ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

চারদিক

বাজারের আগুনে দগ্ধ জীবন

বাজারের আগুনে দগ্ধ জীবন
×

রুস্তম আলী খোকন

প্রকাশ: ০২ জুন ২০২৬ | ০৭:২৭

| প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশের নিম্নবিত্তের জীবনের কষ্ট ক্রমেই বাড়ছে। বাজারে করোনাকালের আগে শুরু হওয়া পাগলা ঘোড়ার দাপট চলছে। সংবাদমাধ্যমে উঠে আসছে গরিব-নিম্নবিত্তের হাহাকার। সেখান থেকে জানা যায়, শেষ কবে মাংস খেয়েছেন, তা মনে পড়ে না ৭৪ বছর বয়সী রিকশাচালক আনসার আলীর। ঘর ছেড়ে যাত্রাবাড়ীর রিকশা গ্যারেজেই রাতের ঘুম তাঁর। ছোট ছেলেকে মাদ্রাসা থেকে নিয়ে এসেছেন। পড়ার খরচ চালানোর সামর্থ্য নেই। পরিবারকে পাঠিয়ে দিয়েছেন পটুয়াখালীর গ্রামে। অন্যদিকে আদা-রসুনের ঝাঁজের মতোই অভাবের ঝাঁজে দুর্বিষহ মাথায় ঝাঁকি নিয়ে আদা-রসুন বিক্রেতা জামালপুরের খোকা মিয়ার জীবন।

দেশে এখন ছয় কোটি মানুষ কোনো না কোনোভাবে অভাবগ্রস্ত– এমন দাবি শ্রমিক-কৃষক-ক্ষেতমজুর সংগঠনগুলোর। এ দেশে গরিব মানুষ এনজিওর ঋণের চড়া সুদের শৃঙ্খলে বন্দি। ঋণের কিস্তি গুনতে আত্মহননের মতো ঘটনা ঘটেছে; এমনকি সপরিবারে আত্মহনন। কিন্তু নির্মম এ মৃত্যু শুধুই একটি সংবাদ। এর কোনো প্রতিকার নেই।

নিম্ন-মধ্যবিত্ত, মধ্যবিত্ত এরই মধ্যে খাদ্য, শিক্ষা ও বিনোদন খাতে সংসারের খরচ কমাতে বাধ্য হয়েছে। বাংলাদেশে শিক্ষায় প্রতিটি মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্তকে গুনতে হয় সন্তানের জন্য একই দিনে দুটি খরচ। দিনের প্রথমভাগে স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের। দ্বিতীয় ভাগ থেকে রাত পর্যন্ত একই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কোনো না কোনো শিক্ষকের কাছে কোচিং। কিশোর-কিশোরীদের জীবন থেকে বিকেল-সন্ধ্যা হারিয়ে গেছে। হারিয়ে গেছে খেলাধুলা, শরীরচর্চা, সংগীতচর্চাসহ জীবন বিকাশের প্রয়োজনীয় সময়।

গত এক দশকে ওষুধের দাম হয়েছে তিন গুণ। কোনো কোনো ওষুধের  ক্ষেত্রে এই বৃদ্ধির হার আরও বেশি। কেউ কোনো কথা বলে না। বৃদ্ধির কারণও কোনো সংস্থা ব্যাখ্যা করে না। প্রতিকারও কেউ চায় না।
সংস্কার নামক এক গোলক ধাঁধায় অন্তর্বর্তী সরকার কাটিয়ে দিল ১৮ মাস। সুশাসনের জন্য কথা বলা সুশীলদের একাংশ নিয়ে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার মব সহিংসতার নামে এমন এক শাসন চাপিয়ে দিল, যাতে পিষ্ট হয়ে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ হারাল বাংলাদেশ। কর্মসংস্থান সৃষ্টির বদলে বাড়ল বেকারত্ব। 

শাসকদের দাবি অনুযায়ী, বিগত কয়েক দশকে বাংলাদেশের জনগণের অর্জন বিস্ময়কর। পরিসংখ্যান বলছে, সুশাসনের ঘাটতি আর দুর্নীতির ক্ষত নিয়েই বাংলাদেশের জনগণ বাংলাদেশকে অগ্রসর করেছে বিগত ২৫ বছরে। প্রশ্ন– তারপরও কেন ক্ষুধা আর দারিদ্র্যে নিষ্পেষিত বাংলাদেশের জনগণ। ২৫ বছরে আয় সাড়ে সাত গুণ হওয়া একটি জাতির ছয় কোটি মানুষ কেন অনাহারে, অর্ধাহারে জীবন কাটায়? রিকশাচালক আনসার আলীকে কেন সকালের নাশতার ১০ টাকা জোগাড় করতে হিমশিম খেতে হয়? কেনইবা আট মাসের অন্তঃসত্ত্বা রায়েরবাজারের সুমি গর্ভের সন্তান নিয়ে প্রচণ্ড গরমে ঘণ্টার পর ঘণ্টা থলে হাতে দাঁড়িয়ে থাকে টিসিবির ট্রাকের জন্য?

চব্বিশে যে তরুণ নেতৃত্বে এসেছিল, তারা আনসার আলী কিংবা সুমি অথবা দেলোয়ার হোসেনের জন্য নয়– তা এখন পরিষ্কার। বাংলাদেশে আনসার আলী, সুমি কিংবা খোকা মিয়াদের পক্ষে কথা বলা, অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায় প্রতিষ্ঠার কোনো রাজনৈতিক দল নেই। যতক্ষণ পর্যন্ত সেই শক্তির উত্থান না ঘটবে, ততক্ষণ একদিকে চলবে কিছু মানুষের প্রাচুর্যভরা জীবন, অন্যদিকে অসংখ্য  পেটপোড়া থলে হাতে দিগ্‌ভ্রান্তের পথের জীবন। বাজারের আগুনে দগ্ধ হবে শেষোক্তরা।
কবি নির্মলেন্দু গুণ লিখবেন কবিতা– ‘কোথাও অতিবৃষ্টিতে প্লাবিত হয় জমি, কোথাও অনাবৃষ্টিতে চৌচির হয় মাটি।’

রুস্তম আলী খোকন: লেখক ও সংগঠক

আরও পড়ুন

×