ঢাকা মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬

সমকালীন প্রসঙ্গ

শিশু নির্যাতনকারীদের আচরণগত সংকেত

শিশু নির্যাতনকারীদের আচরণগত সংকেত
×

শিশু যেন কোনো ধরনের সংকোচ ছাড়াই বলতে পারে– কে তাকে অস্বস্তিতে ফেলছে

মোশফেকুর রহমান 

প্রকাশ: ০৯ জুন ২০২৬ | ১৬:১৫

সাধারণ মানুষের ধারণা হলো, ভয়ংকর অপরাধী আচমকা দানবে পরিণত হয়েছে। যেন এক মুহূর্তে একজন স্বাভাবিক মানুষের নৃশংস হত্যাকারীতে রূপান্তর ঘটেছে। কিন্তু অপরাধ মনস্তত্ত্ব নিয়ে কাজ করা গবেষক ও তদন্তকারীরা বলেন, বাস্তবে শিশু-নারীকে ধর্ষণ-হত্যার মতো ভয়ংকর অপরাধের আগে তাদের মধ্যে কিছু আচরণগত পরিবর্তন আসে। চূড়ান্ত মানসিক প্রস্তুতি নেওয়ার পাশাপাশি তারা কিছু সংকেতও দেয়। সমস্যা হলো, আমরা অধিকাংশ সময় সেসব গুরুত্ব দিই না বা বুঝে উঠতে পারি না।

বিশ্বের বহু সিরিয়াল কিলার, যৌন সহিংস অপরাধী এবং শিশুকে ধর্ষণ ও হত্যাকারীর বিরুদ্ধে করা মামলা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে– অনেকেই ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ড ঘটানোর আগে দীর্ঘ সময় ধরে ‘সুযোগ’ খুঁজেছে। তারা হঠাৎ আক্রমণ করেনি; বরং শিকারকে (ভুক্তভোগী) দীর্ঘ সময় ধরে পর্যবেক্ষণ করেছে, বিশ্বাস অর্জন করেছে, দুর্বলতা বুঝেছে এবং শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত নিজের ফন্দি আড়াল করে রেখেছে।

শিশুদের বিরুদ্ধে যৌন সহিংসতা নিয়ে দীর্ঘদিন গবেষণা করা মার্কিন বিজ্ঞানী ডেভিড ফিংকেলহর মনে করেন, অপরাধীরা প্রায়ই বিশ্বাস অর্জন ও সুযোগ তৈরির দীর্ঘ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে তাদের লক্ষ্যবস্তু নির্বাচন করে। ভয়ংকর অপরাধীরা অনেক সময় শিকারির মনস্তত্ত্ব (প্রিডেটরি মাইন্ডসেট) নিয়ে কাজ করে। অর্থাৎ তারা পরিস্থিতি, মানুষ (টার্গেট/লক্ষ্যবস্তু) এবং পরিবেশকে শিকারের দৃষ্টিতে মূল্যায়ন করে।

এই ধরনের অপরাধীরা প্রথমে দেখে নেয় কারা তুলনামূলক অসহায়, কারা সহজে প্রতিরোধ করতে পারবে না, কারা সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন বা অতিরিক্ত বিশ্বাসপ্রবণ। সাধারণত শিশুরা, একা চলাফেরা করা মানুষ, মানসিকভাবে দুর্বল ব্যক্তি কিংবা পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন কেউ সহজেই তাদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়। বিভ্রান্তিকর বিষয় হলো, অনেক অপরাধী বাইরে থেকে সম্পূর্ণ স্বাভাবিক ও ভদ্র আচরণ করে। কারণ তারা জানে, মানুষের বিশ্বাস অর্জন করাই তাদের জন্য সবচেয়ে বড় সুরক্ষাকবচ, যা তারা অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে।

মনোবিজ্ঞানীরা ‘গ্রুমিং’ নামে একটি গুরুত্বপূর্ণ আচরণগত প্রক্রিয়ার কথা বলেন। এখানে অপরাধী ধীরে ধীরে শিকারের বিশ্বাস অর্জন করে। প্রথমে বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ, অতিরিক্ত সহানুভূতি দেখানো, উপহার দেওয়া, সহায়তার প্রস্তাব কিংবা পরিবারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা তৈরি করে। তারপর তারা ধীরে ধীরে ব্যক্তিগত সীমারেখা ভাঙার চেষ্টা শুরু করে। অনেক ক্ষেত্রে অপরাধী শিকারকে মানসিকভাবে এমন নির্ভরশীল করে তোলে যে শিকার নিজেই বিপদ আঁচ করতে দেরি করে ফেলে।

নিয়ন্ত্রণমূলক সম্পর্ক ও ‘কোয়ার্সিভ কন্ট্রোল’ বিষয়ে গবেষণার জন্য পরিচিত সমাজবিজ্ঞানী ইভান স্টার্ক দেখিয়েছেন, অনেক অপরাধী ধীরে ধীরে ভুক্তভোগীকে পরিবার, বন্ধু ও সামাজিক সহায়তা ব্যবস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। কিছু নৃশংস অপরাধীর মধ্যে নিয়ন্ত্রণমূলক আচরণের প্রবণতা দেখা যায়। তারা জানতে চায় কে কোথায় যায়, কার সঙ্গে কথা বলে, কখন একা থাকে কিংবা পরিবারের দুর্বলতা কোথায়। কখনও তারা খুব সূক্ষ্মভাবে ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ করে। পরিবারের সদস্যরা পরে বুঝতে পারে যে অপরাধী দীর্ঘদিন ধরে তাদের জীবনযাত্রা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছিল।

তদন্তকারীরা আরও বলেন, ছদ্মবেশী ভয়ংকর অপরাধীরা প্রায়ই সীমারেখা পরীক্ষা করতে ‘টেস্টি বাউন্ডারিজ’ করে। অর্থাৎ তারা ছোট ছোট আচরণের মাধ্যমে দেখে মানুষ কতটা প্রতিরোধ করে। শিশুদের ক্ষেত্রে এটি হতে পারে অস্বস্তিকর স্পর্শ, অতিরিক্ত ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠতা বা তার সঙ্গে একা দেখা করার চেষ্টা। প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে হতে পারে মানসিক চাপ সৃষ্টি, ভয় দেখানো, গোপনীয়তার সুযোগ নেওয়া বা ধীরে ধীরে শিকারকে ঘনিষ্ঠজনদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলা। এসব আচরণ শুরুতেই গুরুত্ব না দিলে পরে তা ভয়ংকর রূপ নিতে পারে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ‘মাস্ক অব নরমালসি’ বা স্বাভাবিকতার মুখোশ। বহু ভয়ংকর অপরাধীর ক্ষেত্রে দেখা গেছে, তারা সমাজে ভদ্র, হাসিখুশি কিংবা দায়িত্বশীল মানুষ হিসেবে পরিচিত ছিল। কারণ তারা জানে, সন্দেহের বাইরে থাকাই তাদের মূলশক্তি। এই কারণেই অনেক ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্য বা প্রতিবেশীরা পরে বিস্মিত হয়ে বলেন,  ‘আমরা কখনও ভাবিনি তার মতো শান্তশিষ্ট মানুষ এমন হয়ে উঠতে পারে।’

ফরেনসিক মনোবিজ্ঞানী ক্যাথরিন র‍্যামসল্যান্ডের মতে, বহু গুরুতর অপরাধী দীর্ঘ সময় স্বাভাবিক ও সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য পরিচয় বজায় রাখতে সক্ষম, যা তাদের সন্দেহের বাইরে থাকতে সহায়ক হয়।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, কিছু আচরণগত সংকেতকে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি। যেমন– কারও অস্বাভাবিক নিয়ন্ত্রণমূলক আচরণ, শিশুদের প্রতি অস্বস্তিকর আগ্রহ, ব্যক্তিগত সীমারেখা বারবার অতিক্রম করা, মানুষের ভয় বা দুর্বলতা নিয়ে খেলা, অতিরিক্ত গোপনীয়তা, হঠাৎ রাগ বা সহিংস প্রবণতা, স্টকিং বা অনুসরণ করা এবং বারবার অন্যকে মানসিকভাবে কোণঠাসা করার চেষ্টা।

নিয়ন্ত্রণপ্রবণ ও ভয়ংকর অপরাধীর আচরণ বিশ্লেষণ করতে গিয়ে অপরাধ মনস্তত্ত্ববিদরা একটি বিষয় প্রায়ই উল্লেখ করেন, তারা অনেক সময় খুব অল্প সময়ের মধ্যে শিকারের জীবনে প্রবেশ করতে চায় এবং অস্বাভাবিক গতিতে ঘনিষ্ঠতা তৈরি করে। শুরুতে এটি অতিরিক্ত যত্ন, সহানুভূতি, আবেগীয় নির্ভরতা, ‘তুমিই আমাকে সবচেয়ে বেশি বোঝো’, এ ধরনের আবেগী কথা বলতে শোনা যায়। এভাবে ধীরে ধীরে তারা শিকারকে তার পুরোনো নিরাপদ সম্পর্কগুলো থেকে মানসিকভাবে দূরে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। কখনও কখনও বলে থাকে ‘তোমার পরিবারের সদস্যরা তোমাকে বোঝে না।’ একই সঙ্গে বিশ্বস্ত ও পুরোনো বন্ধুদের বিরুদ্ধে সন্দেহ সৃষ্টি করে। আবার কখনও শিকারকে এমনভাবে উপলব্ধি করায় যে পৃথিবীতে একমাত্র তারাই বিশ্বস্ত এবং আস্থাশীল মানুষ। ফলে শিকার ধীরে ধীরে বাবা-মা, ভাই-বোন, আত্মীয়স্বজন বা দীর্ঘদিনের বন্ধুদের কাছ থেকে আবেগীয়ভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে এবং মানসিকভাবে আরও দুর্বল ও নিয়ন্ত্রণযোগ্য হয়ে যায়। অপরাধ মনস্তত্ত্ববিদরা এই প্রক্রিয়াকে ‘আইসোলেশন’ বা বিচ্ছিন্নকরণ কৌশল হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। তবে সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন বা অন্তর্মুখী সব মানুষই অপরাধী নন, এটিও গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা।

কিছু গুরুতর অপরাধীর ক্ষেত্রে দেখা গেছে, তারা দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীল সম্পর্ক ধরে রাখতে পারে না এবং ঘন ঘন এলাকা, সামাজিক বৃত্ত বা পরিচয় বদলাতে থাকে। কারণ দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্কে প্রকৃত আচরণ লুকিয়ে রাখা যায় না, প্রকাশ পেয়ে যায়। এ ধরনের কিছু ধূর্ত অপরাধী সচেতনভাবেই এমন সব মানুষের সঙ্গ পছন্দ করে, যারা তাদের বিকৃত আচরণকে প্রশ্ন করবে না কিংবা নিজেরাও অসুস্থ ও সহিংস মানসিকতার অংশ। ফলে তারা ধীরে ধীরে এমন একটি সামাজিক বলয় তৈরি করে, যেখানে প্রতারণা, গোপনীয়তা ও মানসিক নিয়ন্ত্রণ স্বাভাবিক বিষয়ে পরিণত হয়।

তবে সন্দেহজনক আচরণকারী সব মানুষ অপরাধী নন, এটিও মনে রাখা জরুরি। মনোবিজ্ঞানীরা মনে করেন–এসব নিয়ে গবেষণার উদ্দেশ্য সমাজে আতঙ্ক ছড়ানো নয়, বরং সচেতনতা সৃষ্টি করা। কিন্তু পরিবার, প্রতিবেশী বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী প্রতিষ্ঠান সেগুলোকে ‘তুচ্ছ বিষয়’ ভেবে এড়িয়ে যায়।

শিশুদের নিরাপত্তার ইস্যুতে বিশেষজ্ঞরা সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেন খোলামেলা কথা বলার অধিকারের ওপর। শিশু যেন কোনো ধরনের সংকোচ ছাড়াই বলতে পারে– কে তাকে অস্বস্তিতে ফেলছে, কে তাকে একা ডাকছে বা কার আচরণ তার কাছে অদ্ভুত লাগছে। একই সঙ্গে পরিবারকে শিশুর আচরণগত পরিবর্তন যেমন হঠাৎ ভয় পাওয়া, চুপচাপ হয়ে যাওয়া, নির্দিষ্ট কাউকে এড়িয়ে চলা–এসব বিষয় বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে।

নৃশংস অপরাধীরা ছিনতাইকারীর মতো হঠাৎ অন্ধকার গলি থেকে আসে না। তারা আমার/আপনার প্রিয়জনদের খুব কাছের বৃত্তেই অবস্থান করে এবং সুযোগের অপেক্ষা করে। তাই আধুনিক অপরাধ মনস্তত্ত্বের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো– নিরাপত্তা শুধু তালা লাগানো, সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন, প্রহরী নিয়োগ বা দেয়াল নির্মাণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; নিরাপত্তা লুকিয়ে আছে সচেতনতা, অল্প সময়ের মধ্যে কাছের বৃত্তে চলে আসা মানুষের আচরণ বোঝার সক্ষমতা এবং যথাসময়ে সতর্ক হওয়ার মধ্যে।

মোশফেকুর রহমান: সাংবাদিক

আরও পড়ুন

×