চারদিক
উপকারী পোকামাকড়
মো. হারুন-অর-রশীদ
প্রকাশ: ২৬ মে ২০২৬ | ০৬:২৬
| প্রিন্ট সংস্করণ
কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির প্রধান অন্তরায় হলো বিভিন্ন ধরনের ক্ষতিকর পোকামাকড়। এ সমস্যা মোকাবিলায় কৃষক অতিরিক্ত রাসায়নিক কীটনাশকের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন। যার ফলে পরিবেশ দূষণ, উপকারী পোকামাকড়ের ক্ষতি, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, মাটির উর্বরতা হ্রাস, খাদ্যে বিষাক্ত অবশিষ্টাংশ এবং মানবদেহের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি সৃষ্টি করছে। এই প্রেক্ষাপটে উপকারী পোকামাকড় কৃষিতে একটি কার্যকর, পরিবেশবান্ধব, নিরাপদ ও টেকসই সমাধান হিসেবে ক্রমেই গুরুত্ব পাচ্ছে। পাশাপাশি এ খাতে গবেষণা ও উদ্যোক্তা উন্নয়ন নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করছে।
উপকারী পোকামাকড় প্রকৃতিতে ফসলের অমূল্য সম্পদ। এদের মধ্যে শিকারি (প্রিডেটর) ও পরজীবী (প্যারাসিটয়েড) পোকামাকড় সরাসরি ক্ষতিকর পোকামাকড় দমন করে। যেমন– ট্রাইকোগ্রামা অতি ক্ষুদ্র ডিম পরজীবী বোলতা, যা বিভিন্ন লেপিডোপ্টেরান পোকার ডিমের মধ্যে ডিম পাড়ে এবং ক্ষতিকর পোকার বংশবিস্তার রোধ করে। ব্রাকন একটি লার্ভা পরজীবী বোলতা, যা বিভিন্ন ক্ষতিকর পোকার লার্ভার ওপর ডিম পাড়ে; পরে সেই লার্ভা মারা যায়। একইভাবে লেডিবার্ড বিটল জাবপোকা এবং উপকারী মাকড় ক্ষতিকর মাকড়, থ্রিপস ও সাদামাছি খেয়ে ফেলে। এ ছাড়া আরও অনেক উপকারী পোকা বিভিন্ন ক্ষতিকর পোকা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ভূমিকা রাখে। এর ফলে রাসায়নিক কীটনাশকের ব্যবহার কমে; উৎপাদন খরচ হ্রাস পায় এবং পরিবেশ সুরক্ষিত থাকে।
উপকারী পোকামাকড় পরাগায়নের মাধ্যমে ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বিশেষ করে মৌমাছি, প্রজাপতি এবং অন্যান্য পরাগবাহী পোকামাকড় ফুল থেকে ফুলে পরাগ স্থানান্তরের মাধ্যমে ফল ও বীজ উৎপাদনে সহায়তা করে। সাধারণত সবজি, ফল ও তেল জাতীয় ফসলে এদের অবদান অপরিসীম। সঠিক পরাগায়ন ছাড়া কাক্ষিত ফলন পাওয়া সম্ভব নয়। তাই কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধিতে উপকারী পোকামাকড় অপরিহার্য। তা ছাড়া উপকারী পোকামাকড় প্রাকৃতিক ভারসাম্য ও কৃষি পরিবেশের জীববৈচিত্র্য বজায় রাখতে বিশেষ ভূমিকা রাখে। টেকসই কৃষি পরিবেশে উপকারী ও ক্ষতিকর পোকামাকড়ের মধ্যে একটি ভারসাম্য থাকে, যা প্রাকৃতিকভাবে পোকা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। কিন্তু নির্বিচারে রাসায়নিক কীটনাশক ব্যবহারে এই ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যায়। ফলে ক্ষতিকর পোকামাকড় আরও দ্রুত বৃদ্ধি পায় এবং তা নিয়ন্ত্রণ করা অসম্ভব হয়ে ওঠে। অন্যদিকে উপকারী পোকা যেমন ব্ল্যাক সোলজার ফ্লাই, যা জৈব পদার্থ পচিয়ে মাটির গঠন ও উর্বরতা উন্নত করে। তা ছাড়া বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং প্রাণীর খাদ্য উৎপাদনে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়।
উপকারী পোকামাকড়ের এই সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগাতে হলে এ বিষয়ে ব্যাপক গবেষণা অপরিহার্য।
সব উপকারী পোকামাকড় সব অঞ্চলে সমানভাবে কার্যকর নয়। তাই বাংলাদেশের জলবায়ু ও পরিবেশ উপযোগী স্থানীয় উপকারী পোকামাকড় শনাক্ত, সংরক্ষণ ও কার্যকর ব্যবহারের জন্য গবেষণা অত্যন্ত জরুরি। এ ছাড়া উপকারী পোকামাকড়ের অধিক উৎপাদন, সংরক্ষণ, গুণগত মান, পরিবহন, ফসলভিত্তিক অবমুক্তকরণের হার, মাঠ পর্যায়ে প্রয়োগ পদ্ধতি, অবমুক্তকরণের ক্ষেত্রে বিবেচ্য বিষয় ইত্যাদি ক্ষেত্রে গবেষণা গ্রামীণ শিক্ষিত যুবকদের সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রশিক্ষণ, ঋণ সুবিধা এবং প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রদান করা হলে এ খাতে দ্রুত উদ্যোক্তা উন্নয়ন সম্ভব।
গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরে যৌথ উদ্যোগে উদ্যোক্তাদের জন্য পথপ্রদর্শক হতে পারে। এতে গ্রামীণ অর্থনীতি শক্তিশালী এবং যুবসমাজের বেকারত্ব কমাতে সহায়ক হবে।
সর্বোপরি উপকারী পোকামাকড়-বিষয়ক সঠিক গবেষণালব্ধ জ্ঞান গবেষণা প্রতিষ্ঠান থেকে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সহায়তায় মাঠ পর্যায়ে কৃষকদের মাঝে পৌঁছে দিতে হবে। প্রশিক্ষণ, প্রদর্শনী কার্যক্রম এবং সহজলভ্য প্রযুক্তির মাধ্যমে উপকারী পোকামাকড় ব্যবহারে কৃষকদের উৎসাহিত করতে হবে। তা ছাড়া জৈব কীটনাশক ব্যবহার অথবা রাসায়নিক কীটনাশকের সঠিক ও সীমিত ব্যবহার নিশ্চিত করার মাধ্যমে উপকারী পোকামাকড় সংরক্ষণ বিষয়ে কৃষকদের সচেতন করতে হবে।
ড. মো. হারুন-অর-রশীদ: ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, আঞ্চলিক কৃষি গবেষণা কেন্দ্র, বিএআরআই,
বুড়িরহাট, রংপুর
- বিষয় :
- চারদিক
