প্রতিবেশী
৮৫০ আসনের লোকসভা গণতন্ত্রের জন্য হুমকি
শশী থারুর
প্রকাশ: ০২ আগস্ট ২০২৬ | ০৭:১৪
| প্রিন্ট সংস্করণ
সংসদের নিম্নকক্ষ লোকসভার আসন সংখ্যা একলাফে বাড়িয়ে ৮২৪ বা ৮৫০ করার লক্ষ্যে সরকার একটি সংশোধিত সীমানা পুনর্নির্ধারণ (ডিলিমিটেশন) প্রক্রিয়ায় এগিয়ে নেওয়ার যে দৃঢ়সংকল্প দেখাচ্ছে, তা ভারতের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর জন্য ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনছে। সরকার এর পক্ষে মূল যুক্তি হিসেবে যা বলছে তা পুরোপুরি গাণিতিক। তাদের মতে, ১৯৭২ সালে নির্ধারিত ৫৪৩টি আসনের সীমায় নিম্নকক্ষকে আর আটকে রাখা সম্ভব নয়। কারণ তার পর থেকে দেশের জনসংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে। অথচ বাহ্যিকভাবে গণতান্ত্রিক বলে মনে হওয়া এই যুক্তির গভীরে লুকিয়ে রয়েছে বড় এক বিপদ।
আসন্ন সীমানা পুনর্নির্ধারণ প্রক্রিয়ায় বেশ কিছু বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। যেমন– এর ফলে বিশেষ করে সফলভাবে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করার জন্য দক্ষিণ ভারতের রাজ্যগুলোকে শাস্তি দেওয়া হবে এবং একই ক্ষেত্রে ব্যর্থতার জন্য উত্তর ভারতের হিন্দি বলয়কে তুলনামূলক অতিরিক্ত পুরস্কৃত করা হবে। এর মাধ্যমে সৃষ্টি হবে তীব্র রাজনৈতিক ও যুক্তরাষ্ট্রীয় টানাপোড়েন। এসবের মাঝে একটি মৌলিক প্রশ্ন অনালোচিতই থেকে যাচ্ছে। সেটি হলো, এত সুবিশাল এবং কাঠামোগতভাবে নিয়ন্ত্রণহীন একটি আইনসভা গড়ে তোলার আদৌ কি কোনো মানে আছে? বিশ্বের কোনো প্রতিষ্ঠিত গণতন্ত্রই তা করে না।
প্রতিটি পরিপক্ব গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা এ বিষয়টি মেনে চলে– কোনো সংসদকে এমন একটি নির্দিষ্ট আয়তনের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে হয়, যাতে প্রকৃত আইন-সংক্রান্ত পর্যালোচনা, অর্থবহ বিতর্ক এবং প্রত্যেক সদস্যের স্বতন্ত্র অংশগ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি হয়। গণতান্ত্রিক তত্ত্ব এবং এর বৈশ্বিক চর্চা বারবার এটিই প্রমাণ করেছে– একটি নির্দিষ্ট সীমা ছাড়িয়ে গেলে কোনো আইনসভা আর বিতর্ক ও আলোচনার কেন্দ্র হিসেবে কাজ করতে পারে না। বরং তা এক বিশৃঙ্খল ও বিশাল এক রঙ্গমঞ্চে পরিণত হয়, যেখানে গুটিকয়েক লোক কথা বলেন, আর বাকিরা নিছক নিষ্ক্রিয় দর্শক বা ভোটিং মেশিনের সংখ্যায় পরিণত হন।
১৯২৯ সালে যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জনসংখ্যা ছিল ১২ কোটি, তখন আইন করে সে দেশের হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভসের আসন সংখ্যা ৪৩৫-এ নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছিল। আজ যুক্তরাষ্ট্রের জনসংখ্যা তার প্রায় তিন গুণ; সাড়ে ৩৩ কোটিরও বেশি। অথচ তাদের প্রতিনিধিসভার আকার এখনও ৪৩৫ রয়ে গেছে। মার্কিনিরা বোঝেন, জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে প্রতিনিধি সংখ্যা বাড়ালে আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়া স্থবির হয়ে পড়বে। তাই আসন না বাড়িয়ে প্রত্যেক প্রতিনিধি কেবল বড় একটি ভোটার গোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব করেন এবং শাসনের এই ঘাটতি মেটাতে তারা দক্ষ স্থানীয় কর্মী, আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং একটি অত্যন্ত সুসংগঠিত কমিটি ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করেন। ভারতের সংসদ সদস্যরা একই পথ অনুসরণ করতে পারেন।
৮৫০ সদস্যবিশিষ্ট একটি লোকসভার বাস্তব ফলাফল ব্যক্তি-আইনপ্রণেতাদেরও জন্য অত্যন্ত ভয়াবহ হতে পারে। সাধারণ একটি সংসদীয় অধিবেশনে সময় অত্যন্ত সীমিত। প্রতিদিনের প্রশ্নোত্তর পর্ব কিংবা কোনো জটিল বিলের ওপর সাধারণ আলোচনার কথাই ধরা যাক। একটি বিতর্কের জন্য যদি চার ঘণ্টা সময় বরাদ্দ করা হয় এবং দলীয় শক্তির ভিত্তিতে সেই সময় বণ্টন করা হয়, তবে ৮৫০ জনের মধ্যে সর্বোচ্চ ১৫ থেকে ২০ জন এমপি এতে অংশ নিতে পারবেন। বাস্তবে পেছনের সারির সংসদ সদস্য এবং ছোট দলগুলোর প্রতিনিধিরা কথা বলার সুযোগ প্রায় সম্পূর্ণরূপে হারাবেন।
সংসদের অতিরিক্ত আকারের কারণে বিপুলসংখ্যক এমপি তাদের পুরো পাঁচ বছর মেয়াদে কোনো একটি প্রশ্ন করা, কোনো বেসরকারি বিল উত্থাপন করা বা কোনো অর্থপূর্ণ বিতর্কে অংশ নেওয়ার সুযোগই পাবেন না। তারা স্রেফ নীরব পুতুলে পরিণত হবেন; দলের নির্দেশে কেবল হাত তুলবেন। এটি ভারতীয় শাসন ব্যবস্থার বিদ্যমান উদ্বেগজনক প্রবণতাকে আরও জটিল করে তুলবে, যা ইতোমধ্যে সংসদের সংকোচনশীল ভূমিকা এবং সিস্টেমিক অধঃপতনের মধ্যে দৃশ্যমান।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বছরপ্রতি সংসদ সচল থাকার দিনের সংখ্যা ক্রমাগত কমেছে, যেখানে স্থায়ী কমিটির পর্যালোচনা ছাড়াই কয়েক মিনিটের মধ্যে ধ্বনি ভোটে বিল পাস হয়ে যাচ্ছে এবং বিরোধী দলকে প্রায়ই কোণঠাসা করা হচ্ছে। সংসদে শত শত নতুন সদস্যের ভিড় জমিয়ে প্রতিষ্ঠানটির এই প্রান্তিকীকরণকে আরও ত্বরান্বিত করা হবে, যেখানে সংখ্যার নিচে গুণগত মান সম্পূর্ণ চাপা পড়বে।
লোকসভাকে ৮৫০ আসনে বিস্তৃত করার এই প্রস্তাব এমন এক সংসদ তৈরি করবে, যা শাসনের প্ল্যাটফর্ম নয়, বরং সরকারের কথার প্রতিধ্বনি করার মঞ্চ বা ইকো চেম্বারে পরিণত হবে। আমরা যখন নিজেদের গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত, তখন বুঝতে হবে, প্রকৃত প্রতিনিধিত্ব লুকিয়ে আছে বিতর্কের গুণমান, সংসদীয় কমিটির সূক্ষ্ম পর্যালোচনা এবং স্থানীয় সরকার কাঠামোর ক্ষমতায়নের মধ্যে। গণতান্ত্রিক আলোচনাকে ফাঁকা নাটকে রূপান্তরকারী কোনো বিশালাকার কক্ষে তার অস্তিত্ব থাকে না।
শশী থারুর: ভারতের সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী; বর্তমানে কংগ্রেসদলীয় সংসদ সদস্য; দ্য
ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস থেকে ভাষান্তরিত
- বিষয় :
- শশী থারুর