ঢাকা শুক্রবার, ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সাদা কালো

নির্দলীয় প্রশাসন গড়ার নিদর্শন

নির্দলীয় প্রশাসন গড়ার নিদর্শন
×

সাইফুর রহমান তপন

সাইফুর রহমান তপন

প্রকাশ: ৩০ জুলাই ২০২৬ | ০৭:৪১ | আপডেট: ৩০ জুলাই ২০২৬ | ১১:৩৯

| প্রিন্ট সংস্করণ

গত ২৩ জুলাই বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠান, সংস্থা ও করপোরেশনের শীর্ষ পদে ১২ জনকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, যাদের সবাই ক্ষমতাসীন বিএনপির কেন্দ্রীয় এবং অঙ্গ সংগঠনের বর্তমান ও সাবেক নেতা। ২৭ জুলাই প্রকাশিত সমকালের প্রতিবেদনমতে, ঘটনাটি বিশেষত প্রশাসনের ভেতরে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। যারা কয়েক দশক ধরে প্রশাসনের দলীয়করণের বিরুদ্ধে সোচ্চার এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর এ ব্যাপারে মৌলিক পরিবর্তন আশা করেছেন, তারাও নিশ্চয় হতাশ।

সবকটি পদই গ্রেড-২ মর্যাদার, যা জনপ্রশাসন কাঠামোর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্তর। মাঠ প্রশাসন মূলত এই স্তরের কর্মকর্তারাই নিয়ন্ত্রণ করেন। সরকারের উন্নয়নযজ্ঞ ও কেনাকাটার সিংহভাগ যেসব সংস্থা ও করপোরেশনের মাধ্যমে পরিচালিত হয়, সেগুলোর শীর্ষ পদে এরাই থাকেন। অন্যদিকে প্রশাসন ক্যাডারে প্রতিবছর যত কর্মকর্তা নিয়োগ পান, বাস্তব কারণেই পিরামিড আকৃতির জনপ্রশাসনের শীর্ষে ওঠা তথা সচিব বা সিনিয়র সচিব হওয়া তাদের সবার পক্ষে সম্ভব নয়। তাই জনপ্রশাসনে সবচেয়ে প্রভাবশালী ওই ক্যাডারের অনেকেরই লক্ষ্য থাকে অন্তত একটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্থার প্রধান পদ। এ পদের দাবি অন্য ক্যাডারদেরও মধ্যে থাকে। কিন্তু চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বেড়ে গেলে নিয়মিত পদোন্নতি অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। স্বাভাবিকভাবেই তা জনপ্রশাসনে হতাশার সঙ্গে অস্থিরতাও সৃষ্টি করে।

জনপ্রশাসনে প্রশাসন ক্যাডারের প্রাধান্য নিয়ে আমাদের দেশে অসন্তোষ পুরোনো– শুধু অন্যান্য কাডারের মধ্যে নয়, আমজনতার মধ্যেও। লালফিতার দৌরাত্ম্য কথাটা তো প্রবাদপ্রতিম, যার কারণে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডসহ সরকারি বহু জরুরি সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন বাধাগ্রস্ত হয়। এ সমস্যা কমিয়ে আনার জন্য কয়েক দশক আগে সরকারি প্রশাসনে বেসরকারি ‘রক্ত’ সঞ্চালনের তত্ত্ব আসে। বলা হলো, বেসরকারি খাতের দক্ষতা ও পেশাদারিত্ব যুক্ত হলে সরকারি খাতও আশানুরূপ গতিশীল হয়ে উঠবে। সম্ভবত সেই ধারণা থেকেই ২০১৮ সালে সরকারি চাকরি আইন সংশোধন করে বাংলাদেশেও জনপ্রশাসনে সমাজের বিভিন্ন অংশ থেকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ প্রক্রিয়া চালু হয়।

দেখা গেল, প্রক্রিয়াটি কার্যত ক্ষমতাসীনদের অনুগত অবসরপ্রাপ্ত আমলাদের পুনর্বাসন প্রকল্প। সেই সঙ্গে মন্ত্রী-এমপির পদবঞ্চিত ক্ষমতাসীন দলের নেতাদেরও ভাগ্য খুলে যায়। তবে এতদিন গ্রেড-২ পর্যায়ে শেষোক্তদের নিয়োগ খুব বড় সংখ্যায় ছিল না, এবার যতটা দেখা যাচ্ছে। 

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়-সংশ্লিষ্টদের বরাত দিয়ে সমকালের ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অতীতে সরকার সরকারি দপ্তর/সংস্থায় দু-একজনকে নিয়োগ দিলেও একসঙ্গে ১২ জনকে নিয়োগ এবারই প্রথম। সরকারের শুরুতেই যদি এক ধাক্কায় এত নেতাকে সরকারি গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানো হয়, আগামী দিনে তা কোথায় গিয়ে দাঁড়াতে পারে? কারণ দিন যত যাবে ততই ক্ষমতাসীন দলে পাওয়া-না পাওয়ার হিসাব বাড়বে। আর সেই হিসাব মেলাতে জনপ্রশাসনে দলীয় লোকের ভিড়ও বাড়তে থাকবে। 

যে কোনো গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষার্থে দল ও সরকার আলাদা রাখার বিষয়ও মনে রাখা দরকার। এ বিষয়ে বিশেষত বিগত আওয়ামী লীগ আমলের অসুস্থ অভিজ্ঞতার পর বিএনপি বারবার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, গত নির্বাচনের ইশতেহারেও যার প্রকাশ ঘটেছিল। তবে আলোচ্য নিয়োগে বিএনপির উল্টোযাত্রারই ইঙ্গিত মেলে।
নিয়োগগুলো এমন সময়ে হলো যখন প্রশাসনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদের সঙ্গে সর্বোচ্চ পদ মন্ত্রিপরিষদ সচিব ও অন্যান্য সচিব পদেও বহু বছর আগে অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ চলছে। এদের সবাই নাকি আওয়ামী আমলে বঞ্চিত ছিলেন। বিস্ময়কর, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় এ ধারা সূচিত হলেও এখনও বঞ্চিতদের লাইন শেষ হয়নি। একদিকে পাইকারি হারে অবসরপ্রাপ্ত আমলাদের পুনর্নিয়োগ, অন্যদিকে গত ১৭ বছর দল ক্ষমতার বাইরে থাকায় ‘ত্যাগী’ নেতাকর্মীদের ‘মূল্যায়ন’ করার পরিণতি কী দাঁড়াতে পারে তা বুঝতে বিশেষজ্ঞ হতে হয় না।

একটা কথা না বললেই নয়। আট বছর আগের কাউন্সিলে বিএনপির নির্বাহী কমিটিতে জায়গা দেওয়া হয়েছিল ছয় শতাধিক নেতাকে। তদুপরি, ‘এক নেতা এক পদ’ নীতি বারবার ঘোষণা করেও তা রক্ষা করতে পারেনি দলটি। জনপ্রশাসনে দলীয় ওই ১২ নেতার নিয়োগ সম্ভবত তারই ধারাবাহিকতা। ওপরের আশঙ্কার পেছনে এরও একটা অবদান আছে।

এ প্রসঙ্গে সিটি করপোরেশন, জেলা পরিষদসহ বিভিন্ন স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে প্রশাসক নিয়োগ দেওয়ার নামে দলীয় নেতাদের বসানোর বিষয়ও লক্ষণীয়। বিরোধী শিবিরে তো এ আশঙ্কাও জোরালো যে, সংবিধানে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে স্থানীয় সরকার পরিচালনার বিধান থাকলেও সরকার যতদিন সম্ভব নিজের লোকদের সুবিধা দিতে স্থানীয় সরকার নির্বাচন আরও বিলম্বিত করতে পারে।

এ ধরনের নিয়োগপ্রাপ্তরা যে তাদের অনুসারীদের সুবিধা দেওয়ার মাধ্যমে দলের পাশাপাশি নিজস্ব এলাকায় প্রভাব বাড়ানোর কাজে লিপ্ত হবে না, তারই বা নিশ্চয়তা কী? আর তখন কোথায় যাবে জনস্বার্থ এবং কোথায় থাকবে প্রতিষ্ঠানের সুশাসন ও পেশাদারিত্ব– তা এখনই বলে দেওয়া যায়।

সমকালের প্রতিবেদন অনুসারে, বোয়েসেলের নতুন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ রাশেদুল হক বিএনপির কেন্দ্রীয় আন্তর্জাতিক-বিষয়ক সম্পাদক। বনশিল্প উন্নয়ন করপোরেশনের চেয়ারম্যান মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল বিএনপির কেন্দ্রীয় বন ও পরিবেশবিষয়ক সম্পাদক। বিআইডব্লিউটিসির চেয়ারম্যান এ টি এম আবদুল বারী ড্যানী বিএনপির কেন্দ্রীয় সহ-ধর্মবিষয়ক সম্পাদক। 

এ ছাড়া জাতীয় সমাজকল্যাণ পরিষদের নির্বাহী সচিব কামরুজ্জামান দুলাল জাতীয়তাবাদী যুবদলের সাবেক দপ্তর সম্পাদক এবং সহসভাপতি পদমর্যাদার নেতা ছিলেন। বিএসইসির চেয়ারম্যান আবদুল খালেক বিএনপির কেন্দ্রীয় সহসাংগঠনিক সম্পাদক। এর বাইরে জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কাজী রওনাকুল ইসলাম (টিপু) বিএনপির কেন্দ্রীয় বন ও পরিবেশবিষয়ক সহসম্পাদক। তাঁত বোর্ডের চেয়ারম্যান জাকির সিদ্দিকি যুবদলের সাবেক সহসভাপতি। বিসিকের চেয়ারম্যান বেনজীর আহমেদ বিএনপির কেন্দ্রীয় সহসাংগঠনিক সম্পাদক এবং বাংলাদেশ জুট করপোরেশনের চেয়ারম্যান মামুন হাসান যুবদলের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের অতিরিক্ত সচিব পদে এক বছরের জন্য চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পেয়েছেন মো. সামসুল আলম। তিনি গত নির্বাচনের আগে বিএনপির আসন বিন্যাস কমিটির গুরুত্বপূর্ণ পদে ছিলেন। সামনেই স্থানীয় সরকার নির্বাচন, যা বর্তমান সরকারের অধীনেই হবে। যেখানে অতীতে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচন দেশে-বিদেশে ব্যাপক মানুষের গ্রহণযোগ্যতা পেলেও পরাজিত পক্ষ তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে, সেখানে কমিশনে সরাসরি দলীয় লোকের সংশ্লিষ্টতা নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করবে না, তা কি বলা যায়?

অস্বীকার করা যাবে না, এ দেশে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন নিশ্চিত করা গেলে তথা সরকার গঠনে জনতার রায়ই একমাত্র নির্ধারক হলে অন্তত অর্ধেক সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পেছনেও প্রশ্নমুক্ত নির্বাচন করতে না পারাই ছিল বড় ইস্যু। বিএনপি কি জেনেশুনে সেই পথে পা বাড়াচ্ছে? হতে পারে, আদালতের রায় মেনে বিএনপি অচিরেই তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনবে। কিন্তু নির্বাচন ব্যবস্থাকে প্রশ্নের মুখে রেখে প্রত্যাশিত সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচন কতটা সম্ভব?
সত্য, প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে দলীয় পরিচয়ের ব্যক্তিদের নিয়োগ দেওয়ার দীর্ঘদিনের সংস্কৃতি থেকে রাতারাতি বের হওয়া দুরূহ। কিন্তু বিএনপি এ থেকে বেরিয়ে আসতে চায়– তার আলামত তো অন্তত দেখাতে পারে!

সাইফুর রহমান তপন: সহকারী সম্পাদক, সমকাল

আরও পড়ুন

×