ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

হাওরের ফসল নষ্টে পরিকল্পনা কতটা দায়ী

হাওরের ফসল নষ্টে পরিকল্পনা কতটা দায়ী
×

হাওরে বন্যার পানিতে বা কথিত ফসল রক্ষা বাঁধ ভেঙে কৃষকের পাকা ধান নষ্ট হচ্ছে। ছবি: সংগৃহীত

আবু আলা মাহমুদুল হাসান

প্রকাশ: ২৩ মে ২০২৬ | ১৬:০০

হাওর আমাদের দেশের এক বিশেষ বৈশিষ্টপূর্ণ অঞ্চল। কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, সিলেট অঞ্চলের এসব নিচু এলাকা বছরের অর্ধেক সময় থাকে জলমগ্ন, আর বাকি অর্ধেক সময় শুকনো। বর্ষায় যখন পানি থাকে, তখন দেশের স্বাদুপানির মাছের এক বড় উৎস, আর শুকনো মৌসুমে বোরো ধানের শস্য ভান্ডার হল এসব অঞ্চল। এর পাশাপাশি পাখি, বিশেষ করে জলজ ও পরিযায়ী পাখি এবং মাছের প্রজনন ক্ষেত্র, জলাবনের ধারক হিসেবে এর প্রতিবেশ, পরিবেশগত, এমনকি অর্থনৈতিক গুরুত্ব ও অপরিসীম।

হাওরে শুকনো বা বোরো মৌসুমে ধানের ফলন যেমন বেশি, তেমনই সারা বছর এই একটাই ফসল হয়। এই এক ফসলের উপরই নির্ভর করে অঞ্চলের লাখো মানুষের রুটি-রুজি। সাম্প্রতিক বছরগুলোর মতো এবারও হাওরে বন্যার পানিতে বা কথিত ফসল রক্ষা বাঁধ ভেঙে কৃষকের পাকা ধান নষ্ট হচ্ছে। মৌলভীবাজারে টানা বৃষ্টিতে হাওরে পানি বেড়েছে, বিপৎসীমার ওপরে জুড়ী নদীর পানি, ‘চোক্ষের সামনে কৃষকরার ধান ডুইব্বা যাইতাছে, কিচ্ছু করার নাই’ (প্রথম আলো ২৯ এপ্রিল ২০২৬); টানা বৃষ্টিতে তলিয়ে গেছে হাজার বিঘা জমির পাকা ধান (সমকাল, ২৯ এপ্রিল ২০২৬)। এ অঞ্চলে যেহেতু স্থানীয় বৃষ্টির পানির পাশাপাশি উজানের সমগ্র অঞ্চলের (ভারত সহ) পাহাড়ি ঢলের পানিও এসে জমা হয় তাই এখানে ঢল বা বন্যা একটি আকস্মিক, কিন্তু মৌসুমী ও নিয়মিত ঘটনা।

এখানে আগে প্রথাগতভাবে যেসব ধান চাষ হত, সেগুলোর ফলন খুব বেশি ছিল না। বাংলাদেশে প্রথমত: ইরি ও পরবর্তিতে ব্রি বা বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট এর উদ্ভাবিত উচ্চ ফলনশীল জাতের ধানচাষ সম্প্রসারিত হলে তা হাওরেও ছড়িয়ে পড়ে। এতে সেখানে ধানের উৎপাদন পরিমাণে বাড়ে, কিন্তু উচ্চ ফলনশীল ধানগুলোর গাছ হয় খাটো, অল্প পানিতেই এগুলো তলিয়ে যায়। কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, হাওরের ধান চাষের ক্ষেত্রে অসুবিধা হল সেখানে বন্যা হয় ধান পাকার সময়। কাজেই, পানির সাথে বাড়বে এমন জাত উদ্ভাবন করে এ সমস্যা সমাধান করা যাবে না। অন্যদিকে, যেহেতু বোরো ধান শীতের সময় লাগানো হয়, এটা বেশি আগেও লাগানো যায় না, তাতে ঠান্ডায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আবার শীতের সময় দিন ছোট থাকে, সাথে থাকে কুয়াশা, তাপমাত্রাও থাকে কম। তাই এ মৌসুমের জন্য খুব স্বল্প মেয়াদের ধান উদ্ভাবন করাও কঠিন। 

আকস্মিক বন্যার এ সমস্যা সমাধানে মূলত নির্ভর করা হয় মূল নদী ও জলপথ গুলোর পাশে বাঁধ দেয়ার উপর, যা সেসব পানি প্রবাহের উৎসগুলো থেকে চাষের জমিতে পানি প্রবেশ করতে দেয় না। কিন্তু যদি উজানের ঢলের পানি প্রবাহ খুব বেশি হলে বাঁধ উপচে ফসল ডুবে যায়। আরেকটি নিয়মিত সমস্যা হল, বাঁধ সঠিকভাবে তৈরি না হলে ঢলের পানির অতিরিক্ত চাপে তা ভেঙে ফসল জলমগ্ন হয়। প্রায় প্রতি বছরই এসব ফসল রক্ষা বাঁধ ভেঙে কোথাও না কোথাও হাজার হাজার একর জমির ধান নষ্ট হয়।

অন্যদিকে, এসব বাঁধ যেহেতু প্রধান জলপ্রবাহ ও ধান চাষের জমি গুলোর মাঝে বাধা সৃষ্টি করে, তাই স্থানীয়ভাবে অতিরিক্ত বৃষ্টি হলে সে পানিও সরে যেতে পারে না, জমে থাকে ও জলাবদ্ধতা সৃষ্টি করে। এর পাশাপাশি বিগত দশকগুলোতে যোগাযোগ ও উন্নয়নের নামে হাওরের বিভিন্ন স্থানে উঁচু পাকা সড়ক তৈরি করা হয়েছে। সড়কে পানি নিষ্কাশনের জন্য যে সেতু- কালভার্ট রয়েছে, তা দিয়ে এত পানি প্রবাহিত হতে পারে না। এতে সেখানকার স্বাভাবিক জলপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, রাস্তার উজানের পানি সরতে দেরি হচ্ছে, আর তৈরি হচ্ছে জলাবদ্ধতা। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর, সরাইল এসব অঞ্চলের মানুষ বলছেন, তাদের এখানে আগে কখনও পাকা ধান পানিতে তলিয়ে যেত না। কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রাম, ইটনা ও মিঠামইন অঞ্চলের হাওরের উপর দিয়ে পাকা সড়ক তৈরির পর থেকে তাদের অঞ্চলের হাওরের পানির প্রবাহ অনিয়মিত হয়ে ফসল ডুবে যাচ্ছে, আর কমে যাচ্ছে মাছের প্রাপ্তিও। 

জনশ্রুতি আছে যে, এ সড়কটি করা হয়েছিল রাজনৈতিক বিবেচনায় শেখ হাসিনার শাসনামলে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের মিঠামইনের বাড়িতে যাতায়াতে সুবিধার জন্য তাই এখানে পরিবেশ ও প্রতিবেশগত বিবেচনা ছিল উপেক্ষিত। একই ধরনের সড়ক তৈরি করা হয়েছে সুনামগঞ্জের ধর্মপাশা, মধ্যনগর সহ হাওরের অন্যান্য এলাকায়ও, এবং সেখানেও স্থানীয় বাসিন্দারা একই ধরনের সমস্যার অভিযোগ করেন। অথচ, শুকনো মৌসুমে হাওরে যাতায়াতের সমস্যার সমাধান করা যেত 'উভচর রাস্তা' তৈরি করে, যা ইতোমধ্যেই হাওরের বিভিন্ন এলাকায় কিছু পরিমাণে বিদ্যমান। এ পাকা রাস্তাগুলো হাওরের জমির সমতলে কংক্রিট ঢালাই দিয়ে তৈরি করা, যা শুকনো মৌসুমে চলাচলে ব্যবহৃত হয় আর বর্ষায় তার উপর দিয়ে পানি ও নৌকা অবাধে চলাচল করতে পারে। 

মোদ্দা কথা হলো, কোন অঞ্চলের যোগাযোগ ও জীবিকার সমস্যা সমাধানে আমরা কারিগরি সমাধানে যতটা জোর দেই ততটাই অবহেলা করি সেখানকার পরিবেশ ও প্রতিবেশ গত ভারসাম্য রক্ষাকে এবং ঐ সমাধানের পরিবেশগত প্রযোজ্যতাকে। এমনকি কখনও কখনও যথাযথ অর্থনৈতিক লাভ-ক্ষতি বিশ্লেষণও করা হয় না। 

যাই হোক, এসব অপরিণামদর্শী অবকাঠামোগত নির্মাণ ও নির্মাণকাজে দুর্নীতি ছাড়াও আরো কিছু বিষয় রয়েছে যা মনোযোগের দাবিদার। এগুলো হল ধান কাটা, পরিবহন, সংরক্ষণ ও বিপণন সংক্রান্ত জটিলতা। যখন আকস্মিক বন্যা বা ঢল আসতে থাকে বা তার পূর্বাভাস থাকে, তখন কৃষককে দ্রুত ধান কেটে আনতে হয়, যদি ধান কাটার উপযুক্ত হয়। এসময় কৃষি শ্রমিক পাওয়া খুবই দুরূহ। 

সাম্প্রতিক সময়ে বজ্রপাতে মৃত্যুর হার বেড়ে যাওয়ায় অনেক শ্রমিক মেঘলা আবহাওয়া হাওরে কাজ করতে যেতে চায় না। জরুরি সময়ে গ্রামের সবাই মিলে কৃষি কাজে সাহায্য করার আমাদের যে ঐতিহ্যবাহী প্রথা ছিল তাও আর এখন অবশিষ্ট নেই। বিগত কয়েক বছরে ধান কাটার বড় যন্ত্রের হারবেস্টার ব্যবহার বেড়েছে। এটা দ্রুত অনেক জমির ধান কাটতে পারে কিন্তু দাম অত্যধিক বেশি হওয়ায় খুব কম কৃষকই এটা কিনতে পারে তাই মূলত ভাড়ায় ব্যবহার করে। ঢলের সময় সবার ধান কাটার মতো যথেষ্ট সংখ্যায় পাওয়া যায় না, আর এটা আকারে বড় হওয়ায় এক ক্ষেত বাদ দিয়ে অন্য ক্ষেতে যেতে পারে না। অন্যদের পর তাদের নিজের পালা আসা বা পাশের ক্ষেত কাটা শেষ হওয়া পর্যন্ত বসে থাকতে হয়। সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো জমিতে পানি উঠে গেলে এটা আর কাজে লাগানো যায়না।

অন্যদিকে, যানবাহন চলার মতো রাস্তার অভাবে কাটা ধান ক্ষেত থেকে মাড়াই ও সংরক্ষণের স্থানে নিয়ে আসাও সমস্যাজনক। কৃষক যদি খারাপ আবহাওয়া ভিজা ধান আনতেও পারে তবে শুকনো ও সংরক্ষণ করার সুযোগের অভাবে তা নষ্ট হয়, ভিজা ধানে চারা গজিয়ে যায় বা পচে যায়, তখন তা বিক্রি বা খাওয়া কোন কাজেই আসেনা। তবে কৃষকের সবচেয়ে বড় ক্রমিক দুঃখ সম্ভবত ধানের দাম। কৃষক যখন ধান তুলে তখন ধানের দাম কমে যায় আর পরে তা বাড়ে, প্রায় সারা বছরই চালের দাম থাকে বেশি। সরকারিভাবে ধান কেনা হয় নির্ধারিত দামে, নির্দিষ্ট পরিমাণে, যা মোট উৎপাদনের সামান্য এক অংশ। এ বছর সরকার ৪৪০টাকা মন দরে ধান কিনছে ৫ লক্ষ টন। আর পরবর্তী কয়েক মাসে আরও ১৩ লক্ষ টন চাল কিনবে। কিন্তু ফলনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২.২ কোটি টন। সরকার যেহেতু চাল বেশি কেনে, তা কেনে চালকল মালিকদের কাছ থেকে, কাজেই ধানের বড় ক্রেতা হলো এই বড় বড় চালকলের মালিকরা। তারা ধান উঠার সময় বেশি দামে না কিনলে ধানের দাম কমে যায়, তখন তারা সস্তায় ধান কিনে আর পরে বেশি দামে বিক্রি করে। এ চক্করে পড়ে এবার ধানের দাম সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে সবচেয়ে কম, ৮০০-৯০০ টাকা মন, ক্ষেত্র বিশেষে আরও কম। অন্যদিকে উৎপাদন খরচ বেড়েই চলেছে। এ দামে আসলে লাভ তো দূরে থাক, উৎপাদন খরচ উঠিয়ে আনাই কঠিন। ফলে কৃষকরা দিন দিন ধান চাষে আগ্রহ হারাচ্ছে ও অন্যান্য অর্থকরী ফসল উৎপাদনে ঝুকছে, কেউ কেউ কৃষিকাজ ছেড়েই দিচ্ছে, যা আমাদের খাদ্য নিরাপত্তাকে ঝুঁকিগ্রস্ত করতে পারে।

এ অবস্থায় আমাদের করণীয় কী? প্রথমত, আমাদের ধান কাটা ও পরিবহনের প্রযুক্তি উদ্ভাবনের বিষয়ে মনযোগ দিতে হবে। আমাদের এমন কাটার যন্ত্র দরকার যা হবে কম দামের, যেন প্রান্তিক কৃষকরা নিজেরা কিনতে পারে, পানিতে ধান কাটতে পারে, আকারে ছোট যেন মাঠের ভেতরে বিভিন্ন ক্ষেতে নিয়ে যাওয়া এবং অল্প পরিমাণ জমির ধান কাটা যায়, এটা জ্বালানী সাশ্রয়ীও হতে হবে। এমন যন্ত্র থাকলে কৃষকদের একটি বড় অংশ তা কিনতে পারবে ও ঢলের পানি আসার সময় দ্রুত নিজেদের ধান কাটতে পারবে, অন্যদের পর তাদের নিজের পালা আসা বা পাশের ক্ষেত কাটা শেষ হওয়া পর্যন্ত বসে থাকতে হবেনা, যেমনটা বড় কাটাই যন্ত্রের ক্ষেত্রে হয়। অন্যদিকে ক্ষেত থেকে ধান কাছের রাস্তা পর্যন্ত নিয়ে যাওয়ার জন্য এমন একটি বাহন দরকার যার জন্য চওড়া বা ভালো রাস্তা প্রয়োজন হবেনা, ক্ষেতের আইল দিয়েই চলবে। এ বিষয়ে গবেষণায় জোর দেয়া জরুরি।বাংলাদেশের জন্য বড় বাহন উপযোগী নয় কারণ জমির স্বল্পতার কারণে আমরা রাস্তা তৈরি করে কৃষি জমি নষ্ট করার বিলাসিতা যেমন করতে পারিনা, তেমনই রাস্তা আবার প্লাবন ভূমিতে জলপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত করে। এছাড়া আমাদের ক্ষেতগুলো আকারে ছোট। ধান সংরক্ষণের ক্ষেত্রে ধান শুকানোর যে পদ্ধতিগুলো এরই মধ্যে উদ্ভাবন করা হয়েছে তার উন্নয়ন, সুলভ করণ ও প্রচারের ব্যবস্থা করতে হবে।

আমাদের নির্ভরযোগ্য অঞ্চলভিত্তিক দীর্ঘমেয়াদি আবহাওয়া পূর্বাভাস ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। যেন কৃষকদের ফসল লাগানোর আগেই আবহাওয়া কেমন হবে সে সম্পর্কে ধারণা দেয়া এবং কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ থেকে সে অনুযায়ী ফসল নির্বাচন, লাগানো ও মাড়াইয়ের সময় সম্পর্কে পরামর্শ দেয়া যায়। হাওরে পানির প্রবাহ যাতে বাধাগ্রস্ত না হয় তাও নিশ্চিত করতে হবে, সেজন্য ইতোমধ্যে তৈরি অবকাঠামোর যদি পরিবর্তনও করতে হয় তা করতে হবে। 

আরও পড়ুন

×