ঢাকা শনিবার, ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

প্রতিবেশী

তেলাপোকা আন্দোলনে মামদানি প্রভাব

তেলাপোকা আন্দোলনে মামদানি প্রভাব
×

ভারতে প্রশ্নপত্র ফাঁস ইস্যুতে তরুণদের আন্দোলনের নেতৃত্বে ছিল ‘ককরোচ জনতা পার্টি’

মুকুল কেশবন

প্রকাশ: ২৮ জুলাই ২০২৬ | ০৭:০৬ | আপডেট: ২৮ জুলাই ২০২৬ | ০৮:৫৩

| প্রিন্ট সংস্করণ

ভারতে তরুণদের যে বিদ্রোহ দেখা গেল, তার নেতৃত্বে ছিল ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি)। আন্দোলন সংঘটিত হয়েছিল ‘যন্তর মন্তর’ নামে এক মানমন্দির পেছনে রেখে, যা তৈরি হয়েছে বৃত্তচাপ, সমতল ও গোলার্ধরূপী কিছু বড়, বিমূর্ত ও জ্যামিতিক কাঠামোর সমন্বয়ে। পঞ্জিকা সংশোধন ও সময় জানার উদ্দেশ্যে ১৮ শতকের গোড়ার দিকে নির্মিত হয়েছিল এটি। কয়েক দশক ধরে যন্তর মন্তর রাজনৈতিক প্রতিবাদের সমার্থক হয়ে উঠেছে। এটি এমন এক জায়গা, যা দিল্লি পুলিশ রাজনৈতিকভাবে বিক্ষুব্ধদের জন্য বরাদ্দ করে রেখেছে, যাতে তারা নিরাপদ দূরত্বে ও নিয়মের মধ্যে থেকে নিজেদের ক্ষোভ উগরে দিতে পারে। কিন্তু এর আগে কখনও এখানে এমন কোনো রাজনৈতিক আন্দোলন গড়ে ওঠেনি, যা আট সপ্তাহেরও কম সময়ের মধ্যে ভারতীয় রাষ্ট্রকে পিছু হটতে বাধ্য করেছে।

যখন এই দলের প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে সিজেপি-কে যন্তর মন্তরে নিয়ে আসেন, তখন এটি ছিল দুই কোটি অনুসারীর সামাজিক মাধ্যমের একটি হ্যাশট্যাগ মাত্র। বোস্টনে পড়াশোনাকালে দীপকে প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্তের সেই মন্তব্যটি লুফে নেন– যেখানে বেকার তরুণ ও কর্মীদের ব্যঙ্গ করে ‘পরজীবী’ ও ‘তেলাপোকা’ বলা হয়েছিল। সেটিকে এক দারুণ ভাইরাল মিমে রূপান্তর করেন দীপকে। গত ৬ জুন তিনি যখন সিজেপিকে বাস্তবে রূপ দিতে দিল্লিতে নিজ বাড়িতে ফেরেন, তখন সাধারণ মানুষ বেশ কৌতূহলী হয়ে ওঠে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আমলে নাগরিক সমাজের আন্দোলনগুলোর শোচনীয় পরিণতি দেখে কেউ ঘুণাক্ষরেও ভাবেনি, নতুন এক ডেভিড ও গোলিয়াতের লড়াই সৃষ্টি হতে যাচ্ছে, যা গত শনিবার চূড়ান্ত রূপ নেয়।

আন্দোলনের দুই নেতা অভিজিৎ দীপকে ও সৌরভ দাস– শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের মতো একটি কঠিন অথচ অর্জনযোগ্য দাবি তুলে নিজেদের সাফল্যের রাস্তা প্রশস্ত করেছেন। এটি কঠিন ছিল। কারণ রাজনৈতিক চাপের মুখে মোদি এর আগে কখনও কোনো মন্ত্রীকে বরখাস্ত করেননি। এই একগুঁয়েমি তাঁর শক্তিমত্তার ভাবমূর্তির কেন্দ্রবিন্দু ছিল। তবে এটি অর্জনযোগ্য ছিল। কারণ কোনো বিপর্যয়ের দায় নিজের কাঁধে নিয়ে কোনো মন্ত্রীর পদত্যাগের নজির এ প্রজাতন্ত্রের ইতিহাসে রয়েছে।

এই অচলাবস্থা কাটাতে মোদি কম চালাকি করেননি। এমনকি তিনি পরীক্ষা ব্যবস্থার দুর্নীতি দূর করতে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ইনস্টাগ্রামে একটি হাস্যকর ও বোকামিভরা ভিডিও প্রকাশ করেন। তাতে কাজ না হওয়ায় তাঁর সরকার শেষ পর্যন্ত নতি স্বীকার করে এবং শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। আগামী বছর উত্তর প্রদেশে বিধানসভা নির্বাচন হওয়ার কথা এবং মোদি ভালোভাবেই জানতেন, যন্তর মন্তরের এই অচলাবস্থার নিরসন না হলে বিজেপিকে বড় রাজনৈতিক মূল্য দিতে হবে।

বামপন্থি ভাষ্যকারদের কেউ কেউ সিজেপির সমালোচনা করে বলছেন, ধর্মেন্দ্র প্রধানের বরখাস্ত হওয়াটা একটি প্রতীকী জয় মাত্র; কোনো বাস্তব ও স্থায়ী পরিবর্তন নয়। প্রধানের স্থলাভিষিক্ত হওয়া নতুন শিক্ষামন্ত্রী প্রহ্লাদ জোশি ধর্মেন্দ্র প্রধানের চেয়ে কোনো অংশে উত্তম নন। ধর্মেন্দ্র প্রধানের মতো তিনিও বিজেপির উগ্রপন্থি মূল সংগঠন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ-আরএসএসের এক সদস্য। আলোচিত বিলকিস বানু দলবদ্ধ ধর্ষণ মামলায় সাজাপ্রাপ্ত ১১ জন অপরাধীকে ২০২২ সালে জেলের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই মুক্তি দেওয়ার সিদ্ধান্তকে তিনি প্রকাশ্যে সমর্থন করেছিলেন। তবে সিজেপির যুক্তি হলো, প্রধান সব সময়ই ছিলেন মোদির ছায়া। এই প্রতিবাদের মূল উদ্দেশ্য ছিল মোদিকে প্রকাশ্যে পিছু হটতে বাধ্য করার মাধ্যমে তাঁর ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করা। তা ছাড়া একটি কাঠামোগত জয় কেমন হওয়া উচিত বা তা কীভাবে অর্জন করা সম্ভব, তাও কারও কাছে পরিষ্কার ছিল না।

সিজেপির এই রাজনীতি আগামী দিনে কোন পথে এগোবে, তা এই মুহূর্তে বলা মুশকিল। তবে তাদের সবার মধ্যে যা মিল রয়েছে তা হলো বাগ্মিতা, বক্তব্যের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ, সব পরিস্থিতিতে স্থির থাকার ক্ষমতা এবং একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলার সম্ভাবনা। 

মুকুল কেশবন: দিল্লিতে বসবাসরত প্রাবন্ধিক ও লেখক; দ্য গার্ডিয়ান থেকে ভাষান্তর ইফতেখারুল ইসলাম

আরও পড়ুন

×