ঢাকা মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬

সৌজন্য ছিল তাঁর মজ্জাগত

সৌজন্য ছিল তাঁর মজ্জাগত
×

ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সরকার (১৯৩১-২০২৬)

এম এম খালেকুজ্জামান

প্রকাশ: ১৪ জুলাই ২০২৬ | ০৭:২০

| প্রিন্ট সংস্করণ

ব্যারিস্টার মুহম্মদ জমিরউদ্দিন সরকার ইংরেজিতে তাঁর বংশপদবি লিখতেন পুরোনো বানানে– ‘সিরকার’। যেন শব্দটির মধ্যেই ইতিহাসের অলিন্দ থেকে উঠে আসার স্মৃতিবিজড়িত। কিন্তু তাঁর চারপাশের এই ঐতিহ্যের আবরণ কখনও মানুষের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি করেনি। সৌজন্য ছিল তাঁর মজ্জাগত। বনেদিয়ানা তাঁর রুচিতে ছিল; আচরণের প্রাচীরে মানুষের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি করত না। 

আইন পেশা মানুষকে এক অদ্ভুত পৃথিবীর সন্ধান দেয়। সেখানে রাষ্ট্রপতির পাশে দাঁড়াতে হয়; একেবারে নিঃস্ব মানুষেরও হাত ধরতে হয়। আদালত প্রাঙ্গণ এমন এক সমতল, যেখানে পদমর্যাদার জৌলুস দিনের শেষে আইনগ্রন্থের বয়সী ধুলোর মতোই নিরাভরণ হয়ে আসে।

আইনজীবী পেশাসূত্রে জমিরউদ্দিন সরকারকে কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছিল। দূর থেকে যাদের কেবল পদবি দেখা যায়, কাছে এলে তাদের প্রকৃত পরিচয় প্রকাশ পায় ব্যবহারে। তিনিও পদমর্যাদার আড়ালে নয়, ব্যক্তিত্বের আলোয় ধরা দিতেন।

সময়ের আঁচড় ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সরকারের শরীরকে ধীর করেছিল, কিন্তু মনকে নয়। আশ্চর্য এক আন্তরিক কর্মস্পৃহা ছিল তাঁর। কিছুদিন আগে আরেক প্রথিতযশা আইনজীবী এ জে মোহাম্মদ আলীর স্মারকগ্রন্থের জন্য তাঁর রেকর্ডেড শ্রুতিলিখন করার সুযোগ হয়েছিল। কণ্ঠস্বরের ভাঁজে ভাঁজে তখন আরেক মানুষকে আবিষ্কার করেছিলাম। তিনি নিজের কথা কম বলেছেন; সহকর্মীদের কথা বলেছেন বেশি। সমসাময়িকদের প্রসঙ্গে শ্রদ্ধা আর প্রবীণদের স্মরণে ছিল গভীর কৃতজ্ঞতা। জুনিয়র সহকর্মীদের প্রসঙ্গে তাঁর কণ্ঠে ছিল পিতৃসুলভ মমতা।

জমিরউদ্দিন সরকার জানতেন, আদালত কেবল যুক্তিতর্কের জায়গা নয়; চরিত্র নির্মাণেরও ক্ষেত্র। যুক্তি অনুশীলনে আসে; সহমর্মিতা আসে ভেতরের শিক্ষায়। তিনি ক্লায়েন্টকে যেমন সম্মান করতেন, তেমনি ক্লার্ক, পিয়ন, বেঞ্চ সহকারী কিংবা নবীন আইনজীবীদের ব্যাপারেও ছিলেন আন্তরিক। আদালতের করিডোরে তাঁর উপস্থিতি কখনও ক্ষমতার প্রদর্শন ছিল না; ছিল সৌজন্যের নীরব অনুশীলন।
পরিপাটি পোশাক, মাথায় হ্যাট, হাতে ওয়াকিং স্টিক নিয়ে তিনি আদালত প্রাঙ্গণে প্রবেশ করতেন। পরে সময়ের প্রয়োজনে হুইলচেয়ার, আর মুখে সেই পরিচিত মৃদু স্নিগ্ধ হাসি। আদালতের সেই করিডোর নিশ্চয়ই আগের মতোই থাকবে। কাঠের দরজাগুলো খুলবে, ফাইলের স্তূপ জমবে, তর্ক হবে, রায় লেখা হবে। সেই পরিচিত পদচারণা, সেই মৃদু হাসি, সেই ভদ্র সম্ভাষণ– এসব আর ফিরে আসবে না। আদালত থাকবে, আইন থাকবে, ইতিহাসও লেখা হবে। কিন্তু কিছু মানুষ বিদায় নিলে প্রতিষ্ঠানের ভেতর একটি অদৃশ্য নীরবতা জন্ম নেয়।

ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সরকারের প্রস্থান কেবল একজন প্রবীণ আইনজীবীর মৃত্যু নয়; আদালতের সংস্কৃতির সৌম্য অধ্যায়েরও সমাপ্তি। শুধু মনে হয়; আগামীকাল আদালতে গেলে হয়তো অজান্তেই চোখ খুঁজবে সেই পরিচিত হ্যাট, সেই ওয়াকিং স্টিক, হুইলচেয়ার এবং অমলিন হাসি। তারপর মনে পড়বে– মানুষটি তো আর আসবেন না।
পেশাগত জীবনের সর্বোচ্চ উচ্চতায় পৌঁছেছিলেন জমিরউদ্দিন সরকার! জাতীয় সংসদের স্পিকার হয়েছেন। রাষ্ট্রের ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্সে সর্বোচ্চ পদ অলংকৃত করেছেন। সংবিধানের বিধান অনুযায়ী অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্বও পালন করেছেন। কিন্তু মানুষের জীবনে কিছু শিখর আছে, যেগুলো কোনো সরকারি নথিতে লেখা থাকে না। সেই শিখর হলো মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নেওয়া। সেই উচ্চতাই স্পর্শ করেছিলেন তিনি।

জমিরউদ্দিন সরকার ছিলেন জ্ঞানের নিরলস অন্বেষী। আইনচর্চা তাঁর কাছে কখনও কেবল পেশা হয়ে ওঠেনি; ছিল এক বৌদ্ধিক সাধনা। শিল্প ও বাণিজ্যিক আইন, সমুদ্র আইন, পরিবেশগত সংকটের আইনি অভিঘাত এবং বহুপক্ষীয় চুক্তি প্রণয়নের সূক্ষ্ম ও জটিল প্রক্রিয়া নিয়ে গভীর অনুসন্ধান চালিয়েছেন। আদালতের অভিজ্ঞতা যেমন তাঁকে শানিত করেছে, তেমনি অধ্যয়ন তাঁকে দিয়েছে বিস্তৃত দৃষ্টিভঙ্গি।
‘ওভারভিউ অব ইন্টারন্যাশনাল ল’ গ্রন্থে আন্তর্জাতিক আইনের বহুমাত্রিক কাঠামোকে তিনি সহজ ব্যাখ্যায় উন্মোচন করেছেন। আর ‘দ্য ল অব সি’ বইয়ে সামুদ্রিক আইনের জটিল প্রশ্নাবলিকে তিনি স্বচ্ছতা ও বিশ্লেষণী শক্তির সঙ্গে উপস্থাপন করেছেন। সংসদীয় জীবনের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার নির্যাস তিনি সংরক্ষণ করেছেন ‘এক নজরে সংসদ সম্পর্কিত বিধিবিধান’ গ্রন্থে। 
উপসংহারে মনে হয়, মানুষের জীবনকে শেষ পর্যন্ত পদ ও প্রাপ্তির তালিকা দিয়ে মাপা যায় না। একটি জীবন কতখানি সফল, তার উত্তর লুকিয়ে থাকে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি পেশাকে কতখানি মর্যাদা দিয়েছেন; মানুষের প্রতি কতখানি সম্মান দেখিয়েছেন; নিজের জ্ঞান কতখানি উদারভাবে পরবর্তী প্রজন্মের হাতে তুলে দিয়েছেন তার ওপর। ব্যারিস্টার মুহম্মদ জমিরউদ্দিন সরকার সেই বিরল মানুষদের একজন, যাদের জীবনবৃত্তান্ত রাষ্ট্রের নথিতে সংরক্ষিত থাকবে, কিন্তু তাদের প্রকৃত জীবনী লেখা থাকবে মানুষের স্মৃতিতে।

এম এম খালেকুজ্জামান: আইনজীবী, সুপ্রিম কোর্ট 
[email protected]
 

আরও পড়ুন

×