নেপাল
বলেন্দ্র সরকারের সংস্কারমূলক নীতি কতটা বাস্তবসম্মত
প্রিয়াশা মহার্জন ও আয়ুষ্মা মহার্জন
প্রকাশ: ১২ মে ২০২৬ | ১৪:১৭ | আপডেট: ১২ মে ২০২৬ | ১৭:৪৭
সম্প্রতি আমরা দুজনে অর্থনৈতিক ইতিহাসবিষয়ক বেশ কয়েকটি বই পড়ছি। পড়তে গিয়ে আমরা বার্নার্ড ম্যান্ডেভিলের মতো বিশিষ্ট চিন্তাবিদদের কথা জানতে পেরেছি, যাঁদের ধারণা পরবর্তীকালে অ্যাডাম স্মিথ ও ফ্রেডরিক এ. হায়েকের মতো বিখ্যাত অর্থনীতিবিদরা বিকশিত করেছিলেন। তাঁদের যুক্তিটি সহজ– কোনো কিছু উপর থেকে চাপিয়ে দেয়ার মধ্যদিয়ে সমাজ গড়ে উঠে না; বরং ব্যক্তির দৈনন্দিন কার্যকলাপই এখানে মুখ্য বিষয়। প্রত্যেকে তার নিজের প্রয়োজন, সীমাবদ্ধতা এবং প্রণোদনার প্রতি সাড়া দেয়। কোনো একক নীতি নির্ধারক, কোনো কমিটি, কোনো মন্ত্রণালয়ই এই জটিলতাকে পুরোপুরি বুঝতে বা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। আর যখন নীতি এর বিপরীত কিছু ধরে নেয়, তখন তা ব্যর্থ হতে শুরু করে।
নেপালের নীতি নির্ধারণে আমরা দীর্ঘদিন ধরেই এমনটা দেখে আসছি। আর দুঃখজনক ব্যাপার হল, এখনও সেই ধারা বহাল রয়েছে। নেপালের শিক্ষাখাতে গত কয়েক সপ্তাহে যা ঘটেছে, তা খেয়াল করুন। সরকার বেসরকারি স্কুলের ফি নিয়ন্ত্রণের পদক্ষেপ নিয়েছে, বারবার ভর্তি ফি নেওয়া নিষিদ্ধ করেছে এবং অবৈধভাবে আদায় করা অর্থ ফেরত দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। এর উদ্দেশ্যটি বোধগম্য; শিক্ষা সাশ্রয়ী হওয়া উচিত এবং শোষণ বন্ধ করা দরকার।
কিন্তু বাস্তবে কী ঘটছে তা দেখুন। স্কুলগুলো বিভিন্ন খাতে ফি নেওয়া অব্যাহত রেখেছে। কিছু স্থানীয় কর্তৃপক্ষ কেন্দ্রীয় নির্দেশাবলীকে উপেক্ষা করছে। নিয়ম না মানা, লোভ এবং নিয়ম এড়িয়ে চলার চেষ্টার জন্য স্কুলগুলোকে সাধারণত দোষারোপ করা হয়। কিন্তু খুব কম লোকই একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন করছে। সেটি হল, স্কুলগুলো শুরুতেই নিয়ম ভাঙছে কেন? এটা কি শুধুই খারাপ আচরণ? নাকি এমনও হতে পারে যে, একটি স্কুল চালানোর খরচ—শিক্ষকদের বেতন, পরিকাঠামো, পাঠ্যক্রম-বহির্ভূত কার্যক্রম এবং প্রশাসনিক ব্যয়—নীতিমালায় যা ধরা হয়েছে তার চেয়ে বেশি? কর্তৃপক্ষ কি এই বাস্তবতাগুলো বোঝে?
যখন নীতিমালা এই বাস্তবতাগুলোকে উপেক্ষা করে, তখন তা সমস্যার সমাধান করে না, বরং কেবল সেটিকে স্থানান্তরিত করে। এক্ষেত্রে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের মানিয়ে নেয়। যেমন—অভিযোগের নতুন নামকরণ করে বা বিকল্প পথ খুঁজে বের করে। এর ফলে এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি হয় যা তখনও কার্যকর থাকে, কিন্তু তার পদ্ধতিগুলো কম স্বচ্ছ এবং নিয়ন্ত্রণ করা আরও কঠিন হয়ে পড়ে।
নীতিগত অসামঞ্জস্য অন্যান্য ক্ষেত্রেও ঘটেছে। সরকারি পরিষেবার কথাই ধরুন। সপ্তাহের শেষে পরিষেবা বন্ধ রাখার একটি ঢালাও সিদ্ধান্ত প্রশাসনিকভাবে যুক্তিযুক্ত মনে হতে পারে, কিন্তু এটি মানুষের চাহিদার অনিশ্চয়তার বিষয়টি উপেক্ষা করে। অসুস্থতা অফিসের সময়সূচী মেনে চলে না। ফলে, নাগরিকদের সরকারি হাসপাতালগুলোতে দীর্ঘ সারি এবং বিলম্বের সম্মুখীন হতে হচ্ছে। এর কারণে স্বাস্থ্য পরিষেবা প্রদানকারীদের প্রতি হতাশা সৃষ্টি হয়েছে। অনেকের জন্য, এটি তাদেরকে অনানুষ্ঠানিক পরিষেবা প্রদানকারীদের দিকে ঠেলে দিতে পারে।
এই প্রতিটি ক্ষেত্রেই যুক্তিটা একই। রাষ্ট্র উপর থেকে সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছে। কাঠামোগত সমস্যা সংশোধনের উদ্দেশ্যে প্রণীত হলেও, নীতিগুলো শেষ পর্যন্ত সমস্যাটির সমাধান না করে বরং একটি নতুন সমস্যাকে কেন্দ্র করে জনআচরণে নতুন রূপ দেয়। মানুষ মানিয়ে নেয়, খাপ খাইয়ে নেয় এবং প্রয়োজন হলে ব্যবস্থাটিকে পাশ কাটিয়ে যায়।
স্কুলগুলো চালু থাকে। রোগীরা চিকিৎসা পায়। বাজার সচল থাকে। জীবন চলতে থাকে। মানুষ মানিয়ে নেয়, কারণ অন্য কোনো উপায় নেই। স্কুল ও অভিভাবকরা নিয়মকানুন এড়িয়ে চলার উপায় খুঁজে নেয়। সরকারি ব্যবস্থা ব্যর্থ হলে রোগীরা বিকল্প খোঁজে। ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো টিকে থাকার জন্য নিজেদের মতো করে পথ খোঁজে নেয়। ব্যবস্থাটি ‘কাজ করে’ ঠিকই, কিন্তু তা অসমভাবে, অদক্ষভাবে এবং প্রায়শই অন্যায়ভাবে বহাল থাকে।
এই টানাপোড়েন মানব আচরণের কোনো ত্রুটি নয়। এটি এমন সব ব্যবস্থার এক অনুমেয় পরিণতি, যা মানুষের প্রকৃত জীবনযাত্রাকে উপেক্ষা করে। তাই আমরা যে স্থিতিস্থাপকতা দেখি, তা বিভ্রান্তিকর হতে পারে। এটি এমন এক অলিক অবস্থা সৃষ্টি করে, আমরা সমাধানের প্রায় দ্বারপ্রান্তে। সঠিক নিয়ম, সঠিক নির্দেশনা বা সঠিক নেতার মাধ্যমে জটিল সমস্যার সমাধান করা সম্ভব। কিন্তু এভাবে তা সম্ভব নয়।
হায়েক ঠিক এই ব্যাপারটি নিয়েই সতর্ক করেছিলেন। ‘জ্ঞানের ভান ধরা’ বা এই বিশ্বাস যে, নীতিনির্ধারকরা এমনভাবে ব্যবস্থাগুলো ডিজাইন করতে পারেন, যেন তারা সেগুলো পুরোপুরি বোঝেন। আর এই প্রক্রিয়ায় তারা এমন সব অনাকাঙ্ক্ষিত পরিণতি তৈরি করেন, যা জটিল ব্যবস্থাগুলোর মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে, প্রণোদনা বিকৃত করে, সম্পদের অপবণ্টন ঘটায় এবং শেষ পর্যন্ত এমন ফলাফল তৈরি করে যা প্রায়শই উদ্দিষ্ট ফলাফলের বিপরীত ঘটে।
হায়েক নীতি নির্ধারকদের জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা স্বীকার করার ক্ষেত্রে নম্রতার পক্ষে যুক্তি দিতেন। বার্নার্ড ম্যান্ডেভিল সমাজকে বিশ্বাস করতে আমাদের স্মরণ করিয়ে দিতেন যে, ব্যক্তিগত কর্মকাণ্ড, এমনকি স্বার্থপর হলেও, বৃহত্তর সামাজিক ফলাফল বয়ে আনতে পারে। এই পরিসরেই প্রতিষ্ঠানগুলো আরও কার্যকরভাবে কাজ করতে শুরু করে। উদাহরণস্বরূপ, সুকুম্বাসি পরিবারের শিশুদের বেসরকারি স্কুলগুলোর বিনামূল্যে শিক্ষা প্রদানের বিষয়ে প্যাবসনের সিদ্ধান্তটি বিবেচনা করুন। এর পেছনের উদ্দেশ্য সুনাম বা বিপণন হতেই পারে, কিন্তু এই প্রণোদনাটি একটি অর্থবহ জনহিতকর কাজ সম্পন্ন করে।
সুতরাং, কাজটি আরও বেশি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার ব্যাপার নয়। নীতি অবশ্যই বাস্তবতা থেকে শুরু হতে হবে, তত্ত্ব থেকে নয়। এতে প্রণোদনা, ব্যয় এবং আচরণের হিসাব রাখতে হবে। স্কুল, হাসপাতাল এবং জনগণকেই সিদ্ধান্ত নিতে দিন কোনটি তাদের জন্য সর্বোত্তম। যেহেতু মানুষ সর্বদা নিজের স্বার্থেই কাজ করবে, তাই আমাদের উচিত তাদের বিরুদ্ধে ক্রমাগত লড়াই করার চেষ্টা পরিহার করা, বরং এমন ব্যবস্থা গড়ে তোলা যা সেই কাজগুলো সমষ্টিগত মঙ্গলের দিকে পরিচালিত করবে। যতক্ষণ না এই সমন্বয় সাধিত হচ্ছে, নেপালের নীতিগুলো কাগজে-কলমে ভালো দেখালেও বাস্তবে ব্যর্থ হতে থাকবে। আর এটা মানুষের ব্যর্থতা নয়। এটা পরিকল্পনার ব্যর্থতা।
প্রিয়াশা মহার্জন: ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ে ডক্টরেট শিক্ষার্থী; আয়ুষ্মা মহার্জন: যুক্তরাজ্যভিত্তিক থিঙ্ক ট্যাঙ্কের নীতি গবেষক; দ্য কাঠমুন্ডু পোস্ট থেকে ভাষান্তর ইফতেখারুল ইসলাম
