্রসঙ্গ
রাজনৈতিক তর্কের তালগাছ কার!
মাহবুব আজীজ
মাহবুব আজীজ
প্রকাশ: ০৫ মে ২০২৬ | ০৭:০৮ | আপডেট: ০৫ মে ২০২৬ | ১১:১২
| প্রিন্ট সংস্করণ
এনসিপির সংস্কার বাস্তবায়ন কমিটি আয়োজিত জাতীয় কনভেনশনে রোববার আইনজীবী সারা হোসেন বলেছেন, ‘ভিন্ন মতাদর্শের যারা রয়েছেন, তাদের অর্থনৈতিক ও সামাজিক অধিকার প্রযোজ্য হবে। বর্তমানে জামিনই পাওয়া যাচ্ছে না। বিচারককে দশবার ভাবতে হয়, তিনি আসলে জামিন দেবেন কিনা’ (সমকাল, ৪ মে ২০২৬)। একই অনুষ্ঠানে এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া বলেছেন, ‘আওয়ামী লীগের অনেকেই গ্রেপ্তার হয়ে আছেন। যথাযথ আইনি কাঠামো না থাকায় যারা ফ্যাসিবাদ হয়ে উঠতে সহায়তা করেছেন, তাদের হিরো ট্রিটমেন্ট দেওয়া হচ্ছে।’
যথাযথ আইনি কাঠামো না থাকার দায়ভার কে বা কারা নেবে? এই সেদিনও যারা সরকারে ছিলেন, তাদের মুখে খেদোক্তি শুনে অসহায় বোধ করা ছাড়া গত্যন্তর দেখি না। জামিন দেবার ব্যাপারে বিচারককে আগপিছ ভাববার কারণ জানতে বিশেষজ্ঞ হতে হয় না। আওয়ামী লীগ আমলের শেষ এক যুগে বিরোধী দল ও মতের ওপর নির্বিচার হামলা ও মামলার খবর সকলের জানা। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে বিরুদ্ধমতের প্রতি একই ধারাবাহিকতা বিভাজিত রাজনৈতিক সংস্কৃতিরই সম্প্রসারণ মাত্র। সেই কারণে তৃণমূলের আওয়ামী লীগ কর্মী অনেকেই বিনা বিচারে মাসের পর মাস আটক রয়েছেন; জামিন পাচ্ছেন না। ভিন্নমতের সাংবাদিক, পেশাজীবী, লেখকরাও একইভাবে দেড় বছরের বেশি সময় বিনা বিচারে জেলে আটক। সংসদের প্রথম অধিবেশনের দেড় মাসে বিনা বিচারে আটক বিপুলসংখ্যক মানুষের দুর্বিষহ জীবন নিয়ে কোনো প্রশ্নই কোনো পক্ষ থেকে উত্থাপিত হলো না। ভিন্নমতের মানুষদের আইনি সুরক্ষার ব্যাপারে সরকার-বিরোধী উভয় পক্ষের আগ্রহ এখন পর্যন্ত শূন্যের কোঠায়।
ওদিকে বিচার বিভাগ পৃথককরণ নিয়ে সরকারে থাকলে এক অবস্থান, আর বিরোধী দলে থাকলে বিপরীত চিত্র। এর প্রতিফলন ঘটে জাতীয় বাজেটে বিচার বিভাগের বরাদ্দে; দুই হাজার ২০০ কোটি টাকা। একই বাজেটে শুধু বিটিভির জন্যই বরাদ্দ দুই হাজার ৫০০ কোটি টাকা! আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান এই তথ্য জানিয়ে বলেছেন, ‘যুব উন্নয়ন মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দও এর চেয়ে বেশি। এই বরাদ্দ দিয়ে বিচারকদের বেতন, প্রশাসনিক ব্যয় ও অবকাঠামো পরিচালনা অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং’ (প্রথম আলো, ৩ মে ২০২৬)।
এদিকে এজলাস কক্ষগুলোতে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে সাংবাদিকরা মুখে কালো কাপড় বেঁধে ৩ মে হাইকোর্টের সামনে মানববন্ধন করেছেন। অবাধ তথ্যপ্রবাহ নিশ্চিত করতে আদালতসহ সব পাবলিক এলাকায় সাংবাদিকদের প্রবেশাধিকার রাখা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের দায়িত্ব। অনতিবিলম্বে এই বিধিনিষেধ তুলে নেওয়া প্রয়োজন।
২.
সংসদের ভেতরে ও বাইরে জুলাই সনদ ও সংস্কার নিয়ে তুমুল বিতর্ক চলছে। বিশেষত জামায়াত ও এনসিপি অভিযোগ তুলেছে, বিএনপি সংস্কারবিরোধী অবস্থান নিয়েছে। তারা এর বিরুদ্ধে রাজপথে আন্দোলন শুরুর ঘোষণা দিয়েছে। সংসদে প্রথম অধিবেশনের শেষ দিন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, ‘জুলাই জাতীয় সনদকে পাশ কাটিয়ে সংবিধান সংস্কার কমিশন গঠনের প্রক্রিয়া ফ্রডুলেন্ট বা প্রতারণামূলক। জুলাই সনদের মূল দলিলের সঙ্গে বর্তমান কর্মকাণ্ডের কোনো মিল নেই। রাজনৈতিক সমঝোতা ছাড়া অন্তর্বর্তী সরকার এমন আদেশ কীভাবে দেয়, তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।’ এরপর তিনি যে বক্তব্য দেন, সেটা নির্বাচন নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের ঢাকঢাক গুড়গুড়ের সার্থক অনুবাদ– ‘যদি নির্বাচন হতে না দেয়, তাই আপস করে সনদে সই করেছি।’
বাস্তবতা এটিই ছিল। অন্তর্বর্তী সরকার সংস্কারের নামে অন্তত ১৩টি কমিশনের মাধ্যমে দীর্ঘসূত্রতার দোকান খুলে বসেছিল। নানা টালবাহানায় নির্বাচন পিছিয়ে আইনের শাসনকে নির্বাসনে দিয়ে দুর্বিষহ পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছিল। বিশেষত মব সন্ত্রাস বিষয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের নির্বিকারত্ব জাতিকে বিপর্যস্ত করে তুলেছিল। যে হাম রোগ নিরাময়ে তৃতীয় বিশ্বের দেশ হিসেবে বাংলাদেশ সুনাম অর্জন করেছিল; স্বাস্থ্য উপদেষ্টার অকর্মণ্যতায় সেই হামসহ মোট ১১টি রোগের টিকা দেয়নি অন্তর্বর্তী সরকার। তার মাশুল ইতোমধ্যে দেশের মানুষকে দিতে হচ্ছে। হামে এরই মধ্যে ২৯৪ শিশু প্রাণ হারিয়েছে!
এই অপরিণামদর্শী অন্তর্বর্তী সরকার জুলাই সনদ থেকে রাজনৈতিক দলগুলোর নোট অব ডিসেন্ট এড়িয়ে গণভোটের চারটি প্রশ্ন খেয়ালখুশিমতো প্রণয়ন করেছিল। জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল গোলাম পরওয়ার দাবি করেছেন, ‘গণভোটে যে চারটি প্রশ্নে নির্বাচন হয়েছে, সেখানে নোট অব ডিসেন্ট ছিল না। যার অর্থ হলো, পাঁচ কোটি মানুষ ভোট দিয়ে বিএনপির নোট অব ডিসেন্টকে খারিজ করে সংস্কারের ৪৮টি পরিবর্তনের পক্ষে ভোট দিয়েছেন’ (যুগান্তর, ৪ মে, ২৬)।

নোট অব ডিসেন্ট কোন প্রক্রিয়ায় ছিল না; সেই প্রশ্নের উত্তরেই প্রতারণার ঠিকুজির সন্ধান মিলবে। ৯ মাস ধরে আলোচনা ফেঁদে অন্তর্বর্তী সরকার নিজ দায়িত্বে রাজনৈতিক দলের নোট অব ডিসেন্ট হাওয়া করে দিল!
৩.
এনসিপির কনভেনশনে নাহিদ ইসলাম বলেছেন, ‘স্বাধীনতার ৫৪ বছর পরও সংসদে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ-বিপক্ষ নিয়ে বিভাজন থাকা কাম্য নয়।’ অবশ্যই কাম্য নয়; বাস্তবতা হচ্ছে, অন্তর্বর্তী সরকার মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ-বিপক্ষের এই বিভাজন জাতির কাঁধে চাপিয়ে দিয়েছে। আর সেটাকে সমর্থন করে এসেছিল জামায়াত ও এনসিপি।
স্বীকার্য, আওয়ামী লীগ মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ-বিপক্ষ নিয়ে রাজনীতি করেছে। বিরোধীদের বিএনপি-জামায়াত ট্যাগ দিয়ে রাজাকারও বলা হতো। একই ধারাবাহিকতায় অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষে কথা বললেই ফ্যাসিবাদের দোসর ট্যাগ দেওয়া হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের নিত্যনতুন ইতিহাস হাজির করে সামাজিক মাধ্যম ও সংবাদমাধ্যমে বঙ্গবন্ধুসহ জাতীয় নেতাদের অপমান ও মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহাসিক অনিবার্যতাকেই প্রশ্নের মুখে ফেলে দেওয়ার অপচেষ্টা চলেছে। ইতিহাসের অজর সাক্ষী ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের বাড়িটি তিন দফায় বুলডোজার দিয়ে ভাঙার এক পর্যায়ে মুহাম্মদ ইউনূস এক প্রশ্নের উত্তরে বলেছিলেন, ‘এর কারণ তাঁর মেয়েকে জিজ্ঞেস করুন।’
মুক্তিযুদ্ধ, বঙ্গবন্ধু বা দেশের ইতিহাসের স্মারকগুলো কোনো দলীয় বা ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। মুক্তিযুদ্ধের প্রসঙ্গ এলেই তাকে চেতনা ব্যবসা আখ্যার মধ্য দিয়ে মু্ক্তিযুদ্ধকেই তুচ্ছ করবার সচেতন চেষ্টা লক্ষ্য করা গেছে। বস্তুত বাহাত্তরের সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতা, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও জাতীয়তাবাদ– এই চার স্তম্ভের প্রতিই সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গি রাজনীতির মূল বিবাদ। আর তাই বাহাত্তরের সংবিধান প্রশ্নে সাম্প্রদায়িক শক্তির এত আপত্তি।
রাজনৈতিক বিরোধ রয়েছে বলেই যেমন মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বিতর্ক, তেমনি মানবাধিকার প্রশ্নেও নানা অসংগতি বর্তমানে আমরা লক্ষ্য করছি। আপন মত ও বলয়ের মানুষদের রক্ষার জন্য সকল আইন মানবাধিকার; ভিন্নমতের মানুষ সেই আওতায় পড়ে না। অন্তত গত দুই বছরে কারাগারে আটক বিপুল ভিন্নমতাবলম্বী মানুষকে বিনা বিচারে আটক এবং জামিন না পাওয়ার ঘটনায় তা-ই মনে হয়। রাজনৈতিক বিতর্কের সারাৎসার– ‘সব মানি, তালগাছ আমার’ প্রবাদকেই মনে করিয়ে দেয়।
রাজনৈতিক দলগুলো যখন প্রত্যেকের নাগরিক অধিকার ও আইনি সুরক্ষার সীমা মেনে নেওয়ার মানসিকতায় উত্তীর্ণ হবে; তখনই প্রকৃত মানবাধিকার প্রতিষ্ঠিত হবে। এর জন্য কোনো সনদে স্বাক্ষর করবার প্রয়োজন নেই।
মাহবুব আজীজ: উপসম্পাদক, সমকাল; সাহিত্যিক
[email protected]
- বিষয় :
- মাহবুব আজীজ
- এনসিপি
