আন্তর্জাতিক
ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বিস্মৃত প্রতিশ্রুতি
নওয়াফ ওবায়েদ
প্রকাশ: ৩১ জুলাই ২০২৬ | ০৮:৪৬
| প্রিন্ট সংস্করণ
ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রায় আট দশক পরও একটি সার্বভৌম ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের সৃষ্টি আরব-ইসরায়েল সংঘাতের সবচেয়ে অমীমাংসিত প্রশ্ন হিসেবে রয়ে গেছে। যুদ্ধ হয়েছে, শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে এবং কূটনৈতিক উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। তবুও এই মূল কৌশলগত সমস্যার কোনো সমাধান হয়নি।
আজ ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা এবং ইসরায়েলের সঙ্গে একটি স্থায়ী শান্তি চুক্তি অর্জন প্রচেষ্টার সামনের সারিতে রয়েছে সৌদি আরব। ২০২৪ সালে ফিলিস্তিনকে দুই রাষ্ট্রে রূপান্তর বাস্তবায়নের জন্য বৈশ্বিক জোট গঠনে যৌথভাবে পৃষ্ঠপোষকতা করার সিদ্ধান্তই এই বিষয়ে দেশটির অটল প্রতিশ্রুতির স্পষ্ট প্রমাণ।
বাদশাহ সালমান এবং ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান পূর্বসূরি সৌদি বাদশাহদের পদাঙ্কই অনুসরণ করে চলেছেন। গত অর্ধ শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে দেশটি অত্যন্ত ধারাবাহিক অবস্থান বজায় রেখেছে। প্রশ্নটি কখনোই এমন ছিল না– ইসরায়েলের সঙ্গে শান্তি স্থাপন সম্ভব কিনা। বরং প্রশ্নটি ছিল, শান্তিকে ব্যাপক, বৈধ ও অপরিবর্তনীয় করে তোলার জন্য প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক পরিবেশ বহাল রয়েছে কিনা? এই কাঠামোর মধ্যেই ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেওয়া এবং একটি সার্বভৌম ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা হলো একটি মাত্র সাধারণ সমঝোতার দুটি সমান্তরাল অংশ। এর একটি অপরটির আগে ঘটবে– এমন কোনো কথা নেই।
দ্বি-রাষ্ট্র মতবাদের সূচনা হয়েছিল বাদশাহ ফয়সালের আমলে। তিনি ফিলিস্তিনের আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকারকে সৌদি জাতীয় নিরাপত্তা নীতির একটি মূল স্তম্ভে পরিণত করেছিলেন। তাঁর উত্তরসূরিরা পরিবর্তনশীল আঞ্চলিক বাস্তবতার সঙ্গে কূটনৈতিক প্রকাশভঙ্গিকে মানিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি একই নীতি বজায় রেখেছিলেন। কূটনৈতিক পরিবেশ বিবর্তিত হলেও সৌদি লক্ষ্যে পরিবর্তন ঘটেনি।
১৯৮১ সালের ফাহাদ পরিকল্পনা এই মতবাদকে একটি আনুষ্ঠানিক শান্তি প্রস্তাবে রূপান্তর করে, যেখানে দখলকৃত আরব ভূমি থেকে ইসরায়েলের প্রত্যাহার এবং ফিলিস্তিনের জাতীয় অধিকারকে স্বীকৃতি দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছিল। এর দুই দশক পর যুবরাজ এবং পরবর্তীকালে বাদশাহ আবদুল্লাহ ২০০২ সালের আরব শান্তি উদ্যোগের মাধ্যমে একই কৌশলগত যুক্তির প্রসার ঘটান। ১৯৬৭ সালে দখলকৃত অঞ্চল থেকে ইসরায়েলের প্রত্যাহার এবং একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বিনিময়ে ইসরায়েলকে আরব বিশ্বের সঙ্গে ব্যাপক শান্তি ও স্বাভাবিক সম্পর্কের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল।
ফলে বর্তমান সৌদি নেতৃত্ব কোনো অমীমাংসিত নীতিগত বিতর্কের উত্তরাধিকারী হননি, বরং তারা একটি প্রতিষ্ঠিত কৌশলগত মতবাদের পথেই রয়েছেন। তাদের দায়িত্ব হলো বর্তমান কূটনৈতিক পরিবেশ এমন কোনো সন্তোষজনক পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে পারে কিনা তা নিশ্চিত করা, যা বহু দশক ধরে মূলত অপরিবর্তিত।
এই ধারাবাহিকতা রাষ্ট্রের বৈধতার বৃহত্তর প্রশ্নকেও তুলে ধরে। সৌদি রাজতন্ত্রের জন্য ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের প্রতি সমর্থন কখনোই কেবল পররাষ্ট্রনীতির বিষয় ছিল না। এটি দেশটির রাজনৈতিক ও ধর্মীয় বৈধতার অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হয়ে উঠেছে, যা দুই পবিত্র মসজিদের খাদেম হিসেবে বাদশাহর ভূমিকার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত। তা ছাড়া আরব ও ইসলামী উভয় বিশ্বে দেশটির দীর্ঘস্থায়ী এই অবস্থানে অটল থাকার মাধ্যমে আরও সুদৃঢ় হয়েছে।
এই ধারাবাহিকতার গুরুত্ব আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে ২০২০ সালের আব্রাহাম অ্যাকর্ডস চুক্তির পর। সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বাহরাইনের সঙ্গে (যাদের সঙ্গে পরবর্তীকালে মরক্কো ও সুদান যুক্ত হয়) ইসরায়েলের কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে এই চুক্তিগুলো প্রমাণ করেছিল– ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কোনো অগ্রগতি ছাড়াই আরব-ইসরায়েল স্বাভাবিকীকরণ প্রক্রিয়া এগিয়ে যেতে পারে। এগুলো আঞ্চলিক কূটনীতিকে নতুন রূপ দিয়েছিল, কিন্তু ফিলিস্তিন প্রশ্নের সমাধান করতে পারেনি এবং বৃহত্তর শান্তি প্রক্রিয়াকেও পূর্ণতা দিতে পারেনি।
একই যুক্তি বৃহত্তর মুসলিম বিশ্বজুড়ে প্রযোজ্য। পাকিস্তান, ইন্দোনেশিয়া, বাংলাদেশ এবং মালয়েশিয়ার মতো বড় ও প্রভাবশালী দেশগুলো ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেওয়া থেকে বিরত রয়েছে। কারণ ফিলিস্তিন সমস্যার সমাধান হয়নি। দুই পবিত্র মসজিদের খাদেম কর্তৃক সমর্থিত এবং ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সম্পন্ন কোনো সমঝোতা এই সরকারগুলোকেও তাদের অবস্থান পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য করবে। এটি তাদের অবস্থান পরিবর্তনের ক্ষেত্রে প্রধান রাজনৈতিক ও ধর্মীয় বাধাগুলোকেও দূর করতে পারে।
এটিই মূলত সৌদি আরবকে পূর্ববর্তী আব্রাহাম অ্যাকর্ড থেকে আলাদা করে। সৌদি আরবের অংশগ্রহণ কেবল মাত্রার দিক থেকেই নয়, বরং প্রকৃতির দিক থেকেই আলাদা হবে, যা আরব ও মুসলিম বিশ্বজুড়ে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও ধর্মীয় তাৎপর্য বহন করবে।
সৌদি আরবের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নির্ভর করছে বাদশাহ সালমান ও ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমানের ওপর। ফিলিস্তিনের রাষ্ট্রমর্যাদা এবং ইসরায়েলের স্বীকৃতি কোনো ধারাবাহিক পদক্ষেপ নয়, বরং সমান্তরাল বাধ্যবাধকতা। এর একটি ছাড়া অন্যটি কখনোই দীর্ঘস্থায়ী বৈধতা অর্জন করতে পারে না।
নওয়াফ ওবায়েদ: কিংস কলেজ লন্ডনের ডিপার্টমেন্ট অব ওয়ার স্টাডিজের সিনিয়র ফেলো; আলজাজিরা থেকে ভাষান্তর ইফতেখারুল ইসলাম
- বিষয় :
- আন্তর্জাতিক