অর্থনীতি
মেগা প্রকল্পের কার্যকারিতার জন্য যা দরকার
মামুন রশীদ
মামুন রশীদ
প্রকাশ: ২৩ মে ২০২৬ | ০৭:৩২ | আপডেট: ২৩ মে ২০২৬ | ১১:২০
| প্রিন্ট সংস্করণ
আমাদের দেশে এখন ‘মেগা প্রকল্প’ শব্দটি দ্বৈত বাস্তবতার প্রতিফলক। একদিকে এগুলো উন্নয়নের উচ্চাকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করে, অন্যদিকে ভুল প্রাথমিক ব্যয় প্রাক্কলন, অদক্ষ ঠিকাদার নির্বাচন, দফায় দফায় ব্যয় বৃদ্ধি, বাস্তবায়নে অস্বাভাবিক বিলম্ব এবং প্রত্যাশিত সুফল না পাওয়ার সংস্কৃতির প্রতিফলন ঘটায়। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এসব ব্যর্থতার দায় প্রায় কখনোই নির্ধারিত হয় না।
ঢাকায় নিযুক্ত জাপানের রাষ্ট্রদূত সম্প্রতি মন্তব্য করেছেন, বাংলাদেশের মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্ব দেশের অর্থনীতির বড় ধরনের ক্ষতি করেছে। উন্নয়ন সহযোগী দেশের একজন কূটনীতিকের এমন খোলামেলা মন্তব্যকে কূটনৈতিক সৌজন্যের বাইরে গিয়ে আত্মসমালোচনার আয়নায় দেখা প্রয়োজন। কারণ উন্নয়ন সহযোগীরা শুধু অর্থায়ন করে না, তারা প্রকল্প বাস্তবায়নের দক্ষতা, সময়ানুবর্তিতা ও নীতিগত ধারাবাহিকতার ওপরও আস্থা রাখতে চায়।
প্রকল্প ব্যবস্থাপনার মৌলিক তত্ত্ব অত্যন্ত সরল। কোনো প্রকল্প তখনই গ্রহণযোগ্য, যখন তার সামাজিক ও অর্থনৈতিক সুফল ব্যয়ের চেয়ে বেশি হয়। প্রকল্পের উদ্দেশ্যই হলো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান কিংবা রাষ্ট্রীয় সম্পদ বাড়ানো। যখন একটি প্রকল্প বছরের পর বছর ঝুলে থাকে, তখন তার আর্থিক ব্যয় যেমন বাড়ে, তেমনি সম্ভাব্য সুফলও কমতে থাকে। প্রকল্পটি ধীরে ধীরে সম্পদ সৃষ্টির পরিবর্তে সম্পদ ক্ষয়ের উৎসে পরিণত হয়।
উদাহরণ হিসেবে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক কয়েকটি মেগা প্রকল্পের কথা বলা যেতে পারে। এমআরটি লাইন-১ এবং এমআরটি লাইন-৫ (উত্তর) প্রকল্পের প্রাথমিক প্রাক্কলনের তুলনায় ঠিকাদারদের দরপত্র প্রায় দ্বিগুণ ব্যয়ের ইঙ্গিত দিয়েছে। ২০১৯ সালে একনেকে অনুমোদিত ব্যয় ও বাস্তব দরপত্রের মধ্যে এত বড় ব্যবধান প্রমাণ করে যে প্রকল্প ব্যয় প্রাক্কলনের সময় বাস্তব বাজার বিশ্লেষণ ও ঝুঁকি মূল্যায়ন যথাযথভাবে করা হয়নি। ফলাফল, পুনরায় ব্যয় নির্ধারণ, পুনরায় দরপত্র এবং দীর্ঘসূত্রতা।
একই চিত্র দেখা গেছে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনালের ক্ষেত্রেও। অবকাঠামো নির্মাণ শেষ হওয়ার পরও অপারেটর নিয়োগ জটিলতায় এটি দীর্ঘ সময় কার্যকর করা যায়নি। একটি প্রস্তুত টার্মিনাল বসে থাকা মানে শুধু অবকাঠামো অব্যবহৃত থাকা নয়, সম্ভাব্য রাজস্ব হারানো, বৈদেশিক যাত্রীসেবায় প্রতিযোগিতা কমে যাওয়া এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা। উন্নয়ন অর্থনীতির ভাষায় একে বলা যায় ‘অপরচুনিটি কস্ট অব ডিলে’–অর্থাৎ বিলম্বের কারণে হারানো সম্ভাব্য অর্থনৈতিক সুবিধা।
দোহাজারী-কক্সবাজার রেললাইন, ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে কিংবা মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর–প্রায় প্রতিটি বৃহৎ প্রকল্পেই একই প্রবণতা দৃশ্যমান। প্রকল্প অনুমোদনের সময় যে সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়, বাস্তবে তা প্রায় কখনোই মানা হয় না। কখনও অর্থায়ন বিলম্বিত হয়, কখনও নকশা পরিবর্তিত হয়, কখনও চুক্তি পুনর্মূল্যায়নের সিদ্ধান্ত আসে। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, সরকার পরিবর্তনের সময় একটি ‘সিদ্ধান্তগত শূন্যতা’ তৈরি হয়, যার ফলে মাসের পর মাস প্রকল্পের অগ্রগতি স্থবির হয়ে পড়ে।
এটি কেবল প্রশাসনিক দুর্বলতা নয়, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার ঘাটতিরও প্রতিফলন। জটিল মেগা প্রকল্পে বহু অংশীজনের সঙ্গে সমন্বয়, দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য যে ধরনের দক্ষতা প্রয়োজন, আমাদের রাষ্ট্রীয় কাঠামো এখনও সেখানে কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় পৌঁছাতে পারেনি। একটি চুক্তির ছোট ধারা নিয়ে মাসের পর মাস আলোচনা চলার অর্থ হলো, সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় গতি ও দক্ষতার অভাব রয়েছে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক হলো, প্রকল্প ব্যয় বৃদ্ধি ও সময় অপচয়ের দায় শেষ পর্যন্ত বহন করেন সাধারণ করদাতারা। কারণ অতিরিক্ত ব্যয় মেটানো হয় রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে, যা মূলত জনগণের অর্থ। অথচ ব্যর্থতার জন্য প্রায় কখনোই কাউকে দায়ী করা হয় না। এ দায়হীনতার সংস্কৃতি ভাঙা ছাড়া উন্নয়ন ব্যয়ের দক্ষতা বাড়ানো সম্ভব নয়।

নতুন সরকারের কাছে তাই প্রত্যাশা হলো:
প্রথমত, প্রতিটি মেগা প্রকল্পের জন্য শক্তিশালী ও সময়সীমাভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ কাঠামো গড়ে তুলতে হবে। যে কোনো বড় জটিলতা ৩০ দিনের মধ্যে নিষ্পত্তি করার মতো উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন সমন্বয় কমিটি থাকতে হবে।
দ্বিতীয়ত, প্রকল্প ব্যয়ের প্রাথমিক প্রাক্কলনকে রাজনৈতিকভাবে ‘কম দেখানোর’ সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। আন্তর্জাতিক মানের সমীক্ষা, বাজারভিত্তিক মূল্য বিশ্লেষণ এবং স্বাধীন যাচাই ছাড়া প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া উচিত নয়।
তৃতীয়ত, প্রকল্প পরিচালকদের শুধু প্রশাসনিক সমন্বয়কারী নয়, বরং ফলাফলের জন্য দায়বদ্ধ পেশাদার হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। নির্ধারিত সময় ও ব্যয়ের মধ্যে প্রকল্প শেষ না হলে তার ব্যাখ্যা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে ঠিকাদারদের সঙ্গেও পারফরম্যান্সভিত্তিক মূল্যায়নের চুক্তি থাকতে হবে, যাতে বিলম্বের জন্য কার্যকর জরিমানার বিধান বাস্তবে প্রয়োগ করা যায়।
চতুর্থত, প্রকল্প ব্যবস্থাপনায় দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করা জরুরি। সরকারি কর্মকর্তাদের আন্তর্জাতিক প্রশিক্ষণ, বেসরকারি বিশেষজ্ঞদের অংশগ্রহণ এবং ‘প্রকল্প ম্যানেজমেন্ট অফিস (পিএমও)’ কাঠামো প্রবর্তনের মাধ্যমে এ ঘাটতি কমানো যেতে পারে।
তবে যত যা-ই করা হোক, স্বচ্ছতা ছাড়া সকলই গরল ভেল। প্রতিটি মেগা প্রকল্পের ব্যয়, অগ্রগতি, সময়সীমা ও বিলম্বের কারণ অনলাইনে জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত রাখতে হবে। প্রকল্প বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) প্রতিবেদনের বক্তব্য নীতিগত সিদ্ধান্তে প্রতিফলিত হতে হবে। সরকার পরিবর্তনের পরও যাতে চলমান প্রকল্প থেমে না যায়, সেজন্য একটি ‘জাতীয় অবকাঠামো ধারাবাহিকতা নীতি’ প্রণয়নও সময়ের দাবি। মেগা প্রকল্প কোনো রাজনৈতিক দলের নয়, এটি রাষ্ট্রের সম্পদ। রাজনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের ধারাবাহিকতা ভেঙে গেলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় পুরো অর্থনীতি।
বাংলাদেশ এখন এমন এক পর্যায়ে দাঁড়িয়ে, যেখানে উচ্চাভিলাষী প্রকল্প গ্রহণ গুরুত্বপূর্ণ। তবে প্রকৃত চ্যালেঞ্জ হলো–সেগুলো সময়মতো, ব্যয় দক্ষতার সঙ্গে এবং পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যকর করা। রাষ্ট্র যদি এখনও মেগা প্রকল্প ব্যবস্থাপনাকে রাজনৈতিক সাফল্যের প্রতীক হিসেবে দেখে, তবে ব্যয় বৃদ্ধি ও বিলম্বের চক্র চলতেই থাকবে। এটিকে অর্থনৈতিক দক্ষতা, জবাবদিহি ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার পরীক্ষাগার হিসেবে দেখা হলে উন্নয়ন যাত্রা সত্যিকার অর্থেই নতুন ভিত্তি পেতে পারে।
মামুন রশীদ: অর্থনীতি বিশ্লেষক
- বিষয় :
- মামুন রশীদ
- অর্থনীতি
- মেগা প্রকল্প
