আন্তর্জাতিক
কিউবা নিয়ন্ত্রণ করতে যুক্তরাষ্ট্র এত উদগ্রীব কেন
ডেবোরা স্নুকাল
প্রকাশ: ১৩ মে ২০২৬ | ১৮:০৮
কয়েক মাস ধরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কিউবার ওপর নজর রাখছেন। তিনি হুমকি দিয়ে দ্বীপরাষ্ট্রটির ওপর অতিরিক্ত নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছেন। গত কয়েক সপ্তাহে মার্কিন সামরিক বাহিনী উপকূল থেকে কয়েক ডজন গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহের কাজ পরিচালনা করেছে, যা আক্রমণের পূর্বাভাস।
কিউবা সরকার অভিবাসন, মাদক পাচার এবং কিউবান-মার্কিনদের জন্য বিনিয়োগের সুযোগের মতো কতিপয় বিষয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনা করতে প্রস্তুতির ইঙ্গিত দিয়েছে। কিন্তু কিউবার সার্বভৌমত্ব নিয়ে কোনো আপস করা যাবে না।
গত মাসে কিউবার প্রেসিডেন্ট মিগেল দিয়াজ-কানেলের সাক্ষাৎকার নেওয়ার পর মার্কিন সাংবাদিক ক্রিস্টেন ওয়েলকার বিষয়টি বুঝতে পেরেছেন বলে মনে হয়। তিনি লিখেছেন, এই ধারণার চেয়ে বেশি বিরক্তিকর আর কিছুই নেই যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কিউবার সরকারকে বলে দিতে পারে কে এর নেতৃত্ব দেবে। শুধু তাই নয়, দেশটির কী করা উচিত বা কীভাবে শাসন করা উচিত। কারণ এরই মধ্য দিয়ে দেশটির সার্বভৌমত্বের ধারণাকেই চ্যালেঞ্জ করে।
কিউবাকে নিয়ন্ত্রণ, প্রভাবিত ও জবরদস্তি করার ব্যাপারে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই মোহ দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যমান। ট্রাম্প, এমনকি স্নায়ুযুদ্ধেরও অনেক আগে থেকে ছিল। ১৯০৬ সালে প্রেসিডেন্ট থিওডোর রুজভেল্ট দ্বীপটিকে এভাবেই বর্ণনা করেছিলেন, ওই নরকীয় ছোট্ট কিউবান প্রজাতন্ত্রটার ওপর আমার রাগের কোনো সীমা নেই। ইচ্ছে করে দেশটির জনগণকে পৃথিবীর বুক থেকে নিশ্চিহ্ন করে দিই। আমরা ওদের কাছ থেকে শুধু এটুকুই চেয়েছিলাম যে, ওরা যেন নিজেদের সংযত রাখে এবং সমৃদ্ধ ও সুখী হয়, যাতে আমাদের হস্তক্ষেপ করতে না হয়। আর এখন দেখুন কী হয়, ওরা এক সম্পূর্ণ অযৌক্তিক ও অর্থহীন বিপ্লব শুরু করেছে।
দুই বৈরী প্রতিবেশীর মধ্যকার বর্তমান অচলাবস্থা বুঝতে হলে ইতিহাসের এই সম্পূর্ণ গতিপথটি খতিয়ে দেখতে হবে। যদিও ১৮২৩ সালের মনরো মতবাদের লক্ষ্য ছিল সমগ্র আমেরিকান মহাদেশে মার্কিন আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করা। আর কিউবা বরাবরই ওয়াশিংটনের বিশেষ মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল।
দ্বীপটির ‘আমেরিকানাইজেশন’:
ব্রিটেনের কাছ থেকে ১৩টি মার্কিন উপনিবেশ স্বাধীনতা ঘোষণা করার মুহূর্ত থেকেই একটি প্রবণতা দেখা দেয়। আমেরিকানরা ধরে নিয়েছিল যে কিউবা ইউনিয়নের অংশ হয়ে যাবে। একের পর এক মার্কিন প্রশাসন কিউবাকে ক্রয়, সংযুক্ত বা অন্য কোনোভাবে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করেছিল। তাদের দাবি ছিল যে এই নিয়ন্ত্রণ অনিবার্য এবং স্বাভাবিকভাবেই এটি ঘটবে। এই প্রক্রিয়াকে আত্মঘোষিত ‘সভ্যকরণ অভিযান’-এর অংশ হিসেবেও দেখা হতো।
১৮৯৮ সালে কিউবানরা যখন অবশেষে তাদের স্প্যানিশ ঔপনিবেশিক শাসকদের পরাজিত করে, তখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাদের স্বাধীনতা ব্যাহত করার জন্য হস্তক্ষেপ করে এবং দ্বীপটি দখল করে। তখন কিউবানদের অন্তত এক-তৃতীয়াংশ ছিল সাবেক দাস অথবা মিশ্র জাতিগোষ্ঠীর। কিউবার মার্কিন গভর্নর লিওনার্ড উড যুক্তি দিয়েছিলেন যে তারা স্বশাসনের জন্য প্রস্তুত নয়।
নিঃসন্দেহে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র– বিশেষ করে দক্ষিণাঞ্চলের সাবেক দাস মালিকরা– তাদের প্রতিবেশী অঞ্চলে আরেকটি হাইতি চায়নি। ১৮০৪ সালে হাইতির দাসেরা এক সহিংস বিদ্রোহের মাধ্যমে ফরাসিদের কাছ থেকে তাদের দ্বীপরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছিল, যা ছিল ফরাসি বিপ্লবের স্বাধীনতা, ভ্রাতৃত্ব ও সমতার আহ্বানেরই প্রতিধ্বনি।
১৯০২ সালে কিউবায় মার্কিন সামরিক দখলদারিত্বের অবসান ঘটে এবং কিউবা কিছু শর্তসাপেক্ষে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীনতা ঘোষণা করে। এই শর্তগুলো ভবিষ্যতে মার্কিন হস্তক্ষেপের সুযোগ দিয়েছিল। যেমন– ওয়াশিংটন মনে করলে কিউবার জনগণের কোনো দিকনির্দেশনার প্রয়োজন আছে, তখন তারা মাতব্বরি করত পারত। বাস্তবেও এমনটা প্রায়ই ঘটত। পরবর্তী দশকগুলোতে মার্কিন ব্যবসায়িক স্বার্থ কিউবার অর্থনীতির প্রতিটি খাতে গভীরভাবে ঢুকে পড়ে এবং কিউবার সরকারগুলোর ওপর তাদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে।
সাংস্কৃতিক স্তরে নতুন মার্কিন ধাঁচের শিক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে কিউবা দ্রুত ‘মার্কিনীকরণ’ হয়ে ওঠে। দ্বীপটিতে ভ্রমণের মাত্রাও বেড়ে যায়। ১৯২০-এর দশকে জনপ্রিয় ‘টেরিস গাইড টু কিউবা’ মার্কিন পর্যটকদের এই বলে আশ্বস্ত করেছিল যে তারা সেখানে নিজেদের বাড়ির মতোই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করবে। কারণ ‘হাজার হাজার কিউবান নাগরিক আমেরিকানদের মতোই আচরণ করে, চিন্তা করে, কথা বলে এবং দেখতেও মার্কিনদের মতো।’
কাস্ত্রোর লক্ষ্য:
ফিদেল কাস্ত্রোর উত্থানের সঙ্গে সঙ্গে এই সবকিছু বদলে গেল। কিউবান বিপ্লবকালে কাস্ত্রো ১৯৫৯ সালের এপ্রিলে ঘোষণা করেন যে বিপ্লবী সরকার ‘কিউবাকে কিউবায় রূপান্তরিত করবে’। তিনি ব্যাখ্যা করে বলেন, এটি ‘স্ববিরোধী’ মনে হতে পারে, কিন্তু কিউবানরা কিউবার সবকিছুকে ‘অবমূল্যায়ন’ করত। দ্বীপটির সংস্কৃতি, রাজনীতি এবং অর্থনীতির ওপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অপ্রতিরোধ্য প্রভাবের মুখে তারা ‘নিজেদের ব্যাপারে এক ধরনের সন্দেহের জটিলতায় আচ্ছন্ন’ হয়ে পড়েছিল। মার্কিন সাংবাদিক এলিজাবেথ সাদারল্যান্ডও তখন একই রকম মন্তব্য করেছিলেন যে কিউবানরা ‘উপনিবেশিত জনগোষ্ঠীর সাধারণ সাংস্কৃতিক হীনম্মন্যতায়’ ভুগছিল।
তবে উত্তর আমেরিকানদের কাছে কাস্ত্রোর এই স্পষ্ট মন্তব্যটি বড়জোর অকৃতজ্ঞতা এবং নিকৃষ্টতম ক্ষেত্রে একটি অপমান বলে মনে হয়েছিল। মার্কিন সম্প্রচারক ওয়াল্টার ক্রনকাইট যেমনটি স্মরণ করে লিখেছেন, ‘কিউবায় ফিদেল কাস্ত্রোর উত্থান মার্কিন জনগণের জন্য এক ভয়াবহ ধাক্কা ছিল। এটি কার্যত আমাদের উপকূলে কমিউনিজম নিয়ে এসেছিল। কিউবা আমেরিকানদের জন্য একটি অবকাশ যাপনের দেশ ছিল, আমরা এটিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অংশ বলে মনে করতাম।’
কিউবার বিপ্লবী প্রকল্পের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল দেশটির সার্বভৌমত্ব, স্বাধীনতা এবং জাতীয় পরিচয়ের প্রতিষ্ঠা। মহান জাতীয় বীর ও কবি হোসে মার্তির স্বপ্ন অনুযায়ী এর চালিকাশক্তি ছিল দেশটির একটি নতুন, ঐক্যবদ্ধ এবং সামাজিকভাবে ন্যায়পরায়ণ কিউবান জাতি গঠন করা।
সুতরাং কিউবানদের জন্য এটি ইতিহাসের মামলা। উত্তর আমেরিকানদের জন্য এটি আত্মপরিচয়ের বিষয়। ঐতিহাসিক লুই এ. পেরেজ লিখেছেন, তারা নিজেদের এই বলে বিশ্বাস করিয়েছিল যে, ‘একটি কল্যাণকর উদ্দেশ্য থেকেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কিউবার ওপর ক্ষমতা দখলের নৈতিক কর্তৃত্ব লাভ করেছিল।’
২০১৪ সালে ওবামা প্রশাসন যখন অবশেষে কিউবার সঙ্গে সম্পর্ক পুনঃস্থাপন করল, তখন মনে হয়েছিল যেন একটি ঐতিহাসিক পরিবর্তন ঘটছে। যুক্তরাষ্ট্র হয়তো অবশেষে কিউবার সার্বভৌমত্বকে সম্মান করবে এবং কিউবার সঙ্গে সমতার ভিত্তিতে সম্পৃক্ত হবে।
কিউবাকে পতনের দিকে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করাটা আমেরিকা কিংবা কিউবার জনগণের স্বার্থে নয়। আমরা আমাদের মধ্যকার ইতিহাস কখনোই মুছে ফেলতে পারব না, কিন্তু আমরা বিশ্বাস করি, মর্যাদা ও আত্মনিয়ন্ত্রণের সঙ্গে জীবনযাপনের জন্য আপনাদের ক্ষমতায়ন করা উচিত।
ট্রাম্প এখন কিউবা সম্পর্কে ওয়াশিংটনের চিরাচরিত নব্য-ঔপনিবেশিক দৃষ্টিভঙ্গিতে ফিরে এসেছেন। আর ঘোষণা করেছেন, তিনি দ্বীপটি নিয়ে যা খুশি তাই করতে পারেন। সম্ভবত এখন একটি নতুন পন্থা অবলম্বনের সময় এসেছে। ৬৫ বছর আগে মার্কিন-সমর্থিত বে অফ পিগস অভিযানের ভয়াবহ ব্যর্থতা যেমনটা দেখিয়েছিল, কিউবানরা তাদের স্বাধীনতা এবং নিজেদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অধিকার রক্ষা করতে এখনও প্রস্তুত।
ডেবোরা স্নুকাল: গবেষণা ফেলো, স্প্যানিশ ও লাতিন আমেরিকান স্টাডিজ বিভাগ, মেলবোর্ন বিশ্ববিদ্যালয়; দ্য কনভারসেশন থেকে ভাষান্তর ইফতেখারুল ইসলাম
- বিষয় :
- যুক্তরাষ্ট্র
- কিউবা
