ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

আন্তর্জাতিক

ইউরেশিয়া ও পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ একসূত্রে গেঁথেছে যুক্তরাষ্ট্র

ইউরেশিয়া ও পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ একসূত্রে গেঁথেছে যুক্তরাষ্ট্র
×

এম. কে. ভদ্রকুমার

প্রকাশ: ০১ আগস্ট ২০২৬ | ০৭:৩৮

| প্রিন্ট সংস্করণ

শুক্রবার (২৪ জুলাই) ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাতের সমাপ্তির ঘোষণা দিলেও পেন্টাগন বেশ গোপনে কাস্পিয়ান সাগর পর্যন্ত যুদ্ধের বিস্তার ঘটিয়ে এক সুদূরপ্রসারী ভূরাজনৈতিক খেলা খেলেছে। পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমে ঘটনাটি প্রায় আড়ালেই থেকে যায়। তবে চায়না গ্লোবাল টেলিভিশন নেটওয়ার্ক গত ২৫ জুলাই  এক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। সেখানে বলেছে যে, ‘কাস্পিয়ান সাগর তীরবর্তী গিলান প্রদেশের জিবা কেনারে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ডস কর্পসের একটি নৌ-সদরদপ্তরে মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে। সিজিটিএন ইরানি সংবাদমাধ্যমের উদ্ধৃতি দিয়ে গিলান প্রদেশের এক নিরাপত্তা কর্মকর্তার বরাতে এ খবর জানিয়েছে। এ ছাড়া ইরানি লেবার নিউজ এজেন্সির তথ্যমতে, বন্দর আব্বাস ও বন্দর আনজালি শহরেও মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে।’

কাস্পিয়ান সাগরের উপকূলবর্তী গিলান প্রদেশটির পশ্চিম সীমান্ত সংলগ্নে রয়েছে আজারবাইজান। বিগত বছরগুলোতে দক্ষিণ কাস্পিয়ান বা ট্রান্সককেশিয়ান অঞ্চলের পশ্চিমা বলয়ের দিকে ঝুঁকে পড়ার কারণে ইরানের সঙ্গে আজারবাইজানের সম্পর্কের অবনতি ঘটেছে। অন্যদিকে ট্রান্সককেশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটোর প্রভাব বাড়ার ফলে আর্মেনিয়া ও আজারবাইজান উভয়ের সঙ্গেই রাশিয়ার সম্পর্কেও বড় ধরনের ফাটল ধরে।

বাকু ও ইয়েরেভানে এখন নতুন মোড়ল ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তায়েপ এরদোয়ান তাঁর সহযোগীর ভূমিকা পালন করছেন। একটি বিষয় পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে; সেটি হলো আজারবাইজান তুরস্কের ঘনিষ্ঠ মিত্র, অথচ আঙ্কারা সমর্থিত আল কায়দা-সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীগুলোর সিরিয়া দখলের পর কয়েক বছর ধরে মস্কোর সঙ্গে তুরস্কের সম্পর্ক কিছুটা ঠান্ডা হয়ে এসেছে। 
অন্যদিকে তুরস্কও ঐতিহাসিকভাবে কখনোই ইরানের নির্ভরযোগ্য বন্ধু ছিল না। গত বছর ইরানের সঙ্গে চলা যুদ্ধের সময় তুরস্ক তার আকাশসীমা খুলে দিয়েছিল, যাতে আজারবাইজান হয়ে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর বিমান হামলা চালাতে পারে। উল্লেখ্য, আজারবাইজান ইরানের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের অন্যতম প্রধান কৌশলগত ঘাঁটিও বটে।

ইউক্রেন সংঘাতের সুযোগ নিয়ে পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থা ও ন্যাটো রাশিয়ার মুসলিম প্রজাতন্ত্রগুলোর সীমান্তবর্তী ককাস ও কাস্পিয়ান অঞ্চলে শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে। পাশাপাশি মার্কিন-ইসরায়েলি জোটে অস্তিত্বের সংকটে থাকা ইরানের নিরাপত্তাকেও চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলছে তারা। কাস্পিয়ান উপকূলে ইরানের বৃহত্তম বন্দর এবং দেশটির জাতীয় রেলওয়ে নেটওয়ার্কের সঙ্গে সংযুক্ত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পরিবহন হাব হলো ‘বন্দর আনজালি’, গত সপ্তাহে এখানে চালানো মার্কিন বিমান হামলাকে পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমগুলো ইচ্ছাকৃতভাবেই ধামাচাপা দিয়েছে। ইউক্রেনের জন্য ওডেসা বন্দর যা, তেহরানের জন্য বন্দর আনজালিও ঠিক তাই; যেখান দিয়ে তারা পশ্চিমা অস্ত্র সহায়তা পেয়ে থাকে। বস্তুত, ইরান ও রাশিয়ার মধ্যে ঘনিষ্ঠ সামরিক সম্পর্ক রয়েছে।

তাই শনিবার (২৫ জুলাই) রাশিয়ার আঞ্চলিক জলসীমায় কাস্পিয়ান সাগরে একটি ইরানি বাণিজ্যিক জাহাজে ইউক্রেনের হামলা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর এটিই এ ধরনের প্রথম ঘটনা। ইউক্রেন ওই ইরানি জাহাজে হামলার দায় স্বীকার করে এই বার্তা দিয়েছে যে, ইউক্রেন যুদ্ধের প্রত্যক্ষ প্রভাব থেকে ইউরেশিয়ার অন্যতম স্থিতিশীল নিরাপত্তা অঞ্চলও এখন আর নিরাপদ নয়। মস্কো বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে। রুশ মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ মঙ্গলবার তাঁর নিয়মিত প্রেস ব্রিফিংয়ে বলেছেন, ‘কিয়েভ শাসকদের সন্ত্রাসী কার্যকলাপের পরিধি ক্রমেই প্রসারিত হচ্ছে।’ এই ঘটনার কথা উল্লেখ করে তিনি দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে যোগ করেন, এসব ঘটনা ‘একটি সফল এবং পরিপূর্ণ বিশেষ সামরিক অভিযানের প্রয়োজনীয়তাকেই পুনরায় জোরালোভাবে তুলে ধরে।’
ইরানি জাহাজে ইউক্রেনীয় হামলাটি আসলে ওয়াশিংটনের একটি সুপরিকল্পিত পদক্ষেপ হতে পারে। ইউক্রেন ও গিলান প্রদেশে মার্কিন বোমা হামলা প্রায় একই সময়ে সংঘটিত হয়েছে, যা তাদের মধ্যে নিবিড় সমন্বয়েরই ইঙ্গিত দেয়। রাশিয়ায় নিযুক্ত ইরানি রাষ্ট্রদূত বলেছেন যে, ভলগা নদীর মোহনা থেকে মাত্র পাঁচ মাইল দূরে থাকাকালীন জাহাজটিতে এই হামলা চালানো হয়।
কাস্পিয়ান অঞ্চলের সম্মিলিত নিরাপত্তা-সংক্রান্ত মস্কো-নেতৃত্বাধীন আঞ্চলিক ঐকমত্য যদি দুর্বল হয়ে পড়ে, তবে বহিরাগত সামরিক ও নিরাপত্তা প্রতিদ্বন্দ্বিতা এই অঞ্চলের পরিবেশ অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে। এর ফলে রাশিয়া ও ইরানের মূল স্বার্থ ভয়াবহভাবে ক্ষুণ্ন হবে। তেহরান কাস্পিয়ান সাগরের এই ঘটনাকে কোনো বিচ্ছিন্ন বা কৌশলগত হিসেবে দেখছে না, বরং এটিকে তাদের চারপাশের নিরাপত্তা পরিবেশে এক বৃহত্তর পরিবর্তনের প্রমাণ হিসেবে ভাবছে। 

গত আগস্টে হোয়াইট হাউসে মার্কিন-আজারবাইজান-আর্মেনিয়া ত্রিপক্ষীয় চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তির মাধ্যমে ট্রান্সককেশিয়ায় ‘আন্তর্জাতিক শান্তি ও সমৃদ্ধির জন্য ট্রাম্প রুট’ নামে একটি প্রধান ট্রানজিট করিডোর তৈরি করা হবে। স্পষ্টতই, যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটো কাস্পিয়ান ও মধ্য এশিয়া অঞ্চলে রাশিয়ার একাধিপত্য জোরালোভাবে চ্যালেঞ্জ করছে।
এটা স্পষ্ট যে, কাস্পিয়ান সাগর আর আগের মতো সংঘাতমুক্ত অঞ্চল নয়। গত সপ্তাহান্তে এমন এক ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার নতুন ময়দান উন্মোচিত হয়েছে, যা ইউরেশিয়ার নিরাপত্তাব্যবস্থাকে মৌলিকভাবে বদলে দিচ্ছে। আর হয়তো সংঘাতের একটি নতুন ভৌগোলিক থিয়েটারের আত্মপ্রকাশ ঘটাচ্ছে।

এম কে ভদ্রকুমার: ভারতের সাবেক কূটনীতিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক; ইন্ডিয়ান পাঞ্চলাইন থেকে সংক্ষেপিত ভাষান্তর ইফতেখারুল ইসলাম

আরও পড়ুন

×