ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

দিবস

পরিবারে বন্ধন, জীবনে শক্তি

পরিবারে বন্ধন, জীবনে শক্তি
×

গোলাম শওকত হোসেন 

প্রকাশ: ১৫ মে ২০২৬ | ১৬:০৬

আজ ১৫ মে আন্তর্জাতিক পরিবার দিবস। পরিবারের গুরুত্ব তুলে ধরতে, সমাজে তাদের ভূমিকাকে স্বীকৃতি দিতে এবং দারিদ্র্য, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের মতো পরিবার-সম্পর্কিত বিষয়গুলোতে সচেতনতা বাড়াতে ১৯৯৩ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ দিবসটি প্রতিষ্ঠা করে। এবারের প্রতিপাদ্য বিয়য় হচ্ছে–‘পরিবার, বৈষম্য এবং শিশুকল্যাণ’।
আলবার্ট আইনস্টাইন বলেছিলেন, ‘জীবনের এই সুন্দর ভূমিতে আপনার পরিবারের সঙ্গে আনন্দ করুন।’ তবে একটি পরিবারের মিলনমেলায় যদি কয়েক প্রজন্ম একত্রে মিলিত হতে পারে, তাহলে সেটি হবে ‘সোনায়  সোহাগা’। বিশ্বজুড়ে পরিবার, মানুষ, সম্প্রদায় ও সংস্কৃতির গুরুত্ব তুলে ধরাই এর উদ্দেশ্য। এরই মাধ্যমে আন্তঃপ্রজন্মীয় সংযোগ স্থাপন, সামাজিক অন্তর্ভুক্তি প্রচার এবং প্রবীণ নাগরিকদের কল্যাণের ওপর আলোকপাত করার মাধ্যমে তাদের ওপর একটি উল্লেখযোগ্য ইতিবাচক প্রভাব ফেলে, যা কয়েকটি উপলক্ষকে কেন্দ্র করে লক্ষ্যের দিকে ধাবিত  হয়। যেমন–

সহমর্মিতা: প্রবীণ নাগরিকরা প্রায়ই ‘পরিবারের কেন্দ্রবিন্দু’ হিসেবে নিজেদের ভূমিকা হারিয়ে ফেলেন এবং বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন, কারণ পরিবারগুলো মানসিক সংযোগের চেয়ে বস্তুগত সাফল্যকে বেশি প্রাধান্য দেয়। তারই ফলে এককালের একান্নবর্তী পরিবার থেকে বর্তমান নিউক্লিয়াস পরিবারের সৃষ্টি। পিতামাতা/দাদাদাদি/নানানানির জীবন যে একদিন নাতি বা নাতনিদের মতো শুরু হয়েছিল, এই বাস্তব সত্য যাতে একই পরিবারে কয়েক প্রজন্ম পাশাপাশি বসে খুব কাছ থেকে বুঝতে ও অনুধাবন করতে পারে– সে শিক্ষাটাই এখানে প্রাপ্তি।   

অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং শিশুদের ওপর এর প্রভাব: প্রবীণরা অবসরে যাওয়ার পর তাদের রেগুলার ইনকাম থেকে সরে এসে চিন্তাহীন মুক্ত জীবন চায়, কিন্তু বেশির ভাগ ক্ষেত্রে তা পারে না শারীরিক, মানসিক, সামাজিক বা অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতার জন্য। কিন্তু নতুন প্রজন্ম, প্রবীণদের সেই সোনালি দিনগুলোকে জানে না বা জানলেও তাকে সমবেদনা বা সহমর্মিতার সঙ্গে উপলব্ধি করতে চায় না বা পারে না। এই দিবস সেটাকে উপলব্ধির সুযোগ করে দেয়, যাতে সেও বুঝতে পারে যে একদিন সেও এরকম হবে।  
মূল্যবোধ ব্যবস্থায় পরিবর্তন: আধুনিক, দ্রুতগতির জীবনযাত্রার ফলে প্রায়ই  সংবেদনশীলতা এবং ঐতিহ্যগত মূল্যবোধের অবক্ষয় ঘটে। প্রবীণরা এক ধরনের শূন্যতা বোধ করেন যখন প্রযুক্তি ব্যক্তিগত আলাপচারিতার স্থান নেয়, এবং যখন ‘বাবা-মায়ের সাথে এক কাপ চা’ গ্যাজেট দ্বারা প্রতিস্থাপিত হয়, মিলনমেলায় তা অতীতের স্মৃতিচারণের মধ্য দিয়ে সেই মূল্যবোধকে জাগিয়ে তোলে। 

আন্তঃপ্রজন্মীয় বৈষম্য এবং ভবিষ্যৎ: প্রবীণরা যখন তরুণদের মধ্যে উচ্চ বেকারত্ব দেখেন অথবা যখন দেখেন যে তাদের নাতি-নাতনিরা তাদের মতো একই সুযোগ পাচ্ছে না, তখন তারা এক গভীর অসহায়ত্ব বোধ করেন। সেটাকে কাটিয়ে উঠতে তারা তাদের  নাতি-নাতনিদের জ্ঞান, অভিজ্ঞতা, প্রজ্ঞা, তথ্য বা সূত্র দিয়ে সাহায্য করেন, যা অর্থের বিনিময়ে ক্রয় করা যায় না। তাতে আন্তঃপ্রজন্মীয় বৈষম্য দূর হয় এবং পারিবারিক ভবিষ্যৎ সুন্দর হয়।  

জেনেটিক স্বাস্থ্য সচেতনতা: এই দিনটি পরিবারগুলোকে তাদের চিকিৎসার ইতিহাস লিপিবদ্ধ করার জন্য একটি প্রেরণা হিসেবে কাজ করে, যা বংশগত রোগের জেনেটিক ঝুঁকি শনাক্ত করার জন্য অপরিহার্য; যা বর্তমান পার্সোনালাইজড বা প্রিসিশন মেডিসিন দ্বারা প্রমাণিত। 
প্রাথমিক শনাক্তকরণ ও প্রতিরোধ: পারিবারিক ইতিহাসে প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম অনেক রোগ চলে আসে। বংশগত রোগ সম্পর্কে বুঝতে পারলে তার চিকিৎসা সহজ হয়। কারণ বর্তমান মেডিকেল সায়েন্সে প্রমাণিত যে ফ্যামিলি মেডিকেল হিস্ট্রি ছাড়া যে কোনো মেডিকেল হিস্ট্রি অসম্পূর্ণ।  

এই দিনটি পরিবারকেন্দ্রিক নীতি, পারিবারিক বন্ধন শক্তিশালীকরণ, ঘনিষ্ঠভাবে যুক্তকরণ, অবদানের স্বীকৃতি, বয়স-বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াই, মর্যাদা ও অধিকার নিশ্চিতকরণে উদ্বুদ্ধ করে। বড় বা ছোট পরিবারের অন্তত দুটি বা তিনটি প্রজন্মকে একদিনের জন্য হলেও একত্র করে একটি একান্নবর্তী পরিবারের ফ্রেমে যদি নিয়ে আসা যায়, তবে তা হবে ‘শিকড় থেকে শিখরের সম্পর্ককে সতেজ করে তোলা’, যার দ্বারা মানসিক ও শারীরিক প্রশান্তি ও উদ্যমকে আরও রিফ্রেশ বা চাঙ্গা করা যায়।   

ডা. গোলাম শওকত হোসেন: চিকিৎসক, গবেষক ও লেখক

আরও পড়ুন

×