জলবায়ু সহিষ্ণু শিক্ষা
দুর্যোগে পরীক্ষা, সিদ্ধান্তে অদূরদর্শিতা
মাহফুজুর রহমান মানিক
মাহফুজুর রহমান মানিক
প্রকাশ: ১৬ জুলাই ২০২৬ | ০৭:৩৫ | আপডেট: ১৬ জুলাই ২০২৬ | ১১:২৮
| প্রিন্ট সংস্করণ
মেয়ের স্কুল থেকে শ্রেণি কার্যক্রম বন্ধের বার্তা পেলাম রোববার সকাল ৭টায়। বার্তাটি স্বস্তি দিয়েছিল। কারণ, অনবরত বৃষ্টিতে বাসায়ই আমাদের জবুথবু অবস্থা। মুষলধারে বৃষ্টিতে নিজে যদিও অফিসে গিয়েছি প্রায় কোমরপানি ভেঙে; শিশুরা এভাবে স্কুলে যাবে কেন? পরে খবরে জানতে পারলাম, ওইদিন রাজধানীর অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ছিল। এটাই যথার্থ সিদ্ধান্ত। যদিও এইচএসএসি ও সমমানের পরীক্ষায় শিক্ষা প্রশাসন সে দূরদর্শিতা দেখাতে পারেনি।
সোমবার এইচএসএসি পরীক্ষা ছিল; সেদিনও রাজধানীর অনেকাংশ ডুবে গিয়েছিল। বৃষ্টিও পুরোপুরি থামছিল না। এমন পরিস্থিতিতে ঢাকা বোর্ডের ওই দিনের এইচএসসি পরীক্ষা স্থগিতের দাবি ওঠে। দুঃখজনক হলেও সত্য, শিক্ষা প্রশাসন পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। এতে দেশের বিভিন্ন জায়গায় দুর্ভোগে পড়ে শিক্ষার্থীরা। কোথাও কোমরপানি ভেঙে, কোথাও নৌকা, আবার কোথাও ভ্যানে চড়ে পরীক্ষাকেন্দ্রে হাজির হয়েছে তারা। অনেককে ভেজা পোশাক ও ভেজা প্রবেশপত্র নিয়েই পরীক্ষা দিতে হয়েছে। এমন ভোগান্তিতে পড়ে সংগত কারণেই পরীক্ষার্থী ও অভিভাবকরা ক্ষুব্ধ ও বিরক্ত।
চট্টগ্রামে বন্যার কারণে সেখানকার পাঁচটি জেলার পরীক্ষা আগেই স্থগিত করা হয়। কিন্তু সোমবারের ভুল সিদ্ধান্ত অনেক শিক্ষার্থী ও অভিভাবককে ভুগিয়েছে। কুমিল্লা, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, চাঁদপুর, সিলেট, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজারসহ বিভিন্ন জেলায় সেদিন ব্যাপক বৃষ্টি ছিল। বৃষ্টিতে কুমিল্লার বিভিন্ন কেন্দ্রে পানি উঠে যায়। রাজধানীতেও বৃষ্টি ও দুর্ভোগের মধ্য দিয়ে পরীক্ষার্থীদের কেন্দ্রে পৌঁছাতে হয়। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় এমনিতেই পরীক্ষা শিক্ষার্থীদের জন্য এক ভীতির কারণ, তার ওপর এমন দুর্যোগের মধ্যে পরীক্ষা দেওয়া! আরও বেদনাদায়ক, ওইদিন এইচএসসির পদার্থবিজ্ঞান প্রথম পত্র পরীক্ষায় প্রশ্নে ভুল ছিল। শিক্ষামন্ত্রী যদিও বলেছেন, ওই দুটি প্রশ্নের জন্য পূর্ণ নম্বর দেবেন, তারপরও ওইদিনের পরিস্থিতিতে প্রশ্নে ভুল যে শিক্ষার্থীদের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করেছে– বলার অপেক্ষা রাখে না।
এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষাটি শিক্ষার্থীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এসএসসিসহ এ পাবলিক পরীক্ষার অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রে অনুকূল আবহাওয়া বিবেচনায় রাখা জরুরি। বুধবার প্রকাশিত সমকালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, আগামী বছর থেকে বর্ষাকালে আর কোনো পাবলিক পরীক্ষা না নেওয়ার বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। কেবল পাবলিক পরীক্ষাই নয়; সারাবছরের স্কুল ক্যালেন্ডার বা শিক্ষাপঞ্জি সাজানোর ক্ষেত্রেও আবহাওয়া অন্যতম প্রভাবক। বাংলাদেশ যেহেতু জলবায়ু পরিবর্তনের শিকার এবং নাজুক দেশগুলোর অন্যতম, এখানে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নানা ধরনের দুর্যোগ বেড়েছে। শীত-গরমে সময়ের হেরফের হয়েছে, তাপপ্রবাহ বেড়েছে; শীতের সময় অস্বাভাবিক শীত পড়ছে। এ কারণে দুর্যোগে শিক্ষা ব্যবস্থাপনা কেমন হবে, তার রূপরেখা দরকার। সংশ্লিষ্ট অংশীজন, শিক্ষা গবেষক ও বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে আন্তর্জাতিক নির্দেশনা মেনে এমন রূপরেখা ঠিক করতে পারলে পরিস্থিতি অনুযায়ী সরকারের সিদ্ধান্ত গ্রহণ সহজ হবে। না হলে দেখা যাবে, সোমবারের এই এইচএসসি পরীক্ষার মতো সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত নিতে শিক্ষা প্রশাসন ব্যর্থ হতে পারে।
এ ধরনের সাধারণ বিক্ষিপ্ত কিছু নীতিমালা অবশ্য নেওয়া হয়েছে। ২০২৪ সালের জানুয়ারির মাঝামাঝি যখন দেশজুড়ে শৈত্যপ্রবাহ শুরু হয়েছিল, তখন শিক্ষা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল– যেসব অঞ্চলে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে নামবে, সেখানে শিক্ষার্থীদের শ্রেণি কার্যক্রম বন্ধ থাকবে। তখন সেভাবে বিভিন্ন এলাকায় শীতের কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা হয়। অনুরূপ প্রচণ্ড গরম কিংবা তাপপ্রবাহ, বৃষ্টি-বন্যাসহ বড় বড় দুর্যোগের ক্ষেত্রেও নীতি প্রয়োজন। ইতোমধ্যে ‘জলবায়ুসহিষ্ণু শিক্ষা কৌশল গ্রহণ করা দরকার’ (সমকাল, ২৭ জানুয়ারি ২০২৫) শিরোনামের লেখায় আমি জলবায়ু পরিবর্তনজনিত বিরূপ আবহাওয়ার কারণে শিক্ষা ও শিশুর ক্ষতি এড়াতে জাতীয় কৌশল গ্রহণ করার কথা বলেছি, যেখানে জলবায়ুসহিষ্ণু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্মাণ থেকে শিশুর সুরক্ষার বিষয়ও উপেক্ষিত হবে না। এখানে বিকল্প পদ্ধতিতে শিক্ষা চালিয়ে নেওয়ার বিষয়ও নির্দেশনা থাকবে।
বিস্ময়কর হলেও সত্য, সোমবারের পরীক্ষার বিষয়ে প্রশ্নের মুখে জাতীয় সংসদে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেছেন, আবহাওয়া বিভাগ নাকি বলেছিল– সোমবার বৃষ্টি হবে না। অথচ ওইদিন যে ঢাকায় দিনভর ভারী বৃষ্টি থাকবে, তার পূর্বাভাস রোববারই দিয়েছে আবহাওয়া অফিস। এই পূর্বাভাস আমলে নিয়ে এবং শিক্ষার্থীদের দাবি মেনে ঢাকা বোর্ডের পরীক্ষা স্থগিত করা যেত। তাদের ভুল সিদ্ধান্তে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা সংক্ষুব্ধ হয়েছেন।
পরীক্ষার্থীরা অবশ্য তিন দফা দাবিতে আন্দোলন করছে– বৈরী আবহাওয়া পুরোপুরি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত এইচএসসি পরীক্ষা স্থগিত রাখা; ১৩ জুলাই প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে পরীক্ষায় অংশ নিতে না পারাদের জন্য পুনঃপরীক্ষার ব্যবস্থা এবং শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ। তবে দুয়েক দিনের পরিস্থিতিতে মনে হচ্ছে, পরীক্ষা একেবারে স্থগিত করার মতো আবহাওয়া অতটা খারাপ নয়। বাকিটা অবশ্য আবহাওয়া অফিস বলতে পারবে। চট্টগ্রামের বন্যার বিষয়টি ভিন্ন। সেখানে ১৬ জুলাই পর্যন্ত পরীক্ষা স্থগিত করা আছে। কিন্তু শিক্ষার্থীদের পুনঃপরীক্ষার দাবি বিবেচনা করা যেতে পারে।
দুর্যোগে শিক্ষা ব্যবস্থাপনার বিষয়টি পুরো শিক্ষা কাঠামোর বাইরের কিছু নয়। একে আমাদের শিক্ষানীতি, শিক্ষাক্রম, শিক্ষা আইন তথা শিক্ষার সার্বিক বিষয়ের মধ্যেই রাখতে হবে। এখন যেমন সরকার বিচ্ছিন্ন বিক্ষিপ্তভাবে শিক্ষায় নতুন কিছু বিষয় নিয়ে আসছে, তাও আনার ক্ষেত্রে শিক্ষাক্রমের সমন্বয় দরকার। সে জন্য নতুন শিক্ষাক্রম প্রণয়নে হাত দিতে হবে। তার আগে যুগোপযোগী একটি শিক্ষানীতিও জরুরি। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আবহাওয়াগত সংকট এখন নিত্য শিক্ষাব্যবস্থাকে প্রভাবিত করতে পারে। তার পূর্বপ্রস্তুতির জন্যই শিক্ষায় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা নীতিমালা দরকার।
মাহফুজুর রহমান মানিক: জ্যেষ্ঠ সহসম্পাদক, সমকাল
[email protected]
- বিষয় :
- মাহফুজুর রহমান মানিক