ঢাকা বুধবার, ২২ জুলাই ২০২৬

প্রতিবেশী

মোদি তেলাপোকা মারতে কামান দাগিয়েছেন

মোদি তেলাপোকা মারতে কামান দাগিয়েছেন
×

বিদ্যা কৃষ্ণান

প্রকাশ: ১২ জুন ২০২৬ | ০৭:৫৪

| প্রিন্ট সংস্করণ

গত কয়েক সপ্তাহে তরুণদের ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ নামে একটি ব্যঙ্গাত্মক অ্যাকাউন্ট তৈরি করার ফলে ভারতের রাজনীতিতে বেশ উত্তেজনাকর পরিস্থিতি দেখা দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকারের এ নিয়ে গভীর নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগের ফলে কলেজ শিক্ষার্থীদের এই অনলাইন প্ল্যাটফর্ম বাতিল করে দিয়েছে। 

অসন্তোষের সমাধানের জন্য যুক্ত হওয়ার পরিবর্তে মোদি প্রশাসন একে দেশের ‘জাতীয় নিরাপত্তা’ বিপন্নকারী এবং ‘ভারতের সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। দেশটিতে তরুণদের এই পেজ এখন আর পাওয়া যায় না। বস্তুত, ব্যঙ্গাত্মক অ্যাকাউন্টকে বিস্মৃতির অতলে ঠেলে দেওয়ার জন্য সরকার একটি বহুমাত্রিক চাপ প্রয়োগের অভিযান শুরু করে। এর ওয়েবসাইট বন্ধ করে দেওয়া হয়; মন্ত্রীরা এর প্রতিষ্ঠাতাকে ‘বিদেশি’ প্রভাবাধীন থাকার অভিযোগে অভিযুক্ত করেন এবং সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিতে সুপ্রিম কোর্টে একটি পিটিশন দাখিল করা হয়। এত প্রচণ্ড ক্ষোভ নিয়ে অনলাইন অ্যাকাউন্টগুলোর পেছনে ছোটা মশা মারতে কামান দাগার মতোই।

এই কল্পনাপ্রসূত কৌতুকটি ভারতের যুবসমাজের দুর্দশার ইঙ্গিত দেয়, যারা কর্মসংস্থানহীন এক বাজারে প্রবেশ করে; তাপপ্রবাহ থেকে শুরু করে অসহ্য বায়ুদূষণের মধ্যে টিকে থাকে এবং আত্মত্যাগের ক্রমাগত উপদেশ শুনতে হয়। শুধু গত মাসেই স্নাতক মেডিকেল শিক্ষার্থীদের জন্য জাতীয় প্রবেশিকা পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়ে যাওয়ায় তা ত্রুটিপূর্ণ বলে প্রমাণিত হয়। অন্যদিকে স্কুল শিক্ষার্থীরাও একটি পৃথক খাতা দেখার কেলেঙ্কারির শিকার হয়।

যেসব ছাত্রছাত্রী সামাজিক মাধ্যমে তাদের হতাশা প্রকাশ করেছিলেন, আমাদের রাষ্ট্র-সমর্থিত টেলিভিশন চ্যানেল দূরদর্শন তাদের ‘পাকিস্তানি’ বলে আখ্যা দিয়েছে। আমরা এখন এমন এক দেশে পরিণত হয়েছি, যেখানে নিজেদের সন্তানেরাই প্রকৃত উদ্বেগ প্রকাশ করলে তাদের বিশ্বাসঘাতকতার অভিযোগে অভিযুক্ত করে। পরীক্ষার কেলেঙ্কারির ফলে ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে আত্মহত্যার হিড়িক পড়েছে। কিন্তু তাতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সান্ত্বনার দু-একটি কথাও বলেননি। একই উদাসীনতা অন্যত্রও দৃশ্যমান।

মোদির নেতৃত্বের একটি বৈশিষ্ট্য হলো দুর্ভোগে থাকা মানুষ ভারতীয় সীমান্ত থেকে যত দূরে থাকে, মানবতার দুঃখ-কষ্টের প্রতি তাঁর সহানুভূতিও ঠিক ততই বাড়তে থাকে। তিনি ভারতে তাপপ্রবাহে হওয়া উদ্বেগজনক মৃত্যুর কথা স্বীকার করেননি। তেলেঙ্গানায় এক দিনেই ৬৭ জন মারা গেছেন অথচ চীনের শানসি প্রদেশে খনি দুর্ঘটনায় নিহতদের জন্য শোক প্রকাশ করতে ঠিকই সময় দিয়েছেন। মোদি এক নিষ্ঠুর মনিবরূপে ভারত শাসন করেন এবং প্রতিটি কাজই তাঁর কাছে আনুগত্যের এক পরীক্ষা।

তার সর্বশেষ আদেশ হলো বাড়ি থেকে কাজ করা, অপ্রয়োজনে জ্বালানি খরচ না করা, বিদেশ ভ্রমণ এড়িয়ে চলা, রান্নায় তেলের ব্যবহার কমানো, স্বর্ণ কেনা থেকে বিরত থাকা, দীর্ঘক্ষণ কাজ করা, কম ভোগ করা এবং ধৈর্যশীল হওয়া। এই পর্যায়ে যদি আপনার চাকরি থাকে, ফ্রিজ থাকে, এয়ারকন্ডিশনার কেনার সামর্থ্য থাকে এবং বিদেশ ভ্রমণের খরচও বহন করতে পারেন, তাহলে মোদি প্রশাসন আপনাকে চরম ভোগবিলাসের অতল গহ্বরে বসবাসকারী বলে মনে করে। আমাদের দেশপ্রেমিক কর্তব্য হিসেবে মিতব্যয়ী হওয়ার বিষয়ে বক্তৃতা দেওয়ার ঠিক পরেই যদি তিনি ইউরোপের উদ্দেশে উড়ে না যেতেন, তাহলে এর কোনোটিই এতটা পীড়াদায়ক হতো না।

এবার মোদি ইউরোপে গেছেন। অথচ সেখানকার মুক্ত সংবাদমাধ্যমে কথা বলতে অস্বীকার করেছেন। নরওয়েতে হেলে লিং সভেনসেন নামে এক সাংবাদিক তাঁকে সাহস করে জিজ্ঞাসা করেন, তিনি কেন ‘বিশ্বের সবচেয়ে মুক্ত সংবাদমাধ্যম’-এর কাছ থেকে প্রশ্ন নিচ্ছেন না। মোদি চোখাচোখি এড়িয়ে যান এবং কোনো উত্তর না দিয়েই চলে যান। তাঁর শারীরিক ভঙ্গিতে স্পষ্টতই লজ্জার প্রকাশ ছিল। ভারত থেকে দেখলে এটা অদ্ভুত মনে হচ্ছিল, পৃথিবীতে এমন একজন মানুষ থাকতে পারে, যে মোদিকে চিৎকার করে প্রশ্ন করতে পারে। ১৩ বছর পর তাঁকে একটি সাধারণ প্রশ্ন করতে এবং তার উত্তর আশা করতে দেখাটা ছিল যেন জলের নিচে শ্বাস নিতে জানা এক সম্পূর্ণ নতুন প্রজাতিকে দেখার মতো। এটা ছিল একই সঙ্গে রোমাঞ্চকর ও অপমানজনক। বিশ্ব সংবাদমাধ্যম স্বাধীনতা সূচকে নরওয়ে ১ নম্বরে এবং ভারত ১৫৭ নম্বরে থাকায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। 

মুক্তমনাদের মুখোমুখি হলে; সেটা সিজেপির 
সঙ্গে অনলাইনে হোক বা নরওয়ের মুক্ত সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে– মোদি তাঁর প্রশাসন এবং তাঁর ট্রলরা এক ধরনের শারীরিক ও অস্তিত্বের সংকটের মধ্যে পড়ে যান। আর সুপারমার্কেটের চকলেটের সারিতে মেজাজ দেখানো এক ছোট শিশুর মতো ঝাঁপিয়ে পড়েন। এই দুর্দশার মধ্যে একমাত্র আনন্দ হলো, মোদির সাফল্যের নেশা উবে গেছে। নানা প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও সিজেপি ফুলেফেঁপে উঠছে। অন্যান্য ভিন্নমতও তাই। গত দুই মেয়াদের ক্ষণস্থায়ী বেলুনের বিপরীতে এই মেয়াদটি, যা সম্ভবত প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাঁর শেষ মেয়াদ– ইতোমধ্যে অভূতপূর্বভাবে ভারি হয়ে উঠেছে। একদিন এবং তা অচিরেই তাঁর সরকারের পতন ঘটবে; ভারতের ‘তেলাপোকাদের’ কাছে পরাজিত হয়ে।

বিদ্যা কৃষ্ণান: অনুসন্ধানী সাংবাদিক; আল জাজিরা থেকে ভাষান্তর ইফতেখারুল ইসলাম 

আরও পড়ুন

×