সমকালীন প্রসঙ্গ
ধর্মের অপব্যবহার, রাজনীতি এবং পৃথিবীর আর্তনাদ
আনুশেহ আনাদিল
প্রকাশ: ১১ মে ২০২৬ | ২০:০৬
আজকের পৃথিবী নিজেকে আধুনিক বলে পরিচয় দেয়। আমরা বলি- আমরা জেনেছি, আমরা বুঝেছি, আমরা এগিয়েছি। কিন্তু যখন আমরা ইরান, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার উত্তেজনার দিকে তাকাই, তখন মনে হয়, এই অগ্রগতি হয়তো আংশিক, অসম্পূর্ণ। কারণ আমাদের প্রযুক্তি বদলেছে, কিন্তু আমাদের সংঘাতের ভাষা এখনও সেই পুরনো-ধর্ম, পরিচয় ও ক্ষমতার ভাষা।
এই অঞ্চলের সংঘাতকে আমরা অনেক সময় ‘ভূ-রাজনীতি’ বলে সহজভাবে ব্যাখ্যা করি। কিন্তু বাস্তবে এটি এক জটিল জাল, যেখানে ধর্মীয় বিশ্বাস, রাজনৈতিক কৌশল, অর্থনৈতিক স্বার্থ, এবং বৈশ্বিক ক্ষমতার ভারসাম্য একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে আছে।
ধর্ম এখানে একটি কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করে, কিন্তু তা একমাত্র কারণ নয়। বরং, ধর্ম অনেক সময় শক্তিশালী কাঠামো, যার ভেতরে রাজনীতি নিজের ভাষা খুঁজে পায়। ইসরায়েলের ক্ষেত্রে, রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের সঙ্গে ধর্মীয় ইতিহাসের একটি গভীর সংযোগ রয়েছে। ইহুদি জনগোষ্ঠীর একটি অংশ এই ভূখণ্ডকে তাদের প্রতিশ্রুত ভূমি হিসেবে দেখে, যা তাদের ধর্মীয় ঐতিহ্যের অংশ। এই বিশ্বাস অনেকের কাছে আধ্যাত্মিক সত্য, আবার রাজনীতির দৃষ্টিতে এটি ভূমি, সীমান্ত, এবং নিরাপত্তার প্রশ্নের সঙ্গে মিশে যায়।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে বিশেষ করে কিছু ইভানজেলিক্যাল খ্রিস্টান গোষ্ঠী মধ্যপ্রাচ্যের ঘটনাগুলোকে একধরনের ধর্মীয় ভবিষ্যদ্বাণীর আলোকে দেখে। তাদের বিশ্বাস, এই অঞ্চলের অস্থিরতা এক বৃহৎ ‘শেষ সময়ের’ অংশ, যেখানে যীশু খ্রিস্ট পুনরাগমন করবেন। এই বিশ্বাস ব্যক্তিগত আধ্যাত্মিকতার জায়গা থেকে শুরু হলেও, এটি কখনো কখনো রাজনৈতিক অবস্থান ও পররাষ্ট্রনীতিতে প্রভাব ফেলে।
ইরানের ক্ষেত্রে, রাষ্ট্রীয় কাঠামোই ইসলামি বিপ্লবের মাধ্যমে গড়ে উঠেছে। সেখানে ধর্ম শুধু ব্যক্তিগত বিশ্বাস নয়—তা রাষ্ট্রীয় পরিচয়, আইন, এবং রাজনৈতিক দর্শনের অংশ। অনেক মুসলমান বিশ্বাস করেন, এই অস্থিরতার ভেতরেই একদিন আগমন ঘটবে ইমাম মাহদির, যিনি অন্যায় দূর করে ন্যায় প্রতিষ্ঠা করবেন।
এই তিনটি শক্তি: ইরান, ইসরায়েল, এবং যুক্তরাষ্ট্র তিনটি ভিন্ন ধর্মীয় ও রাজনৈতিক বর্ণনা বহন করে। কিন্তু বাস্তবে, এই বর্ণনাগুলো প্রায়ই একে অপরের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে যায়। এখানেই আসে রাজনীতির কঠিন বাস্তবতা।
বিশ্ব রাজনীতি কখনোই কেবল নৈতিকতা বা বিশ্বাস দিয়ে পরিচালিত হয় না। এর ভেতরে থাকে শক্তির ভারসাম্য, সামরিক ক্ষমতা, জ্বালানি সম্পদ, এবং কৌশলগত অবস্থান। মধ্যপ্রাচ্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ কারণ এটি বিশ্বের অন্যতম প্রধান তেল ও গ্যাসের উৎস।
এই অঞ্চলের উপর প্রভাব রাখা মানে শুধু একটি দেশের উপর প্রভাব রাখা নয়—বরং পুরো বিশ্বের অর্থনীতির একটি বড় অংশকে প্রভাবিত করা।
এই বাস্তবতায়, ধর্ম অনেক সময় ‘ন্যায্যতার ভাষা’ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। অনেক সময় রাজনৈতিক সিদ্ধান্তকে ‘ঈশ্বরনির্ধারিত’ বলা সহজ, কারণ তখন তা সমালোচনার বাইরে চলে যায়।
এখানেই বিপদ।
এটি বলা গুরুত্বপূর্ণ যে, সব মানুষ বা সব গোষ্ঠী এইভাবে চিন্তা করে না। ইসরায়েল, যুক্তরাষ্ট্র, কিংবা ইরান—প্রতিটি দেশেই ভিন্ন মত, ভিন্ন কণ্ঠস্বর রয়েছে। অনেক মানুষই শান্তি, সহাবস্থান, এবং যুক্তির পক্ষে কথা বলে।
কিন্তু ক্ষমতার কেন্দ্রগুলো প্রায়ই সেই কণ্ঠস্বরকে ছাপিয়ে যায়। এর প্রভাব শুধু রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ থাকে না—তা ছড়িয়ে পড়ে আমাদের দৈনন্দিন জীবনে।
তেলের দাম বাড়ে, কারণ সংঘাত সরবরাহকে অনিশ্চিত করে তোলে। অর্থনীতি কেঁপে ওঠে, কারণ বিনিয়োগ ও বাণিজ্য ঝুঁকির মুখে পড়ে। শক্তি সংকট দেখা দেয়, কারণ জ্বালানির উপর নির্ভরতা আমাদের ভঙ্গুর করে তোলে।
বাংলাদেশের মতো দেশেও এর প্রভাব স্পষ্ট—বিদ্যুতের চাপ, জ্বালানির দাম, জীবনযাত্রার ব্যয়—সবকিছুই এর সঙ্গে যুক্ত। অন্যদিকে, পরিবেশের উপর এর প্রভাব আরও গভীর। যুদ্ধ মানে শুধু মানুষের মৃত্যু নয়—তা মানে ভূমির ধ্বংস, পানির দূষণ, বায়ুর বিষাক্ততা।
যে পৃথিবী আমাদের বাঁচিয়ে রাখে, সেই পৃথিবীই ধীরে ধীরে ক্ষতবিক্ষত হয়ে যায়। এই প্রেক্ষাপটে, একটি বড় প্রশ্ন উঠে আসে— আমরা কি সত্যিই ধর্মের জন্য লড়ছি, নাকি ক্ষমতার জন্য? ধর্ম যদি মানুষের ভেতরের নৈতিকতা জাগ্রত করার জন্য হয়, তবে তা কেন বিভাজনের কারণ হয়ে দাঁড়ায়?
এই প্রশ্নগুলো অস্বস্তিকর, কিন্তু প্রয়োজনীয়। কারণ প্রশ্ন ছাড়া কোনো সমাজ এগোয় না। প্রশ্ন ছাড়া কোনো সত্য উন্মোচিত হয় না। আজকের বিশ্বে, যেখানে আমরা বিভিন্ন ধর্মের মধ্যে সাদৃশ্য দেখতে পাচ্ছি—ভালোবাসা, ন্যায়, করুণা—সেখানে আমরা এখনো বিভক্ত হয়ে আছি ব্যাখ্যার পার্থক্যে।
এই বিভাজনকে যদি রাজনীতি ব্যবহার করে, তবে তা আরও গভীর হয়। তাই আজকের সবচেয়ে জরুরি কাজ হলো—সচেতন হওয়া। অন্ধভাবে বিশ্বাস করা নয়, বরং বুঝে বিশ্বাস করা। কোনো বর্ণনাকে প্রশ্নাতীত ধরে নেওয়া নয়, বরং তার ভেতরের উদ্দেশ্য খুঁজে দেখা।
এটি ধর্মের বিরুদ্ধে নয়। এটি ধর্মকে অপব্যবহার করার বিরুদ্ধে। হয়তো সত্যিকারের আধ্যাত্মিকতা এখানেই, যেখানে মানুষ নিজেকে প্রশ্ন করতে সাহস পায়। যেখানে সে অন্যের বিশ্বাসকে সম্মান করে, কিন্তু নিজের চিন্তাকে বন্ধ করে না। আমরা যদি এই পথে হাঁটতে পারি, তবে হয়তো একদিন এই সংঘাতের ভাষা বদলাবে।
যুদ্ধের ভাষা থেকে সংলাপের ভাষায়। ভয়ের ভাষা থেকে বোঝাপড়ার ভাষায়। ক্ষমতার ভাষা থেকে মানবতার ভাষায়। শেষ পর্যন্ত, এই পৃথিবী, এই মাটি, এই বাতাস, এই পানি- কোনো এক জাতি, কোনো এক ধর্ম, বা কোনো এক রাষ্ট্রের নয়।
এটি আমাদের সবার। আর যদি আমরা এই সত্যটি ভুলে যাই, তবে আমাদের সব ধর্ম, সব রাজনীতি, সব উন্নয়ন, সবই অর্থহীন হয়ে যাবে। কারণ ধ্বংসস্তূপের উপর কোনো বিশ্বাস টিকে থাকে না।
আনুশেহ আনাদিল: সংগীতশিল্পী ও সমাজকর্মী
- বিষয় :
- ইরান যুদ্ধ
