ঢাকা শনিবার, ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

প্রতিবেশী

ভয় কখনও শান্তির ভিত্তি হতে পারে না

ভয় কখনও শান্তির ভিত্তি হতে পারে না
×

মেহবুবা মুফতি

প্রকাশ: ০৪ আগস্ট ২০২৬ | ০৭:১৭

| প্রিন্ট সংস্করণ

কাশ্মীরের নিয়ন্ত্রণ রেখার (এলওসি) অপর প্রান্ত থেকে আসা সাম্প্রতিক দৃশ্যগুলো কেবল গভীরভাবে উদ্বেগজনকই নয়, আমার জন্য অত্যন্ত বিস্ময়করও বটে। আমি সব সময়ই বিশ্বাস করেছি, জম্মু ও কাশ্মীরে আমাদের অজস্র ক্ষোভ-অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও আমরা তুলনামূলক ভালো অবস্থায় ছিলাম। যদিও আমাদের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা বারবার উপেক্ষিত হয়েছে, তবুও এখানে বহু উন্নত অবকাঠামো, শিক্ষার সুযোগ, মেডিকেল ও ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ, আইআইটিসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠান ছিল।

এর বিপরীতে কাশ্মীরের ওই অংশটি প্রথম মেডিকেল কলেজ লাভ করে ২০০৯ সালে এবং সেখানকার অবকাঠামো আমাদের তুলনায় একেবারেই নগণ্য। আমি ধরে নিয়েছিলাম– এসব সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও সেখানকার মানুষ তুলনামূলক সন্তুষ্ট। তবে সাম্প্রতিক প্রতিবাদ-বিক্ষোভ এবং তা দমন করতে নির্মম শক্তির প্রয়োগ আমার সেই ধারণা চুরমার করে দিয়েছে। বহু দিক থেকেই সেখানকার দৃশ্যগুলো গত কয়েক দশক ধরে আমাদের এখানে ঘটে যাওয়া অভিজ্ঞতার কথাই মনে করিয়ে দেয়। এ ঘটনাগুলো কিছু কঠিন প্রশ্ন তুলে ধরে, যার মুখোমুখি হতে হবে ভারত ও পাকিস্তান– উভয় দেশের সরকারকেই।

প্রথমত, যাকে প্রায়ই পৃথিবীর স্বর্গ বলে অভিহিত করা হয়, সেই কাশ্মীর কেন দ্বি-জাতিতত্ত্ব প্রত্যাখ্যান করে পাকিস্তানের বদলে ধর্মনিরপেক্ষ ভারতকে বেছে নিয়েছিল? ১৯৪৭ সালে আমাদের মানুষ লাঠি, এমনকি খালি হাতে উপজাতি আক্রমণকারীদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিল। কাশ্মীরিরা সশ্রদ্ধ চিত্তে গান্ধীর ভারতের দর্শন গ্রহণ করেছিল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর পাকিস্তানকে প্রত্যাখ্যান করে। মহারাজা হরিসিং এবং শেখ মোহাম্মদ আব্দুল্লাহর পাশাপাশি পণ্ডিত জওহরলাল নেহরুর কাশ্মীরের প্রতি গভীর আবেগীয় টান এক নির্ণায়ক ভূমিকা পালন করেছিল। তখন বিশ্বমঞ্চে কাশ্মীরকে একটি ‘শো উইন্ডো’ বা দৃষ্টান্ত হিসেবে গড়ে তোলার ব্যাপারে নেহরুর দেওয়া প্রতিশ্রুতি কাশ্মীরিদের হৃদয়ে গভীরভাবে আলোড়ন তুলেছিল। তিনি অন্য কোনো দেশীয় রাজ্যকে এমন কোনো প্রতিশ্রুতি দেননি। কারণ তিনি কাশ্মীরের অনন্য বৈশিষ্ট্য বুঝতে পেরেছিলেন। এটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চল হলেও সেখানে হিন্দু, শিখ, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান ও অন্যরা শত শত বছর ধরে একসঙ্গে বসবাস করে আসছে; ভিন্ন ভাষায় কথা বলা ও ভিন্ন সংস্কৃতিচর্চা সত্ত্বেও তারা একটি যৌথ মাতৃভূমি ভাগ করে নিয়েছে।

তবে এর পর যা ঘটল তা হলো বিশ্বাসের ক্রমবর্ধমান অবক্ষয়। জনসংঘের সাম্প্রদায়িক রাজনীতি এবং কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদার বিরুদ্ধে তাদের প্রচার-প্রচারণা কাশ্মীরিদের হৃদয়ে প্রথম বিচ্ছিন্নতার বীজ বপন করেছিল। সময়ের সঙ্গ সঙ্গে সেই বীজ আজকের গভীর অবিশ্বাস এবং দূরত্বে রূপ নিয়েছে। আজ অদ্ভুত হলেও বাস্তব যে, আমরা নিয়ন্ত্রণ রেখার ওপারেও একই প্রক্রিয়ার পুনরাবৃত্তি দেখতে পাচ্ছি।
নয়াদিল্লিকে অবশ্যই সংলাপ, আস্থা বৃদ্ধির জন্য পদক্ষেপ এবং প্রকৃত রাজনৈতিক পুনর্মিলনের মাধ্যমে বিশ্বাস ফিরিয়ে আনতে হবে। জম্মু-কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা বাতিলের মাধ্যমে কাশ্মীর সমস্যার সমাধান হয়নি; বরং তা রাজনৈতিক ক্ষমতাহীনতা ও বিচ্ছিন্নতার অনুভূতিকে আরও তীব্র করেছে। সরকার যেসব ইতিবাচক ছবি জাহির করছে, বাস্তবতা হলো– জম্মু ও কাশ্মীর দিন দিন একটি উন্মুক্ত কারাগারে পরিণত হচ্ছে; যেখানে ঘন ঘন অভিযান, নির্বিচারে আটক, কর্মচারীদের চাকরিচ্যুত করা, বাড়িঘর গুঁড়িয়ে দেওয়া, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিধিনিষেধ, সর্বব্যাপী নজরদারি এখন প্রতিদিনের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এসব পদক্ষেপ হয়তো সাময়িকভাবে ভয় ও নীরবতা তৈরি করতে পারে, কিন্তু ভয় কখনও দীর্ঘস্থায়ী শান্তির ভিত্তি হতে পারে না। পাকিস্তানও এখন মনে হচ্ছে ঠিক একই ভুলগুলোর পুনরাবৃত্তি করছে। এমনকি তা আরও তীব্র করে তুলছে, যে ভুলগুলো আমাদের কাশ্মীরে দুর্ভোগকে দীর্ঘায়িত করেছে।

মেহবুবা মুফতি: জম্মু ও কাশ্মীরের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী; দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস থেকে ভাষান্তর ইফতেখারুল ইসলাম 
 

আরও পড়ুন

×