ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

আন্তর্জাতিক

নেপালের উন্নয়ন ধারণা যে কারণে ব্যর্থ হয়েছে

নেপালের উন্নয়ন ধারণা যে কারণে ব্যর্থ হয়েছে
×

আভাশ পিয়া

প্রকাশ: ০৩ জুন ২০২৬ | ০৭:১২

| প্রিন্ট সংস্করণ

ইতিহাসজুড়ে নেপালের উন্নয়ন অভিজ্ঞতায় কাঠামোগত দ্বন্দ্ব উল্লেখযোগ্যভাবে দৃশ্যমান। সম্পূর্ণ ভিন্ন রাজনৈতিক ব্যবস্থা ও উন্নয়ন প্যারাডাইমের মধ্যেও তা দেখা গেছে। এই দ্বন্দ্বগুলোর সঙ্গে দুটি সাধারণ প্রবণতা যুক্ত। প্রথমটি হলো প্রেক্ষাপটহীন উন্নয়ন কর্মসূচি। এর মানে নেপালের নির্দিষ্ট সামাজিক, পরিবেশগত ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা না করে সর্বজনীন কাঠামো আমদানি করা হয়েছে। দ্বিতীয়টি হলো বিরাজনীতিকীকরণ, যেখানে বৈষম্য ও ক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত রাজনৈতিক প্রশ্নগুলোকে নিছক প্রযুক্তিগত সমস্যায় পরিণত করা হয়; সমাধান খোঁজা হয় প্রকল্পের মাধ্যমে। কথাটি আরও বিস্তারিত তুলে ধরা যাক। 

উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড বারবার নেপালের সামাজিক বাস্তবতাকে তার প্রেক্ষাপট থেকে বিচ্ছিন্ন করেছে এবং এর কাঠামোগত বৈষম্যকে রাজনীতিমুক্ত হিসেবে দেখেছে। ঐতিহাসিক ও সমসাময়িক উভয় অভিজ্ঞতার বিশ্লেষণ ভবিষ্যতের জন্য উন্নয়ন বিষয়ে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি নতুনভাবে সাজাতে সাহায্য করবে।

১৯৫১ সালের আগে রানা রাজবংশের শাসনামলে উন্নয়ন কোনো জাতীয় অগ্রাধিকার ছিল না। রাষ্ট্র বরং শোষণমূলক ছিল। ১৯৫১ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তন ছিল একটি যুগান্তকারী মুহূর্ত। বিশ্বের কাছে নেপালের উন্মুক্ত হওয়ার ঘটনা স্নায়ুযুদ্ধের ভূ-রাজনীতির উত্থানের সঙ্গে যুক্ত এবং উন্নয়ন সহায়তা একটি কৌশলগত সম্পদে পরিণত হয়। এই ধারণার ওপর ভিত্তি করে নতুন বৈশ্বিক কাঠামোর সূচনা হয়। বলা হয়েছিল, উন্নয়ন হলো সর্বজনীন, একরৈখিক ও সহজে অনুকরণযোগ্য। এর ফলে নেপালের মতো স্থানগুলোর নির্দিষ্ট ইতিহাস, সামাজিক কাঠামো এবং সাংস্কৃতিক গতিপ্রকৃতি অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ে এবং স্থানীয় জ্ঞানকে সম্পদ হিসেবে না দেখে বরং একটি বাধা হিসেবে বিবেচনা করা হতো।

১৯৫৬ সালে নেপাল তার প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা চালু করে, যা দক্ষিণ এশিয়াজুড়ে প্রভাবশালী ছিল। শুরু থেকেই উন্নয়নকে তার প্রেক্ষাপট থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয়েছিল। ‘ইন দ্য নেম অব ডেভেলপমেন্ট’ বইতে অধ্যাপক নন্দ আর শ্রেষ্ঠা লিখেছেন, এই পরিকল্পনাগুলো প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতাকে অতিমূল্যায়ন করেছিল। অন্যদিকে এর কাঠামোগত প্রতিবন্ধকতাগুলোকে করেছিল অবমূল্যায়ন। এসব উন্নয়ন কাঠামোতে বিরাজনীতিকীকরণকেও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। নেপালের প্রাথমিক পরিকল্পনাগুলোতে দারিদ্র্যের মূল কারণ হিসেবে ভূমি বণ্টন, জাতভিত্তিক বৈষম্য কাঠামো, কৃষি প্রযুক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার বিষয় হিসেবে ভাবা হয়েছিল। অথচ রাজনৈতিক প্রশ্নগুলো অমীমাংসিতই রয়ে যায়। 

১৯৬০ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত পঞ্চায়েত ব্যবস্থা রাষ্ট্রীয় চিন্তাভাবনার উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে স্থাপন করা হয়েছিল। এই আদর্শকে মার্কিন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও নৃবিজ্ঞানী জেমস সি. স্কট ‘উচ্চ আধুনিকতাবাদ’ বলে তুলে ধরেছেন, যা সমাজ পুনর্গঠনের উপায় হিসেবে ওপর থেকে নিচে চাপিয়ে দেওয়া পরিকল্পনার ওপর বিশ্বাসকে বোঝায়। প্রেক্ষাপট বিচ্ছিন্নতার এই ধারা অব্যাহত ছিল। কারণ পঞ্চায়েত আমলের উন্নয়ন কর্মসূচি নেপালের বিশাল সামাজিক ও পরিবেশগত বৈচিত্র্যকে উপেক্ষা করে গ্রামীণ-শহুরে এই দ্বৈত ছাঁচে তৈরি করা হয়েছিল।

১৯৯০ সালের গণতান্ত্রিক রূপান্তর নেপালের উন্নয়নের প্রেক্ষাপট বদলে দেয়। নব্য উদারনীতির প্রতিফলন ঘটিয়ে রাষ্ট্রের ভূমিকা হ্রাস পায় এবং এনজিওগুলোর দ্রুত প্রসার ঘটে। বিরাজনীতিকীকরণ নতুন প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গ্রহণ করে। নৃবিজ্ঞানী ডেভিড মোসের মতে, উন্নয়নের বৈশ্বিক ধারণা সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে এবং নতুন সুযোগ সৃষ্টি করে, যা এক নতুন বিশেষজ্ঞ শ্রেণি তৈরি করে। এমনকি গ্রামীণ জনগোষ্ঠীও নিজেদের অগ্রাধিকারের পরিবর্তে দাতা সংস্থার প্রত্যাশার সঙ্গে নিজেদের মিলিয়ে ‘অংশগ্রহণের অভিনয়’ করতে শিখেছিল। এই উন্নয়ন মডেল রাষ্ট্রের ওপর নয়, বরং আন্তর্জাতিক অর্থায়ন চক্রের ওপর নির্ভরশীলতা তৈরি করেছিল। ‘জেন্ডার মেইন স্ট্রিমিং’ ও ‘সুশাসন’-এর মতো আমদানি করা ধারণার প্রসারের মাধ্যমে প্রেক্ষাপট বিচ্ছিন্নতা সুস্পষ্ট ছিল। 

আভাশ পিয়া: উন্নয়নবিষয়ক নৃবিজ্ঞানী ও সমাজবিজ্ঞান গবেষক; দ্য কাঠমান্ডু পোস্ট থেকে সংক্ষেপিত ভাষান্তর ইফতেখারুল ইসলাম 

আরও পড়ুন

×