২৩ মে
নদী রক্ষায় ‘জাতীয় নদী দিবস’ কেন নয়
সুমন শামস
সুমন শামস
প্রকাশ: ২৩ মে ২০২৬ | ০৭:১৭ | আপডেট: ২৩ মে ২০২৬ | ১২:৪৫
| প্রিন্ট সংস্করণ
বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ–এ কথাটি যেমন আমাদের জন্য গৌরবের, তেমনি এক চরম বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। আমাদের সংস্কৃতি, অর্থনীতি এবং যাতায়াত ব্যবস্থার প্রাণস্পন্দন লুকিয়ে আছে এই নদীগুলোর বুকেই। কিন্তু বিগত ৫৪ বছরের ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, এই পরম বন্ধুই শত শত পরিবারের জন্য কান্নার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। গত ৫৪ বছরে দেশের বিভিন্ন নৌপথে ছোট-বড় দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছে ২০ হাজারেরও বেশি মানুষ। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে এবং ঈদের মতো ধর্মীয় ও জাতীয় পার্বণগুলোতে যখন দক্ষিণবঙ্গের লাখো মানুষ নদীপথকে বেছে নেয়, তখন আনন্দযাত্রা রূপ নেয় গণকবরে। নদীপথের এই অনিরাপত্তা এবং অব্যবস্থাপনার বিরুদ্ধে দীর্ঘ ২২ বছর ধরে লড়াই করে আসছে সামাজিক সংগঠন ‘নোঙর’।
এই প্রেক্ষাপটে ২৩ মে-কে ‘জাতীয় নদী দিবস’ ঘোষণার দাবি কেবল একটি দিবসের আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং নদী ও মানুষের জীবন রক্ষার এক ঐতিহাসিক ও যৌক্তিক অঙ্গীকার। ২০০৪ সালের ২৩ মে চাঁদপুরের মেঘনা নদীতে ঘটে যাওয়া মর্মান্তিক দুর্ঘটনা আমাদের নৌ-ব্যবস্থাপনার কঙ্কালসার রূপটি উন্মোচন করে দেয়। চলাচলের সম্পূর্ণ অযোগ্য, ১৫৬টি ত্রুটিযুক্ত জোড়াতালির এমভি লাইটিং সান লঞ্চটি ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত যাত্রী এবং গবাদি পশু নিয়ে মেঘনার উত্তাল স্রোতে তলিয়ে যায়। এই ট্র্যাজেডিতে মা আছিয়া খাতুনের গল্পটি মানবেতিহাসের অন্যতম মর্মস্পর্শী অধ্যায়। নিজের জীবনের তোয়াক্কা না করে, শেষ মুহূর্তে সন্তানকে বাঁচানোর জন্য নদীতে ছুড়ে দিয়ে নিজে তলিয়ে যান গভীর জলে। আছিয়া খাতুন আজ বাংলার নদীমাতৃক ট্র্যাজেডিতে ত্যাগের প্রতীক। একই রাতে শুধু এমভি লাইটিং সান নয়, মেঘনার বুকেই ‘এমভি দিগন্ত’ এবং ‘এমভি মজলিমপুর’ নামে আরও দুটি লঞ্চডুবির ঘটনা ঘটে। সব মিলিয়ে সেই কালরাতে দুই শতাধিক যাত্রী প্রাণ হারায়। এই ভয়াল ২৩ মে-কে স্মরণ করেই ‘নোঙর ট্রাস্ট’ প্রতিবছর এই দিনটিকে ‘জাতীয় নদী দিবস’ হিসেবে পালন করার পাশাপাশি সরকারিভাবে ঘোষণার দাবি জানিয়ে আসছে, যেন এই নির্মম স্মৃতি আমাদের নদীপথকে নিরাপদ করার তাগিদ দেয়।
বর্তমানে সেপ্টেম্বর মাসের শেষ রোববার বিশ্ব নদী দিবস পালিত হলেও বাংলাদেশের নিজস্ব প্রেক্ষাপটে একটি ‘জাতীয় নদী দিবস’ থাকা আবশ্যক। ২৩ মে জাতীয় নদী দিবস ঘোষণার পেছনে সুনির্দিষ্ট কিছু গবেষণাধর্মী কারণ রয়েছে: নৌ-দুর্ঘটনায় নিহত হাজারো মানুষ কেবল সংখ্যার হিসাব নয়, তারা প্রত্যেকেই রাষ্ট্রীয় ও প্রাতিষ্ঠানিক অব্যবস্থাপনার শিকার। নোঙর ট্রাস্টের দীর্ঘ ২২ বছরের আন্দোলনের মূল লক্ষ্য এই নিহতদের ‘নৌ-শহীদ’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া। চাঁদপুর দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকায় একটি আধুনিক ওয়াচ টাওয়ার এবং নৌ-শহীদদের স্মরণে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের দাবি জানানো হলেও তা আজও বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষের লাল ফিতার আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় আটকে আছে। ২৩ মে জাতীয় দিবস ঘোষণা করলে এই দাবিগুলো প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পাবে এবং নদী সুরক্ষায় রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতা নিশ্চিত হবে।
জাতীয় নদী দিবস উদযাপনের মাধ্যমে প্রতিবছর বর্ষা ও উৎসবের মৌসুমে ফিটনেসবিহীন নৌযান চলাচল, অতিরিক্ত যাত্রী বোঝাই এবং চালকদের অসচেতনতার বিরুদ্ধে দেশব্যাপী বড় ধরনের ক্যাম্পেইন চালানো সম্ভব হবে। এটি প্রশাসন ও সাধারণ যাত্রী–উভয় পক্ষকেই সচেতন করবে, যা ভবিষ্যতে দুর্ঘটনা শূন্যের কোটায় নামিয়ে আনতে সাহায্য করবে। তা ছাড়া বাংলাদেশের দীর্ঘতম ও সবচেয়ে প্রমত্তা নদী পদ্মা। এটি শুধু ভৌগোলিক দিক থেকে নয়, আমাদের অর্থনীতি ও সংস্কৃতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। নোঙর ট্রাস্ট ইতোমধ্যে পদ্মাকে বাংলাদেশের ‘জাতীয় নদী’ হিসেবে ঘোষণা করেছে। ২৩ মে জাতীয় নদী দিবস হিসেবে গ্রহণ করলে পদ্মার এই গৌরবময় অবস্থানটি রাষ্ট্রীয়ভাবে সিলমোহর পাবে।
পৃথক মন্ত্রণালয়ের দাবি: বর্তমানে নদী, সমুদ্র এবং জলাশয় রক্ষার কাজগুলো পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়, নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয় এবং পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের মধ্যে খণ্ডিতভাবে বিভক্ত। ফলে সঠিক সমন্বয়ের অভাবে নদী দখল, দূষণ এবং নৌ-দুর্ঘটনা রোধে দীর্ঘমেয়াদি সুফল পাওয়া যাচ্ছে না। ব্লু-ইকোনমি (নীল অর্থনীতি) এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় নোঙর ট্রাস্ট একটি সমন্বিত ‘নদী ও সমুদ্রসম্পদ মন্ত্রণালয়’ গঠনের দাবি জানাচ্ছে। এই দাবি আদায়ে এবং নদী-সমুদ্রের আইনি অধিকার রক্ষায় নোঙর ট্রাস্ট উচ্চ আদালতে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করছে। একটি পৃথক মন্ত্রণালয় থাকলে নদীভাঙন রোধ, নাব্য বৃদ্ধি এবং জলদস্যুতা বা অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধে একক ও শক্তিশালী সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হবে।
‘নদী বাঁচান-দেশ বাঁচান, ২৩ মে জাতীয় নদী দিবস ঘোষণা করুন’–২০২৬ সালের এই প্রতিপাদ্য কেবল স্লোগান নয়, এটি বাংলাদেশের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই। নদী দখল ও দূষণমুক্ত এবং নৌপথ নিরাপদ করার মাধ্যমে আমরা আমাদের পূর্বপুরুষদের রক্তের ঋণের পাশাপাশি নদী দুর্ঘটনায় নিহত ২০ হাজারেরও বেশি মানুষের বিদেহী আত্মার প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে পারি।
নদী বেঁচে থাকলে এ দেশের কৃষি, সংস্কৃতি, অর্থনীতি এবং মানুষ বাঁচবে।
সুমন শামস: চেয়ারম্যান, নোঙর ট্রাস্ট
- বিষয় :
- নদী
