ঢাকা শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬

বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি

ঘানি টানিবে জনগণ

ঘানি টানিবে জনগণ
×

সম্পাদকীয়

প্রকাশ: ০৫ জুন ২০২৬ | ০৭:৪৯

| প্রিন্ট সংস্করণ

রেকর্ড পরিমাণ বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধি করা হইয়াছে। গ্রাহক পর্যায়ে গড়ে ১৬.৬৮ শতাংশ এবং পাইকারি পর্যায়ে ১৯.৮৫ শতাংশ মূল্য বৃদ্ধি করা হইয়াছে। বলিবার অপেক্ষা রাখিতেছে না, জ্বালানি তৈলের পর এইবার বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধিতে দেশের সকল শ্রেণির গ্রাহকের জীবন আরও ঝুঁকির মুখে পড়িবে। কেননা, এই মূল্যবৃদ্ধির মধ্যে অন্তর্ভুক্ত বসতবাড়ির ঘূর্ণায়মান পাখা হইতে ফসলের ক্ষেতে সেচকার্যের ব্যয়। তবে শূন্য হইতে ৫০ ইউনিট ব্যবহারকারী গ্রাহকদের বিদ্যুতের মূল্য প্রায় ১৫ শতাংশ বৃদ্ধির একদিন পরই বৃদ্ধির সিদ্ধান্তে পরিবর্তন আসিয়াছে। প্রান্তিক ও স্বল্প বিদ্যুৎ ব্যবহারকারী আবাসিক গ্রাহকদের বাড়তি 
মূল্য হইতে অব্যাহতি দেওয়া হইয়াছে। অন্য গ্রাহকদিগের জন্য নূতন সিদ্ধান্তই বহাল থাকিবে।

বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন-বিইআরসি বুধবার বিদ্যুতের নূতন মূল্য ঘোষণার পরপরই বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে মানুষ তাহাদের কষ্ট ও অসহায়ত্বের কথা বর্ণনা করিয়াছেন। এই সিদ্ধান্তের ফলে যেই বাড়তি টাকা গুনিতে হইবে, তাহাতে শুধু মাস সমাপ্তির বিলটুকুই নহে; বাজারের থলিতেও টান পড়িবে। শিল্পকারখানা ও উৎপাদন খাতে বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধিতে উৎপাদকগণ সেই ব্যয়ের বোঝা পণ্যমূল্যের উপর চাপাইবেন। ফলে বাজারে চাউল-ডাউল-তৈলসহ সকল প্রকার নিত্যপণ্যের মূল্য আরও বৃদ্ধি পাইবে।

দায়িত্ব গ্রহণ করিয়া সরকার বলিয়াছিল, আগামী দুই বৎসর বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধি করা হইবে না। কিন্তু ১০০ দিনের মধ্যেই লাইনের গ্যাস ব্যতীত সকল প্রকার জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি করা হইয়াছে। এইবার বিদ্যুতের মূল্যও রেকর্ড পরিমাণ বৃদ্ধি পাইল। আন্তর্জাতিক বাজারের প্রভাব উপেক্ষা করা সম্ভব নহে– স্বীকার্য। কিন্তু জাতীয় বাজেটের পূর্বে এই মূল্যবৃদ্ধি যে ভর্তুকির হার হ্রাসের পরিকল্পনারই অংশ, উহা অনুমেয়। আর ভর্তুকি হ্রাস দেখাইতে পারিলে ঋণ পাইতেও শর্ত সহজ হয়। ইহাও উল্লেখ করিতে হইবে, বিদ্যুতের এই রূপ মূল্যবৃদ্ধির পরও এই খাতের ৪১ সহস্র কোটি টাকার অধিক ভর্তুকি দিতে হইবে। অর্থাৎ এই মূল্যবৃদ্ধিও আদতে যথেষ্ট নহে। কিন্তু মানুষের যেই নাভিশ্বাস উঠিল, সেই ভাবনার দায় কার?  

নূতন মূল্য কার্যকর হইবে জুনের ১ তারিখ হইতে। অর্থাৎ ৩ তারিখে সিদ্ধান্ত গ্রহণের পূর্বেই গ্রাহক এই মাসের তিন দিন যেই মূল্যে বিদ্যুৎ ব্যবহার করিয়াছেন বলিয়া জানিতেন, তাহা ভুল। ইহার মূল্য অধিক। মূল্যবৃদ্ধি যে আসলে কী রূপ, তাহা টাকার হিসাবে না বুঝিয়া জীবনের ঘটনাক্রম দিয়া অনুভবই যথোপযুক্ত। 

সদ্যসমাপ্ত মাধ্যমিক পরীক্ষার সময় আমরা দেখিয়াছি, লোডশেডিংয়ের ফলে মায়েদের হাতপাখাই শিক্ষার্থীদের আশ্রয় হইয়াছিল। জুলাই হইতে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা শুরু হইবার কথা। হামে আক্রান্ত শত শত শিশু এখন হাসাপাতালে; তাহাদের চিকিৎসা ব্যয় বৃদ্ধি পাইবে। আরও কত পরিবার সন্তানের চিকিৎসা ব্যয় মিটাইতে অক্ষম হইবে, কে তাহার সন্ধান লইবে? আতান্তরে পড়িবেন কৃষক। বর্তমানে মুদ্রাস্ফীতির হার চড়া। বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির ফলে উহা আরও বৃদ্ধি পাইবে। তবুও মনে প্রশ্ন জাগিতেছে, আর কি কোনো বিকল্প ছিল না? তাহা লইয়া কি যথেষ্ট আন্তরিকতা দেখা গিয়াছে?
বিশেষজ্ঞগণ বলিতেছেন, বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির বিকল্প ক্যাপাসিটি চার্জে সমন্বয়, ভর্তুকি কাঠামো পুনর্বণ্টন, সঞ্চালন ও বিতরণ লাইনে ত্রুটির সমাধান, অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন, সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ, পুরাতন অদক্ষ বিদ্যুৎকেন্দ্রের সংখ্যা ও সিস্টেম লস হ্রাসের উদ্যোগ। এই সকল উপদেশ লইয়া বিস্তর আলোচনা চলে, তবে কার্যকর পদক্ষেপ নাই। কিন্তু প্রতিবার মূল্যবৃদ্ধির বোঝা স্কন্ধে লইয়া ঘানি টানিতে হয় জনগণকে। 

আরও পড়ুন

×