উচ্চারণের বিপরীতে
জবরদস্তির সমাজে উপেক্ষিত গণঅভ্যুত্থানের বার্তা
মাহবুব আজীজ
মাহবুব আজীজ
প্রকাশ: ১৪ জুলাই ২০২৬ | ০৭:২৭ | আপডেট: ১৪ জুলাই ২০২৬ | ০৯:৫১
| প্রিন্ট সংস্করণ
রাজনীতিতে জবরদস্তি কাম্য নয়; কিন্তু মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও জবাবদিহি চর্চার পীঠস্থান ‘রাজনীতি’ আমাদের দেশে যেন জবরদস্তির সমার্থক হয়ে আছে। বিশেষত আওয়ামী লীগ শাসনামলের সর্বশেষ এক যুগের জবরদস্তি মানুষকে বিক্ষুব্ধ করে তুলেছিল। একতরফা নির্বাচন, গুম-খুন, ব্যাংক লুট, টাকা পাচার, শেষ পর্যন্ত জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নির্বিচারে সাধারণ মানুষের ওপর গুলি; এতসব জবরদস্তির পরিণতিতে দোর্দণ্ডপ্রতাপশালী আওয়ামী লীগের পতন ঘটেছিল। তারপর গণঅভ্যুত্থানের মূল বার্তা– অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতান্ত্রিক সমাজ নির্মাণের পথে কতটা এগোল দেশ?
গণঅভ্যুত্থানে বিপুল হতাহত; জাতিসংঘ প্রতিবেদন অনুযায়ী অন্তত ১ হাজার ৪০০ মানুষের প্রাণহানি। বহু মানুষ আহত, পঙ্গু। এই অপরাধের বিচারের বিকল্প নেই। অন্তর্বর্তী সরকারও সেই পথে অগ্রসর হয়েছিল। কিন্তু আওয়ামী মূল নেতৃত্ব অপরাধে জড়িত হলেও দলটির সাধারণ নেতাকর্মী সবাই অপরাধী নন। ফলে খোদ অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে ‘ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন কমিশন’ গঠনের আলোচনা শোনা গিয়েছিল, যদিও অগ্রগতি মেলেনি।
এখন গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকার দেশের দায়িত্বে। ভোটের অধিকার থেকে বারবার বঞ্চিত জনগণের এই অধিকার ফিরে পাওয়া নিশ্চয়ই বড় অর্জন। কিন্তু মনে রাখতে হবে, এবারের নির্বাচনও অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়নি। আওয়ামী লীগের জবরদস্তি ও দুঃশাসনের বিরুদ্ধে মানুষ ক্ষুব্ধ ও প্রতিবাদী ছিল– জনরায়ের মধ্য দিয়েও সেই ক্ষোভ প্রকাশ হতে পারত। অন্তর্বর্তী সরকার সেই সুযোগ রাখেনি। নেতৃত্বশূন্য আওয়ামী লীগ হয়তো নির্বাচনেই অংশ নিত না। সেই ক্ষেত্রে দায় দলটির নেতৃত্বের ওপর বর্তাত। এর বদলে নির্বাহী আদেশে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে অন্তর্বর্তী সরকার সমাজে বিভাজন বাড়িয়েছে এবং সহাবস্থানের পথ কঠিন করে তুলেছে।
সমাজে বিভাজন ও সহাবস্থানের পথ কঠিন করে তোলার আরও কিছু সিদ্ধান্ত অন্তর্বর্তী সরকার নিয়েছিল। তাদের প্রশ্রয়ে কিছু উগ্রবাদী গোষ্ঠীর আচরণ ও কর্মকাণ্ডে মনে হতে থাকে, কেবল তারাই গণঅভ্যুত্থান করেছে। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে অহেতুক বিতর্ক, বঙ্গবন্ধুসহ মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব নিয়ে কুৎসা, মাজার ভাঙা, মুক্তিযুদ্ধের স্মারক ভাঙা, ধানমন্ডির ৩২ নম্বর অন্তত তিনবার ভাঙা; প্রথম আলো, ডেইলি স্টার, উদীচী, ছায়ানটে হামলায় অন্তর্বর্তী সরকার এমনভাবে নিষ্ক্রিয় থাকে যে, সেটা পৃষ্ঠপোষকতার ইঙ্গিত। আইনের শাসনের অনুপস্থিতিতে যত্রযত্র মব সন্ত্রাস রাজত্ব করতে থাকে। বিশৃঙ্খলার মধ্যেই সমাজে ডানপন্থার উত্থানও স্পষ্ট ও মূর্ত হয়।
গণঅভ্যুত্থানের কয়েকজন ছাত্রনেতা এনসিপি নামে রাজনৈতিক দল গঠন করে অচিরেই জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোটভুক্ত হয়। নির্বাচনেও তারা জামায়াত জোটের অংশ হিসেবে এখন বিরোধী দলের অংশ। যে বিপুলসংখ্যক নারীর অংশগ্রহণে জুলাই গণঅভ্যুত্থান সফল হয়েছিল, তাদের একটি অংশ এনসিপিতে যোগ দিয়েছিল। কিন্তু তাদের অধিকাংশই এনসিপি থেকে পদত্যাগ করে বা নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে।
গণঅভ্যুত্থানের পর নারীসহ ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুর অধিকার রক্ষায় সংসদের ভেতরে বা বাইরে জামায়াত ও এনসিপি জোটের কোনো বক্তব্য এখনও পাওয়া যায়নি। উপরন্তু নারী সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে সাম্প্রদায়িক দল ও গোষ্ঠীর সমাবেশে এনসিপি নেতাদের উপস্থিতিতে দেশের নারী নেতৃত্বের বিরুদ্ধে অশালীন উক্তি করা হয়। অন্তর্বর্তী সরকার ওই এক সমাবেশে আতঙ্কিত হয়ে নারী সংস্কার কমিশন রিপোর্ট হিমাগারে পাঠিয়ে দেয়। নির্বাচিত সরকারের পাঁচ মাসেও জাতীয় সংসদে নারী, পুলিশ, দুদক, প্রশাসন, সংবাদমাধ্যম কমিশনের সুপারিশ নিয়ে আলোচনা হয়নি।
অন্তর্বর্তী সরকারের ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে ৯৭টি বর্তমান সংসদে অপরিবর্তিতভাবে পাস হয়েছে। যেসব পাস করা হয়নি, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে বিচার বিভাগ, মানবাধিকার কমিশন, দুদক, গুম কমিশন সংক্রান্ত অধ্যাদেশ। এগুলোর অধিকাংশ বিএনপি হয় বাতিল করেছে কিংবা পরে উত্থাপন করা হবে বলে রেখে দিয়েছে। অথবা এমনভাবে সংশোধন করেছে, যার কোনো কার্যকারিতা নেই। অর্থাৎ এখন পর্যন্ত গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের ক্ষেত্রে সরকারের ভূমিকাকে ইতিবাচক বলা যাচ্ছে না। এ নিয়ে সরকারকে জবাবদিহি করার ব্যাপারে বিরোধী পক্ষের দক্ষতা ও যোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারী একটি গোষ্ঠী নিজেদের আখের গোছাতে জবরদস্তিকেই রাজনীতি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় এই গোষ্ঠীর নানাভাবে দুর্নীতিতে জড়ানোর খবর প্রকাশিত হয়। এর সঙ্গে চলে দেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে অপ্রয়োজনীয় কুতর্ক। সদ্য স্বাধীন দেশের প্রতিকূল বাস্তবতায় দেশীয় ও আন্তর্জাতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে বঙ্গবন্ধু সরকারের নানা পদক্ষেপ এসব কুতার্কিকের কাছে মিথ্যাচার ও কুৎসার বিষয় হয়ে ওঠে। তারা ভুলে যায়, পাক-ভারত উপমহাদেশে বেশ কয়েকজন রাষ্ট্রপ্রধান নৃশংসভাবে খুন হলেও একমাত্র বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকেই ১০ বছরের শিশুপুত্র, পরিবারের ২২ জন সদস্যসহ হত্যাকাণ্ডের শিকার হতে হয়। আদর্শের প্রবল শক্তি না থাকলে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে নিহত হতে হতো না। নতুন গজানো ইতিহাসপ্রণেতারা পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট হত্যাকাণ্ড কিংবা ৪ নভেম্বরের জেল হত্যাকাণ্ডের বীভৎসতা বিস্মৃত হন অথবা যুক্তি দেন– এগুলো ফ্যাসিস্ট শাসকের পরিণতি! বাস্তবে এদের কাছে পাকিস্তান ভেঙে বাংলাদেশকে স্বাধীন করাই বঙ্গবন্ধুসহ মুক্তিযুদ্ধের নেতৃবৃন্দের প্রধান অপরাধ!
সর্বশেষ অন্তর্বর্তী সরকারের শীর্ষস্থানীয়দের কয়েকজন সরাসরি এসব মিথ্যাচারে যোগ দিয়ে বলতে শুরু করেছেন, আওয়ামী লীগ আমলে ধর্মীয় লেবাসের বিরুদ্ধে জিঘাংসা প্রচার করা হতো। আওয়ামী লীগ সর্বশেষ মেয়াদে নিশ্চয় দুঃশাসন করেছে। কিন্তু এর বাইরেও কাল্পনিক দুঃশাসনের কাহিনি প্রচার করা হচ্ছে। এসবের একটিই উদ্দেশ্য– আওয়ামী লীগকে রাজনীতিতে ফিরতে না দিয়ে নিজেদের জবরদস্তির রাজনীতি চালিয়ে যাওয়া। আওয়ামী লীগ কেন– যে কোনো দলকেই কর্মফল ভোগ করতে হবে জনরায়ে। এ জন্য উদ্ভট ইতিহাস তৈরির প্রয়োজন নেই। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে আওযামী লীগের অপরাজনীতির বিরুদ্ধে মানুষ রাজপথে নেমে আসে। আওয়ামী লীগের অপরাজনীতির উত্তর হতে হবে অন্য দলগুলোর ‘আরও ভালো’ রাজনীতি। সেই ‘আরও ভালো রাজনীতি’র চর্চার বদলে জবরদস্তির চর্চা এখনও সমাজে প্রবলভাবে উপস্থিত। কারও সঙ্গে মত না মিললেই ‘আওয়ামী লীগ’ ট্যাগ দিয়ে সমাজবিচ্ছিন্ন করে রাখবার চিন্তা গণতান্ত্রিক হতে পারে না।
আমার দল যে কাজ করে, তা-ই ভালো। তাকেই সমর্থন করতে হবে– এ ধরনের দলকানা মনোভাব থেকে বেরিয়ে আসা প্রয়োজন। সামাজিক মাধ্যমসহ যে কোনো জনপরিসরে পরমতসহিষ্ণুতার তীব্র অভাব দেখা যায়। অনেকের কাছে গালাগাল, অশ্লীল, অশ্রাব্য শব্দ-বাক্যই মোক্ষ হয়ে উঠেছে। এতে ক্ষয়ে যাচ্ছে সমাজের শান্তি ও সহাবস্থানের আকাঙ্ক্ষা ও বাস্তবতা। শুধু আমার ও আমাদের মতের লোকজনের জন্য সমাজ তৈরি হতে পারে না। যদি হয়ও, সেটা জবরদস্তির সমাজ। সেই সমাজ ভাঙাই ছিল জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সবচেয়ে বড় আকাঙ্ক্ষা। সমাজের প্রত্যেক মানুষের সম্মান ও মর্যাদা নিশ্চিত করবার মধ্য দিয়েই কেবল সেই আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন সম্ভব।
মাহবুব আজীজ: উপসম্পাদক, সমকাল; সাহিত্যিক
- বিষয় :
- মাহবুব আজীজ