আন্তর্জাতিক
ইসরায়েল কি যুক্তরাষ্টের জন্য রাজনৈতিক বোঝা?
যুক্তরাষ্ট্রে ইসরায়েলবিরোধী বিক্ষোভ
মো. আবু নাসের
প্রকাশ: ০৬ মে ২০২৬ | ১৬:৪৩
ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক অঙ্গনে একটি পুরনো প্রবাদ প্রচলিত আছে: ‘যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি দেশের সীমানাতেই এসে থেমে যায়।’ দশকের পর দশক ধরে এর অর্থ ছিল এই যে, করের হার বা স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকানদের মধ্যে যত মতবিরোধই থাকুক না কেন, ইসরায়েলের প্রতি দ্ব্যর্থহীন সমর্থন জানানোর ক্ষেত্রে তারা সব সময় কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়িয়ে যাবে। ২০২৬ সালে এসে এই সীমানা ভেঙে পড়ছে বলে মনে হচ্ছে। ইসরায়েলের সঙ্গে ‘অটুট বন্ধন’ এখন আর কোনো রাজনৈতিক ধ্রুবসত্য নয়। এটি এখন এমন এক বিতর্কের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে যা আমেরিকার প্রধান দুটি রাজনৈতিক দলকে বিভক্ত করে ফেলছে। মাত্র কয়েক বছর আগেও এটা ছিল অকল্পনীয়।
ডেমোক্র্যাটিক পার্টির অভ্যন্তরে নাটকীয় পরিবর্তনটি ঘটছে। একসময় যা প্রগতিশীলদের মৃদু গুঞ্জন হিসেবে শুরু হয়েছিল, তা এখন মূলধারার সম্মিলিত দাবিতে পরিণত হয়েছে। গত মাসে পরিচালিত এক জনমত জরিপের ফলাফলে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিকদের ৬০ শতাংশই এখন ইসরায়েল সম্পর্কে নেতিবাচক মনোভাব পোষণ করেন। ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে এই হার আরও বেশি। তাদের প্রায় ৮০ শতাংশই ইসরায়েল সম্পর্কে নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ করেছেন। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর প্রতি ৫৯ শতাংশ আমেরিকানের আস্থা নেই। ইহুদি রাষ্ট্র ইসরায়েলের প্রতি সমর্থন কমে যাওয়ার পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী কয়েকজন রাজনীতিকের ভূমিকা রয়েছে। মজার বিষয় হলো এদের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স নিজেই ইহুদি ধর্মালম্বী। তিনি সম্প্রতি ইসরায়েলের কাছে শত শত মিলিয়ন ডলারের অস্ত্র বিক্রি আটকে দেয়ার চেষ্টা করেছিলেন। তাঁর যুক্তি ছিল, মার্কিনিরা চান না যে তাদের করের অর্থ ‘মধ্যপ্রাচ্যে নিরপরাধ নারী ও শিশুদের হত্যায় ব্যবহৃত হোক।’
তবে সবচেয়ে বিস্ময়কর ঘটনাটি হলো রিপাবলিকান পার্টির অভ্যন্তরে ইসরায়েল সম্পর্কে সংশয় ক্রমশঃই বেড়ে চলেছে। গ্র্যান্ড ওল্ড পার্টি (জিওপি) নামে পরিচিত এই দলটিকে ঐতিহ্যগতভাবে ইসরায়েলের সবচেয়ে জোরালো রক্ষক হিসেবে মনে করা হয়। যদিও জিওপির মূল নেতৃত্ব মূলত এখনো ইসরায়েলপন্থীদের হাতেই রয়ে গেছে, তবুও দলটির শক্তিশালী ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ অংশটি এই মৈত্রী সম্পর্ককে এখন একটি কৌশলগত বোঝা হিসেবে দেখতে শুরু করেছে। টাকার কার্লসনের মতো খুবই প্রভাবশালী রক্ষণশীল মিডিয়া ব্যক্তিত্বরাও ইসরায়েলের সমালোচনা করছেন। গত বছরের ডিসেম্বর মাসে কাতারের দোহাতে অনুষ্ঠিত এক সম্মেলনে কার্লসন ইসরায়েলকে ‘সম্পূর্ণ তুচ্ছ একটি দেশ’ হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি বলেন যে, বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের সহায়তার বিনিময়ে দেশটি যুক্তরাষ্ট্রকে ‘কিছুই’ দিচ্ছে না। সম্প্রতি দক্ষিণ ইরানের মেয়েদের একটা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় প্রায় দেড়শো শিশু নিহত হওয়ার পর কার্লসন বলেন, ‘আপনি যদি এমন কোনো দেশে বসবাসরত অবস্থায় সকালে ঘুম থেকে ওঠেন, যে দেশটি মনে করে যে কেবল সামরিক কর্মকর্তাদেরই নয়, বরং তাদের কন্যাদেরও হত্যা করাটা গ্রহণযোগ্য, তবে সেই দেশের জন্য লড়াই করাটা অর্থহীন।’ কার্লসনের মতো আরো অনেক রক্ষণশীল জাতীয়তাবাদী বিশ্লেষক মনে করেন যুক্তরাষ্ট্রকে এমন সব আঞ্চলিক সংঘাতের দিকে টেনে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, যা আদতে আমেরিকার স্বার্থ রক্ষা করে না।
ওয়াশিংটনে এই বিতর্ক ক্রমশ জোরালো হয়ে উঠছে যে ইসরায়েলের নেতৃত্বই যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের যুদ্ধের পথে ঠেলে দিয়েছে। বেশ কয়েকজন ডেমোক্র্যাটিক নেতা, এমনকি কিছু রক্ষণশীল সংশয়বাদীও, এখন প্রকাশ্যে বলছেন ট্রাম্প প্রশাসনের আগ্রাসী আঞ্চলিক নীতিগুলো বেনইয়ামিন নেতানিয়াহুর দ্বারা ব্যাপকভাবে প্রভাবিত ছিল। এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে তা তার নির্দেশেই নির্ধারিত হয়েছিল। সমালোচকদের যুক্তি হলো, ইরানের সাথে সম্পাদিত পারমাণবিক চুক্তি থেকে সরে আসা এবং পরবর্তীকালে সামরিক উত্তেজনা বৃদ্ধি-এসবই ছিল কৌশল। যুক্তরাষ্ট্রের স্থিতিশীলতাকে বিপন্ন করার বিনিময়ে ইসরায়েলের নিরাপত্তা লক্ষ্যগুলো পূরণের উদ্দেশ্যেই এসব কৌশল সাজানো হয়েছিল। এরিজোনা থেকে নির্বাচিত সিনেটর মার্ক কেলি সম্প্রতি যেমনটি উল্লেখ করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল বর্তমানে নিজেদের এমন এক পরিস্থিতির মুখোমুখি দেখতে পাচ্ছে, যেখানে তারা ‘কোনো সুনির্দিষ্ট কৌশল ছাড়াই ইরানের বিরুদ্ধে এক যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে।’ এই পরিস্থিতির জন্য অনেকেই যুক্তরাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় একজন বিদেশি নেতার অত্যধিক প্রভাবকেই দায়ী করছেন।
ঐতিহাসিকভাবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সম্পর্ককে ‘স্নায়ুযুদ্ধের আবশ্যকতা’ হিসেবে দেখা হত। ১৯৭৩ সালের ইয়ম কিপুর যুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলের প্রধান পৃষ্ঠপোষক হিসেবে আবির্ভূত হয়। সোভিয়েত প্রভাবের বিরুদ্ধে তখন ইসরায়েলকে একটি গণতান্ত্রিক দুর্গ হিসেবে গণ্য করা হতো। প্রায় পঞ্চাশ বছর ধরে আমেরিকার সব রাজনীতিকের জন্য ইসরায়েলকে সমর্থন করা নিছক কোনো রাজনৈতিক পছন্দ ছিল না; বরং এটি ছিল তাদের জন্য একটি মৌলিক অপরিহার্যতা। এ বিষয়ে নিজেদের দলের অভ্যন্তরে কোনো ভিন্নমত বা বিরোধিতার সুযোগ ছিলো না। তবে বর্তমান পরিস্থিতিকে অনেকটা ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় ডেমোক্র্যাটিক দলের অভ্যন্তরে দেখা দেওয়া বিভাজনের সাথে তুলনা করা যায়। ১৯৬০-এর দশকে যেমন 'নিউ লেফট' বা নব্য বামপন্থীরা সামরিক হস্তক্ষেপকে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছিলেন ঠিক তেমনি এখনকার উদীয়মান 'নিউ লেফট' গোষ্ঠী ইসরায়েলের সাথে জোটের নৈতিক ও আর্থিক মূল্য নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। ইসরায়েলের প্রতি আনুগত্যের ক্ষেত্রে এটি একটি মৌলিক পালাবদল। যুক্তরাষ্টের অধিকতর তরুণ ও বৈচিত্র্যময় ভোটাররা এই পরিবর্তনের মূল অনুঘটক। এই ভোটাররা ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাতকে স্নায়ুযুদ্ধের নিরাপত্তা ভাবনার পরিবর্তে সামাজিক ন্যায়বিচার ও মানবাধিকারের দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করে।
তরুণ ভোটাররা এই সম্পর্কের আর্থিক দিকটিও নির্মোহভাবে বিচার করার চেষ্টা করছেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে এখন পর্যন্ত ইসরায়েল যুক্তরাষ্ট্র থেকে একক দেশ হিসেবে সবচেয়ে বেশি সহায়তা পেয়ে আসছে। মুদ্রাস্ফীতির সাথে সমন্বয় করে হিসাব করলে এই সহায়তার মোট পরিমাণ ৩১৭ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি। সর্বশেষ সম্পাদিত চুক্তি অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্র প্রতি বছর ইসরায়েলকে সামরিক ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা খাতে প্রায় চার বিলিয়ন ডলার অর্থায়ন করে থাকে। বিষয়টিকে সহজভাবে বোঝাতে গেলে বলা যায়, ইসরায়েলের সমগ্র সামরিক বাজেটের প্রায় ১৬ শতাংশই কার্যত যুক্তরাষ্ট্রের করদাতাদের অর্থ দিয়ে মেটানো হয়। অনেক আমেরিকানের কাছেই এই পরিসংখ্যানগুলো এখন আর কেবল হিসাবের খাতায় লেখা কিছু সংখ্যা মাত্র নয়। দেশের অভ্যন্তরে যখন অর্থনৈতিক সংকট চলছে, তখন এই বিষয়গুলো তাদের মনে গভীর ক্ষোভ ও অসন্তোষের জন্ম দিচ্ছে।
মার্কিন নেতারা বর্তমানে এক অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ও বিপদসংকুল পথে হাঁটছেন। সিনেটর চাক শুমার এবং সিনেটর জন ফেটারম্যানের মতো কয়েকজন নেতা ইসরায়েলকে সমর্থন দিয়ে গেলেও, পরিস্থিতির গতিপথ যে স্পষ্টতই পরিবর্তিত হচ্ছে তা এখন দিবালোকের মতো পরিষ্কার। ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর গ্যাভিন নিউসামের মতো প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বরা এমন ইঙ্গিত দিচ্ছেন যে ইসরায়েলকে দেওয়া ‘শর্তহীন’ আর্থিক ও সামরিক সহায়তার দিন এখন শেষ হয়ে এসেছে।
বর্তমানের এই পরিস্থিতি ১৯৫৬ সালের সুয়েজ সংকটের কথা মনে করিয়ে দেয়। যুক্তরাষ্ট্র তখন তার মিত্রদের স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছিল যে তাদের ধৈর্যের আর আর্থিক সামর্থ্যের একটা নির্দিষ্ট সীমা রয়েছে। তবে আজকের পরিস্থিতির মূল পার্থক্যটি হলো, বর্তমানে এই চাপটি আসছে খোদ মার্কিন ভোটারদের ভেতর থেকেই। ইসরায়েলকে সমালোচনার হাত থেকে আড়াল করে রাখা দ্বিদলীয় ঐক্যের দেয়ালটিতে কেবল ফাটলই ধরে নি বরং মার্কিন তরুণ প্রজন্মের এক নতুন অংশ সেই দেয়ালটির ইট পাথর খুলে একে ভেঙে ফেলছে। এই তরুণরা এমন একটি অচলাবস্থাকে ক্রমাগত অর্থায়ন করতে করতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছে, যে অচলাবস্থায় তাদের আর বিন্দুমাত্র বিশ্বাস নেই। বার্তাটি অত্যন্ত স্পষ্ট। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যকার সম্পর্কটি এখন আর কোনো পবিত্র বা অলঙ্ঘনীয় বিষয় নয়। এটি এখন একটি রাজনৈতিক বোঝা বা দায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। মার্কিন রাজনীতির জগতে এ ধরনের বোঝা বা দায়কে শেষমেশ ছুঁড়ে ফেলে দেয়াই হয়।
ড. মো. আবু নাসের: যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটি, বেকার্সফিল্ড- এর কমিউনিকেশনস বিভাগের চেয়ারপার্সন
- বিষয় :
- ইসরায়েল
- যুক্তরাষ্ট্র
- আন্তর্জাতিক
