প্রতিবেশী
দুনিয়ার তেলাপোকারা এক হয়েছে
পি চিদাম্বরম
প্রকাশ: ৩১ মে ২০২৬ | ১৬:১৭ | আপডেট: ৩১ মে ২০২৬ | ২১:৪১
তেলাপোকা কোনো খারাপ শব্দ বা গালি নয়। উইকিপিডিয়ার তথ্য বলছে, তেলাপোকা প্রায় ২০ কোটি বছর ধরে তাদের শরীরের মৌলিক গঠন ধরে রেখেছে। হোমো সেপিয়েন্সের প্রথম আবির্ভাব ঘটেছিল আফ্রিকায় প্রায় ৩ লক্ষ বছর আগে। অর্থাৎ মানুষেরও ১৯,৯৭,০০,০০০ বছর আগে থেকে তেলাপোকা আছে। এই পৃথিবীতে টিকে থাকার অধিকারের ক্ষেত্রে মানুষের চেয়ে তেলাপোকার অগ্রাধিকার রয়েছে।
সায়েন্স এনসাইক্লোপিডিয়া বলছে, মানুষ তেলাপোকাকে আক্রমণ করলেও, তেলাপোকা মানুষকে কামড়ায় না বা আক্রমণ করে না। অবশ্যই, তেলাপোকা ব্যাকটেরিয়া বহন করে, রোগ ছড়ায় এবং অ্যালার্জির কারণ হয়। মানুষও ব্যাকটেরিয়া বহন করে, রোগ ছড়ায় এবং অ্যালার্জির কারণ হয় (বিশেষ করে প্রতিদ্বন্দ্বী গোষ্ঠীর সদস্যদের মধ্যে)। কিছু মানুষ তেলাপোকাকে 'ভীতিকর' বলে মনে করে, ঠিক যেমন কিছু মানুষ অন্য মানুষকে 'ভীতিকর' মনে করে।
উত্তেজিত ও আলোড়িত
কিছুদিন আগে একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা তেলাপোকাদের ঘুম থেকে জাগিয়ে তুলেছেন। বেচারা! তিনি অবশ্য সঙ্গে সঙ্গেই স্পষ্ট করে দেন যে আদালতে ঘুরে বেড়ানো ভুয়া উকিলদের কথাই বলছিলেন তিনি। এই ধরনের ভুয়া উকিলদের অনেককেই খারাপ নামে ডাকা উচিত; কিন্তু, বিনীতভাবে বলছি, তেলাপোকা নয়। একবার নড়ে উঠলে তেলাপোকারা নড়তেই থাকে (যেমন ‘একবার বন্ধক দেওয়া মানে চিরকালের জন্য বন্ধক’)। তেমন কিছু নড়ে ওঠা তেলাপোকা একটি রাজনৈতিক দল গঠন করেছে, একটি এক্স হ্যান্ডেল চালু করেছে, একটি ওয়েবসাইট তৈরি করেছে এবং একটি ইনস্টাগ্রাম হ্যান্ডেল খুলেছে। সর্বশেষ গণনা অনুযায়ী, সেই হ্যান্ডেলের ফলোয়ার ২২ মিলিয়নেরও বেশি।
নড়ে ওঠা তেলাপোকারা পাল্টা জবাব দিল। তার ফলস্বরূপ ওই মানুষগুলো নড়ে উঠল এবং কেঁপে উঠল। আমার সন্দেহ, মানুষগুলো খুব আতঙ্কিত। তা না হলে, ভারতের সর্বোচ্চ নির্বাহী কর্তৃপক্ষ, যাদের সশস্ত্র বাহিনীতে রয়েছে ১৪.৫ লক্ষ সক্রিয় উর্দিধারী সেনা, ৪,২০০টি প্রধান যুদ্ধ ট্যাঙ্ক, ৫৮০টি যুদ্ধবিমান, ২৭০টি নৌযান, ২টি বিমানবাহী রণতরী এবং শত শত পারমাণবিক অস্ত্র, আর রিজার্ভ ব্যাংক থেকে পাওয়া ২,৮৬,৫৮৮ কোটি টাকার বিশাল তহবিল, তারা কেন সম্পূর্ণ ভার্চুয়াল জগতের বাসিন্দা ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি)-র নেতা ৩০ বছর বয়সী অভিজিৎ দীপকের খোলা একটি সামান্য ‘এক্স’ হ্যান্ডেলকে ভয় পাবে এবং ‘এক্স’-কে সেই হ্যান্ডেলটি বন্ধ করতে বলবে?
মিস্টার দীপকে এখন এক দূর দেশে আমাদের বন্ধু-শত্রু মিস্টার ডোনাল্ড ট্রাম্পের তত্ত্বাবধানে, ‘পাবলিক রিলেশনস’-এ (বিপজ্জনক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই নয়) স্নাত্কোত্তর করছেন। ওয়েবসাইটে দেওয়া বর্ণনা অনুযায়ী, সিজেপি-র লক্ষ্যগুলো হলো: “আমরা তেলাপোকার পরিচয় ধারণ করি — যদি তাতে তরুণদের কথা শোনানো যায়।” ‘অলস ও বেকারদের কণ্ঠস্বর’ এই ট্যাগলাইন নিয়ে সিজেপি দাবি করেছে যে তারা সেইসব মানুষের প্রতিনিধিত্ব করে, যাদের “ বিদ্যমান ব্যবস্থা গুনতে ভুলে গেছে”। তিনি চান বেকার, অলস, যারা সারাক্ষণ অনলাইনে থাকে এবং পেশাগতভাবে ক্ষোভ প্রকাশ করতে পারে, তারা যেন তাঁর দলে যোগ দেয়। তিনি গান্ধী, আম্বেদকর এবং নেহরু দ্বারা অনুপ্রাণিত। সিজেপি-র নির্বাচনী ইশতেহার হাসায় এবং ভাবায়; গতানুগতিক রাজনৈতিক দলের ইশতেহার ঘুম পাড়িয়ে দেয়।
“এটাই কারণ…”
আমার মনে হয়, সিজেপি জনগণের, বিশেষ করে যুবসমাজ ও তরুণীদের মধ্যে বিরাজমান ব্যাপক হতাশা, যন্ত্রণা এবং ক্ষোভের উপর ভরসা করছে। কারণগুলোও কারও অজানা নয়।
বেকারত্বের হার ৫.২%; যুব বেকারত্বের হার ১৬-১৭%। কর্মশক্তি ৬৪.৩ কোটি, যাদের বড়জোর ৬০% শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণের সুযোগ পেয়েছে। বাকি ৪০% বা প্রায় ২৫ কোটি হলো, মাফ করবেন, তেলাপোকা। সিজেপি যদি সব তেলাপোকার ভোট পায়, তবে তারা সরকার গঠন করবে। (২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি ২৩.৬ কোটি ভোট এবং কংগ্রেস ১৩.৭ কোটি ভোট পেয়েছিল)। চলাচলই তেলাপোকার জীবনের ভিত্তি। কিন্তু জ্বালানির উচ্চমূল্য তেলাপোকার চলাচলকে সীমিত করে। দিল্লিতে পেট্রোলের দাম ১০২.১২ টাকা এবং ডিজেলের দাম ৯৫.২০ টাকা। বিজেপিকে ভোট দেওয়ার জন্য কলকাতার বাসিন্দাদের যথাক্রমে ১১৩.৫১ টাকা এবং ৯৯.৮২ টাকা দাম দিয়ে পুরস্কৃত করা হয়েছে। আরশোলারা যেহেতু প্রতিদিন তাড়াতাড়ি ঘুম থেকে ওঠে না, তাই তারা কখনোই সরকারি চাকরি পাবে না। এর পরের সেরা বিকল্প হলো কারখানার চাকরি। পরিসংখ্যান ও প্রোগ্রাম বাস্তবায়ন মন্ত্রণালয়ের তথ্য, ভারতে ২,৬০,০৬১টি নিবন্ধিত কারখানা রয়েছে, যেখানে চাকরির আনুমানিক সংখ্যা হলো ১.৯৫ কোটি। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কারণে অনেক চাকরি অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়বে এবং এই ২৫ কোটি আরশোলা কখনোই কারখানার চাকরি পাবে না। একারণেই এই হতাশা।
যেহেতু পারিবারিক ঋণ জিডিপির ৪২% এবং পারিবারিক সঞ্চয় জিডিপির মাত্র ৫-৬%, তাই পরিবার থেকে তেলাপোকারা কিছুই পায় না।
‘বিকশিত ভারতে’ তেলাপোকারাও বিলিয়নিয়ার হওয়ার স্বপ্ন দেখেছিল।
তবে, বিজেপির ১২ বছরের শাসনে বিলিয়নিয়ারের সংখ্যা অত্যন্ত ধীর গতিতে বাড়ছে। সর্বশেষ গণনা অনুযায়ী এই সংখ্যা ২০৫, এবং বিলিয়নিয়ার হওয়ার অপেক্ষায় লাইনে রয়েছে ২৫ কোটি তেলাপোকা। তারা ২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদি প্রতিশ্রুত 'আচ্ছে দিন আয়েঙ্গে'-র ১৫ লক্ষ টাকার জন্যও অপেক্ষা করছে।
অর্থনৈতিক উপদেষ্টাও আশাভঙ্গ করল
তেলাপোকারা শরণাপন্ন হলো তেলাপোকাদের অর্থনৈতিক উপদেষ্টার(সিইএ) কাছে। সিইএ-এর পরামর্শ ছিল উদ্বেগজনক: “২০২৭ অর্থবর্ষে বাণিজ্য ঘাটতি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে, সেই সাথে চলতি হিসাবের ঘাটতিও। মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি ঊর্ধ্বমুখী। স্বাভাবিকের চেয়ে কম বৃষ্টি একটি জটিল সরবরাহ সংকটে কৃষিগত মাত্রা যোগ করেছে। বিশ্বাসযোগ্য কর নীতি, নিয়ন্ত্রক পূর্বাভাসযোগ্যতা এবং বিনিয়োগকারীদের জন্য বাধা কমানোর মাধ্যমে স্থিতিশীল দীর্ঘমেয়াদী পুঁজি আকর্ষণের কাজটি এই পরিস্থিতিতে আরও তীব্র হয়ে ওঠে” (দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, ২৩ মে, ২০২৬)।
বিপর্যয়ের পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে
তেলাপোকারা হয়তো সিদ্ধান্ত নিতে পারে যে, এই বিপর্যয় এড়ানোর একমাত্র উপায় হলো প্রধান নির্বাচন কমিশনার তথা সিইসি-এর সহায়তায় মানুষ থেকে তেলাপোকাদের হাতে শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর করা।
পি চিদাম্বরম: ভারতের জাতীয় কংগ্রেস নেতা, সাবেক অর্থমন্ত্রী। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস থেকে অনুবাদ করেছেন সমকালের সহকারী সম্পাদক সাইফুর রহমান তপন।
