ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই ২০২৬

সাদা কালো

স্থানীয় সরকার নির্বাচনের ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক’ হিসাব-নিকাশ

স্থানীয় সরকার নির্বাচনের ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক’ হিসাব-নিকাশ
×

সাইফুর রহমান তপন

সাইফুর রহমান তপন

প্রকাশ: ২৩ জুলাই ২০২৬ | ০৭:৪২ | আপডেট: ২৩ জুলাই ২০২৬ | ০৭:৪৩

| প্রিন্ট সংস্করণ

প্রশ্ন উঠছে– আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন কতটা ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক’ হতে যাচ্ছে। সমকালসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের খবর, আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীর স্থানীয় নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার সুযোগ বন্ধ করতে সম্প্রতি নির্বাচন কমিশনকে (ইসি) প্রস্তাব দিয়েছে জামায়াতে ইসলামী। মঙ্গলবার প্রকাশিত সমকালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে ইসি প্রণীত খসড়া আচরণ বিধিমালার ওপর মতামত দিতে গিয়ে জামায়াতের প্রস্তাব ছিল– ‘কার্যক্রম নিষিদ্ধ কোনো রাজনৈতিক দলের পদধারী বা সক্রিয় নেতাকর্মীর নির্বাচনে অংশগ্রহণের অযোগ্য ঘোষণা করার বিধান’ স্থানীয় সরকারের সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদের প্রস্তাবিত নির্বাচনী আচরণ বিধিমালায় যুক্ত করতে হবে।  

একই প্রতিবেদন অনুসারে, নির্বাচন কমিশনার আবদুর রহমানেল মাছউদ সমকালকে বলেছেন, ‘স্থানীয় সরকার নির্বাচন নির্দলীয়ভাবে হচ্ছে। ফলে কোনো দলের নেতাদের অংশগ্রহণ করতে না দেওয়ার এখতিয়ার ইসির নেই। স্থানীয় সরকারের যেসব পদে নির্বাচন হবে, সেগুলোতে প্রার্থী হতে যোগ্যতার শর্ত পূরণ করলেই যে কেউ দাঁড়াতে পারবেন। এখানে কে কোন দলের– সেটা বিবেচনায় আনবে না ইসি।’
সর্বশেষ খবর, জামায়াতের প্রস্তাব ছাড়াই ইসি স্থানীয় সরকার নির্বাচন-সংক্রান্ত বিধিমালা চূড়ান্ত করেছে। অন্যদিকে জামায়াতের উক্ত প্রস্তাব নিয়ে গত রোববার বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভীর প্রতিক্রিয়া জানতে চেয়েছিলেন সংবাদকর্মীরা। আগারগাঁওয়ের নির্বাচন ভবনে ২০২৫ সালের দলীয় আয়-ব্যয়ের হিসাব জমা দিতে গিয়েছিল তাঁর নেতৃত্বে বিএনপির একটি প্রতিনিধি দল। রিজভীও স্পষ্ট করে বলেছেন, ‘অন্য রাজনৈতিক দল কী বলল, সেটি বিষয় নয়। প্রচলিত আইন এবং নতুন যে আইন প্রণয়ন করা হচ্ছে, সে অনুযায়ী কারা নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন, তা দেখার দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের। বিষয়টি তাদের ওপরই ছেড়ে দিলাম (বাংলা ট্রিবিউন)।’ 

ধরে নেওয়া যায়, ইসির প্রস্তাবিত বিধিমালায় সরকারেরও সায় আছে। নিয়ম অনুযায়ী, আচরণ বিধিমালা-সংক্রান্ত ইসির প্রস্তাবগুলো স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তের পর চূড়ান্ত করবে ইসি। অনস্বীকার্য, একটা নির্দলীয় নির্বাচনে গণতন্ত্র ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ সরকারের এমন অবস্থানই নেওয়ার কথা। তা ছাড়া গত ৯ জুন সচিবালয়ে তথ্য অধিদপ্তরের (পিআইডি) সম্মেলন কক্ষে নিয়মিত সংবাদ সম্মেলনে এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা বিষয়টি পরিষ্কার করেছেন। অতএব ইসি ও বিএনপি নেতা রিজভীর বক্তব্য নতুন কিছু নয়।
এটাও মানতে হবে, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পরের বছর আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে অন্তর্বর্তী সরকার। বলা হয়, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে (আইসিটি) আওয়ামী লীগ ও দলটির নেতাদের বিচারকার্য সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত নিষেধাজ্ঞা থাকবে। এরপর ইসি আওয়ামী লীগের নিবন্ধন স্থগিত করায় গত ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে পারেনি দলটি।

সেই নিষেধাজ্ঞা বিএনপি সরকারও বহাল রেখেছে। তদুপরি গত ৫ জুলাই এক সম্মেলনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, ‘বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ দেশে আর কোনো দিন রাজনীতি করতে পারবে না’ (সমকাল)। আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে ‘জুলাই ২৪ শহীদ পরিবার সোসাইটি’ ও ‘আমরা জুলাইযোদ্ধা’ কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটি আয়োজিত সেই সম্মেলনে প্রধান অতিথি ছিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সেখানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এ ঘোষণাও দিয়েছেন, শিগগিরই দল হিসেবে আওয়ামী লীগের বিচার শুরু হবে।
একই দিনে আইসিটির প্রধান প্রসিকিউটর নিজ কার্যালয়ে এবং ১৪ জুলাই আইনমন্ত্রী সংসদে জানিয়েছেন, ঘোষণা অনুযায়ী আওয়ামী লীগের বিচারের জন্য তদন্ত ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্টদের অংশগ্রহণকে বিএনপির অনুমোদন বিস্ময়কর বৈ কি।

সর্বোপরি জন্মের পর থেকেই বিএনপি প্রধান প্রতিপক্ষ হিসেবে পেয়েছে আওয়ামী লীগকে। সাম্প্রতিক দশকগুলোতে দুদলের সম্পর্ক কতটা বৈরী হয়েছিল, তা আমরা জানি। এমনকি একে অপরকে নির্মূলেরও চেষ্টা করেছে। এ প্রেক্ষাপটে গণঅভ্যুত্থানের পর বিএনপি আওয়ামী লীগকে বাগে পেয়েছে বললে ভুল বলা হয় না। অথচ বিএনপি নেতৃত্ব ভালো করেই জানেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ আওয়ামী লীগের জন্য হতে পারে বড় আশীর্বাদ। কারণ, এর মাধ্যমে দলটির নেতাকর্মীরা জনগণের সঙ্গে  স্বচ্ছন্দে মেলামেশার সুযোগ পাবেন। উপযুক্ত কৌশল প্রয়োগ করতে পারলে অনেকে সাফল্যও পাবেন। আর অন্তত গত পাঁচ দশকের ইতিহাস বলে, যতই নির্দলীয় আবরণ থাকুক, প্রধানত আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মাঠ পর্যায়ের নেতাকর্মী-সমর্থকই বিভিন্ন পর্যায়ের স্থানীয় সরকার নির্বাচনের ফল নিয়ন্ত্রণ করেন। মূলত এরাই দল দুটোর বিশেষত জেলা-উপজেলা/থানা পর্যায়ের নেতৃত্বের পদ অলংকৃত করেন। অনেকে সংসদ সদস্য ও মন্ত্রীও হয়েছেন। বর্তমান ক্ষমতাসীন দলেও তার যথেষ্ট উদাহরণ আছে। 

মোদ্দা কথা, নামে নির্দলীয় হলেও বাস্তবে অন্য প্রায় সব গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মতো এ দেশেও স্থানীয় সরকার নির্বাচন আদতে দলীয় রাজনীতিকেন্দ্রিক। ফলে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর থেকে আওয়ামী লীগের যে তৃণমূল নেতাকর্মী পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ে ‘চাচা আপন প্রাণ বাঁচা’ পরিস্থিতিতে, তারা আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোর কারণে জেগে উঠলে বিস্ময়ের কিছু থাকবে না।

মূলত এসব কারণেই আগামী অক্টোবর থেকে পর্যায়ক্রমে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের পরিকল্পনা প্রকাশ হওয়ার পরপরই সেখানে আওয়ামী লীগের অংশগ্রহণ নিয়ে আলোচনা ওঠে। আবার সরকারও এতদিন বিষয়টি স্পষ্ট করছিল না। মনে আছে, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে আওয়ামী লীগের অংশগ্রহণ নিয়ে কিছুদিন আগে স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা সংসদে প্রশ্ন করেছিলেন। স্থানীয় সরকারমন্ত্রী ও ক্ষমতাসীন দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকেই প্রশ্নটি করেছিলেন রুমিন। কিন্তু মির্জা ফখরুল প্রশ্নটি এড়িয়ে গিয়েছিলেন। রাজনীতি-সচেতন মহলে বিষয়টি কৌতূহল বাড়িয়ে দিয়েছিল।
কেউ কেউ বলছেন, প্রধান রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ না পাওয়ায় প্রায় পুরো লাভটা বিএনপিরই হয়েছে। বিশেষত ওই নির্বাচনের মাধ্যমে জামায়াতের মতো ‘ফ্রেন্ডলি অপজিশন’ পাওয়ায় সেটা আরও স্পষ্ট হয়েছে। এর ফলে আওয়ামী লীগকে এখনও জাতীয় রাজনীতির বাইরে রাখা গেছে। একই তরিকায় স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো চালাতে পারলে তৃণমূলের রাজনীতিতেও আওয়ামী লীগকে নিষ্ক্রিয় রাখার সুযোগ বাড়তে পারে। তাই শেষ মুহূর্তে সরকার হয়তো ইসির প্রস্তাবে তেমন কিছু শর্ত যোগ করতে পারে।

রাজনীতি যেমন সম্ভাবনার শিল্প, তেমনি তাতে শেষ কথা বলেও কিছু নেই। তবে সংসদ নির্বাচনের ধারায় স্থানীয় সরকার নির্বাচন হলে তাতে আওয়ামী লীগ যতটা ক্ষতিগ্রস্ত হবে, তার চেয়ে বহুগুণ ক্ষতি হবে খোদ রাজনীতির। আওয়ামী লীগ শাসনামলে নানা সুবিধা পেয়েও জাতীয় পার্টি যেমন প্রকৃত বিরোধী দল হতে পারেনি; অভিজ্ঞতার সঙ্গে সাম্প্রতিক ঘটনাবলিও বলছে, জামায়াত কার্যকর বিরোধী দল হতে পারবে না। আর বিএনপি নিশ্চয়ই আওয়ামী লীগের মতো ‘ফ্রেন্ডলি অপজিশন’ নিয়ে বারবার একতরফা ভোটের মাধ্যমে অনির্দিষ্টকাল ক্ষমতায় থাকার আহাম্মকি করবে না।

সাইফুর রহমান তপন: সহকারী সম্পাদক, সমকাল

আরও পড়ুন

×