বড় সরদার বাড়ি
প্রত্নসম্পদ কি বাণিজ্যিক শুটিংয়ের লোকেশন?
সম্প্রতি ঐতিহাসিক ‘বড় সরদার বাড়ি’ চার দিনের জন্য একটি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের কাছে ভাড়া দেওয়া হয়
শাহেদ কায়েস
প্রকাশ: ১৩ জুলাই ২০২৬ | ১৫:৪২
একটি জাতির ইতিহাস শুধু বইয়ের পাতায় লেখা থাকে না; তা ছড়িয়ে থাকে প্রাচীন নগর, মসজিদ, মন্দির, দুর্গ, প্রাসাদ ও প্রত্নস্থাপনার ইট-পাথরের শরীরে। এসব স্থাপনা অতীতের নীরব সাক্ষী। এগুলো বর্তমান প্রজন্মের সম্পদ যেমন, তেমনি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছেও আমাদের অর্পিত এক অমূল্য আমানত। তাই প্রত্নসম্পদের ক্ষেত্রে সংরক্ষণই হওয়া উচিত রাষ্ট্রের প্রথম দায়িত্ব, বাণিজ্যিক ব্যবহার নয়।
সম্প্রতি সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের অধীন বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশনের (সোনারগাঁ জাদুঘর) ঐতিহাসিক ‘বড় সরদার বাড়ি’ চার দিনের জন্য একটি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের কাছে ভাড়া দেওয়া হয়। সেখানে ‘কোক স্টুডিও বাংলা সিজন ৪’-এর গানের ভিডিও ধারণ উপলক্ষে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন আলোকসজ্জা, ভারী ক্যামেরা, সাউন্ড সিস্টেম এবং কলাকুশলী নিয়ে ব্যাপক আয়োজন করা হয়। ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে এসেছে। একটি প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনাকে, যার মূল স্থাপনা প্রায় ছয়শ বছরের পুরোনো, তা কি এভাবে বাণিজ্যিক শুটিংয়ের জন্য ব্যবহার করা যায়? যদি যায়, তবে তার সীমারেখা কোথায়? আর সেই অনুমতি দেওয়ার আইনগত ক্ষমতাই-বা কার?
প্রত্নতত্ত্ববিদ ও স্থাপত্য সংরক্ষণ বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরে সতর্ক করে আসছেন, শত শত বছরের পুরোনো স্থাপনাগুলো বাইরে থেকে দৃঢ় মনে হলেও ভেতরের চুনসুরকি, পোড়ামাটির ইট, কাঠ, প্লাস্টার ও অলংকরণ অত্যন্ত সংবেদনশীল। দীর্ঘ সময় শক্তিশালী স্টুডিও লাইট ব্যবহারে তাপমাত্রা বেড়ে গিয়ে তাপীয় প্রসারণ ও সংকোচনের ফলে সূক্ষ্ম ফাটল সৃষ্টি হতে পারে। ভারী লাইট স্ট্যান্ড, ক্যামেরা ক্রেন, ট্রলি ও অন্যান্য যন্ত্রপাতির ওজন এবং কম্পন পুরোনো মেঝে, সিঁড়ি ও দেয়ালের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করতে পারে। কোথাও কোথাও অস্থায়ীভাবে ক্ল্যাম্প, আঠা কিংবা বৈদ্যুতিক সংযোগ স্থাপনের কারণেও স্থাপত্যের পৃষ্ঠতল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এসব ক্ষতি অনেক সময় তাৎক্ষণিকভাবে দৃশ্যমান হয় না, কিন্তু কয়েক বছর পর তার প্রভাব স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
এ কারণেই বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ঐতিহাসিক স্থাপনায় শুটিংয়ের আগে বাধ্যতামূলকভাবে ‘হেরিটেজ ইমপ্যাক্ট অ্যাসেসমেন্ট’ করা হয়। বড় সরদার বাড়ির ক্ষেত্রেও কি এমন কোনো মূল্যায়ন করা হয়েছিল? যদি হয়ে থাকে, সেই প্রতিবেদন কোথায়?
বাংলাদেশের ‘প্রাচীন স্মৃতিস্তম্ভ সংরক্ষণ আইন, ১৯৬৮’ অনুযায়ী সংরক্ষিত প্রত্নসম্পদের সংরক্ষণ রাষ্ট্রের দায়িত্ব। কোনো কর্মকাণ্ড যদি প্রত্নস্থাপনার অখণ্ডতা, নিরাপত্তা বা ঐতিহাসিক বৈশিষ্ট্যকে প্রভাবিত করার সম্ভাবনা সৃষ্টি করে, তবে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের মতামত ও অনুমোদন অপরিহার্য। অর্থাৎ প্রশাসনিক সুবিধা বা আর্থিক লাভের ভিত্তিতে কোনো সংরক্ষিত প্রত্নসম্পদ ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ আইন দেয় না। এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রয়েছে। বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশন দেশের একমাত্র জাতীয় লোকজ জাদুঘর ‘সোনারগাঁ জাদুঘর’-এর পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান। এটি সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীন পরিচালিত হয়। তাহলে বড় সরদার বাড়ি চার দিনের জন্য ভাড়া দেওয়ার বিষয়টি কি সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন নিয়ে করা হয়েছে? মন্ত্রণালয় কি এ বিষয়ে অবগত ছিল? যদি থেকে থাকে, তবে কোন আইনগত ভিত্তিতে এই অনুমোদন দেওয়া হয়েছে? আর যদি মন্ত্রণালয় অবগত না থাকে, তাহলে সেটিও একটি গুরুতর প্রশাসনিক প্রশ্ন।
একইভাবে বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশনের ক্ষমতার সীমাও পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন। জাদুঘর পরিচালনার দায়িত্ব পালন করা আর একটি প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনাকে বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া এক বিষয় নয়। যদি প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের পূর্ণাঙ্গ কারিগরি মতামত, সংরক্ষণ পরিকল্পনা এবং আনুষ্ঠানিক অনুমোদন ছাড়া এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়ে থাকে, তাহলে তার নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া উচিত।
আন্তর্জাতিক সংরক্ষণ নীতিমালাও এ বিষয়ে স্পষ্ট। ‘ভেনিস চার্টার (১৯৬৪)’ বলছে, ঐতিহাসিক স্থাপনার ব্যবহার এমন হতে হবে যাতে তার ঐতিহাসিক চরিত্র, স্থাপত্যগত অখণ্ডতা এবং সাংস্কৃতিক মূল্য ক্ষুণ্ণ না হয়। আইকোমোসের বিভিন্ন সংরক্ষণ নির্দেশিকা একই নীতির ওপর জোর দেয়। ‘ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ কনভেনশন, ১৯৭২’ রাষ্ট্রগুলোকে ঐতিহ্য সংরক্ষণে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বনের আহ্বান জানায়। বড় সরদার বাড়ি বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকাভুক্ত না হলেও আন্তর্জাতিক সংরক্ষণনীতির মৌলিক নীতিগুলো অবশ্যই প্রাসঙ্গিক।
এই ঘটনার আরেকটি দিক হলো জনগণের অধিকার। চার দিন ধরে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা অসংখ্য দর্শনার্থী বড় সরদার বাড়ি দেখতে পারেননি। অভিযোগ রয়েছে, আগে থেকে কোনো ওয়েবসাইট, সামাজিক মাধ্যম বা সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে বিষয়টি জানানো হয়নি। একটি সরকারি জাদুঘর জনগণের অর্থে পরিচালিত হয়। তাই জনগণের প্রবেশাধিকার সীমিত করার সিদ্ধান্ত হলে তার যথেষ্ট কারণ, স্বচ্ছতা এবং পূর্বঘোষণা থাকা উচিত।
প্রত্নসম্পদ থেকে আয় করা সহজ; কিন্তু হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্য আর কখনও ফিরে আসে না। তাই এখন সবচেয়ে জরুরি প্রশ্ন, আমরা কি আমাদের সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারকে সংরক্ষণ করব, নাকি ধীরে ধীরে তাকে বাণিজ্যিক ব্যবহারের সাধারণ লোকেশনে পরিণত হতে দেব?
শাহেদ কায়েস: কবি ও অধিকারকর্মী
- বিষয় :
- ঐতিহ্য