উচ্চারণের বিপরীতে
গণঅভ্যুত্থানের পর গণতান্ত্রিক রূপান্তরের অন্তরায়গুলো
মাহবুব আজীজ
মাহবুব আজীজ
প্রকাশ: ০৪ আগস্ট ২০২৬ | ০৭:২৯ | আপডেট: ০৪ আগস্ট ২০২৬ | ০৯:৩৫
| প্রিন্ট সংস্করণ
অনেক আত্মত্যাগে পাওয়া চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর বৈষম্যহীন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিল এ দেশের মানুষ। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের অদক্ষতা, অপ্রয়োজনীয় এজেন্ডা ও অস্পষ্টতার কারণে ১৮ মাসে জনসাধারণের গণতান্ত্রিক প্রত্যাশা তলানিতে পৌঁছে যায়। সংস্কার আলোচনার অজুহাতেও অন্তর্বর্তী সরকারের কার্যকাল দীর্ঘায়িত করবার আকাঙ্ক্ষা সরকারের একটি অংশে প্রবল হয়ে দেখা দিয়েছিল। যদিও সব বাধা পেরিয়ে ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের মধ্য দিয়ে জাতি গণতান্ত্রিক পথে নবযাত্রা শুরু করে। কিন্তু রাজনৈতিক দম্ভ, অবিশ্বাস, সন্ত্রাস, নিপীড়ন, অপরিণত রাজনৈতিক সংস্কৃতি বারংবার গণতান্ত্রিক রূপান্তরের অন্তরায় হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
গত এক সপ্তাহে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে দফায় দফায় শিক্ষার্থী পেটানো এবং হবিগঞ্জ, সিলেটে এনসিপির গাড়িবহরে হামলা কেবল আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে না; পরিণত রাজনৈতিক চর্চার অনুপস্থিতিও স্পষ্ট করে। রাকসু নেতা সালাহউদ্দিন আম্মার বেলচা হাতে গ্রন্থাগারে প্রবেশ করে মব সন্ত্রাস করলেন। অথচ শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তায় প্রশাসন নির্বিকার থাকল। মব সন্ত্রাসের ব্যাপারে একই নির্বিকার ভূমিকায় ছিল অন্তর্বর্তী সরকার। হবিগঞ্জ ও সিলেটে এনিসিপি নেতাদের ওপর ক্ষমতাসীন দলের কর্মীদের হামলার সময় পুলিশের নিষ্ক্রিয় ভূমিকাও আওয়ামী লীগ শাসনামলে লাঠিয়াল বাহিনী ও পুলিশের ঐক্যের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। রডের আঘাতে এনসিপির ছাত্রনেতা আলিফ চৌধুরীর এক চোখ হারানোর ঘটনাটি অতীতের রাজনৈতিক হিংস্রতারই প্রত্যাবর্তন।
সংঘাতের এই রাজনীতি বিগত ১৭ বছরেই কেবল ছিল, এমন নয়। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান সর্বসাম্প্রতিক যেহেতু, অবশ্যই বিশেষ মূল্য পাবে। তবে সমূলে সহিংসতার বিনাশ করতে হলে যাবতীয় হিংস্রতাকে একই কাতারে পরিমাপ করতে হবে। আমার ও আমাদের গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সংঘটিত সহিংসতা ভয়াবহ ও বিচারযোগ্য; কিন্তু আমার ও আমাদের বিরুদ্ধমতের বিরুদ্ধে সংঘটিত সহিংসতা সংগত– এটি পরিণত রাজনৈতিক চিন্তা নয়। বরং গোষ্ঠীবাজির সঙ্গে মিলে থাকে দম্ভ, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ধ্বংস করবার দুরভিসন্ধি। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে প্রতিটি সরকারের আমলে কমবেশি দমন-পীড়নের রক্তাক্ত ইতিহাস রয়েছে। কোনোটিরই দায় কেউ নেয়নি। সঠিক বিচারও বেশির ভাগ ক্ষেত্রে অধরা।
২.
বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘ফ্র্যাঙ্কলি স্পিকিং। ওরা (এনসিপি) গালি দেয় বিশ্রী-অশ্লীল ভাষায়। এই যে পাটওয়ারী, একটা বাচ্চা ছেলে। বলেন তো দেখি। ও একদিন আমার অফিসে এল প্রথম। এসে আমাকে বলছে এটা করতে হবে, ওটা করতে হবে, সেকেন্ড রিপাবলিক করতে হবে, কনস্টিটিউশন বাদ দিয়ে নতুন কনস্টিটিউশন করতে হবে। আমি বললাম, তুমি তো দেখছি ফ্যাসিবাদের মতো কথা বলছ’ (প্রথম আলো, ৩ আগস্ট, ২০২৬)।
কেবল দুই-চারজন ছাত্রনেতা নন; নিম্নমানের ও উস্কানিমূলক বক্তব্য বর্তমান রাজনীতিতে নিয়মিত অনুষঙ্গ। রীতিমতো সাংস্কৃতিক বিপর্যয় ঘটেছে। দুর্ভাগ্যজনক, এই বিপর্যয়কে একটি বর্গ বিজয়ের গৌরব হিসেবে বৃহত্তর পরিসরে ছড়িয়ে দিতে চায়।
জুলাই গণঅভ্যুত্থান সব দল-মত-পথের মানুষের সম্মিলিত আন্দোলনের ফলাফল। অথচ অন্তর্বর্তী সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় উগ্রবাদীরা এর মূল নেতৃত্ব দাবি করে নানা ধরনের বয়ান, ব্যাখ্যা সমাজে হাজির করতে শুরু করে। যদিও সকলেই জানেন, ডানপন্থিদের পাশাপাশি বামপন্থিদের গুরুত্বপূর্ণ অংশগ্রহণ জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সাফল্যের নিয়ামক হিসেবে কাজ করেছে। গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম ছাত্রনেতা, সাবেক উপদেষ্টা মাহফুজ আলম রসিকতা করেছেন, ‘এটাই জুলাই বন্দোবস্ত। ডান-বামের বাইরে যারা যেতে চাইবেন, তাদের জন্য আছে শিক্ষা। দ্রুত ডান বা অ-ডান জুলাই বেছে নিয়ে গাঁ বাচান। নিজস্ব মব না থাকলে মাইর একটাও মাটিতে পড়বে না’ (সমকাল, ৩ আগস্ট, ২৬)।
হতাশা বা রসিকতা নয়; গোষ্ঠীবাজিকে প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের অপচেষ্টা বর্তমান রাজনীতির অন্যতম চরিত্র। উগ্রপন্থিদের দাবি, যাবতীয় বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান আওয়ামী লীগ বলয়ভুক্ত। কাজেই নতুন প্রতিষ্ঠান গড়তে হবে। টেলিভিশন টকশোতে দেওয়া বক্তব্যের জন্য বিচারের পাশাপাশি কালো তালিকাভুক্তির দাবিও করা হচ্ছে। ওদিকে গণঅভ্যুত্থানের শক্তি হিসেবে দাবিদারদের মঞ্চ থেকে নারীরা সরে যাচ্ছেন; সরে যেতে বাধ্য হচ্ছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের নারীরা ছিলেন গণঅভ্যুত্থানের সবচেয়ে বড় শক্তি; তারা এখন প্রায় অদৃশ্য।
মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সর্বজনস্বীকৃত। এই ট্র্যাক রেকর্ড মুছবার সাধ্য না থাকার কারণেই সাম্প্রদায়িকদের এত দহন। আর কোনো প্রতিষ্ঠানই এক দিনে তৈরি হয় না। যুগের পর যুগে তিলে তিলে তৈরি হওয়া প্রতিষ্ঠান মতলববাজরা চোখের নিমেষে তৈরি করতে চায়। বোঝা যায়, তারা প্রতিষ্ঠানের প্রাণ সম্পর্কে কিছুই জানে না। বোঝে না– কীভাবে প্রতিষ্ঠান গড়তে হয়!

৩.
মূল সমস্যা গোড়ায়। মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ না করবার সিদ্ধান্তজাত হীনম্মন্যতা। একই সঙ্গে নিজস্ব সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল না থাকার দীনতা। এই দীনতা বিএনপি বা আওয়ামী লীগসহ অপরাপর অংশের মধ্যে না থাকলেও উগ্রবাদীরা নিজেদের ভুল রাজনীতিকে নতুন মোড়কে উপস্থাপনের অপচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। তাই সাতচল্লিশ আচমকা বড় হচ্ছে; মুক্তিযুদ্ধে ভারতের অংশগ্রহণ নিয়ে তৈরি হচ্ছে গালগল্প; বঙ্গবন্ধুসহ জাতীয় নেতৃবৃন্দকে অবমাননাসহ দেশের গত ৫০ বছরের রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক অর্জনকে অস্বীকার– সবই হীনম্মন্যতাজাত।
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী প্রধান তিন দল– বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপি নিজ নিজ ইশতেহারে রিকনসিলিয়েশন বা পুনঃসমঝোতার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। বিএনপির ইশতেহারে বলা হয়, কমিশন গঠনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ আমলে সংঘটিত মানবাধিকার লঙ্ঘনগুলোর সত্য উদ্ঘাটনসহ অপরাধীদের শাস্তির আওতায় আনা হবে। যারা নির্যাতনের শিকার, তাদের অর্থবহ ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করা হবে। জামায়াতের প্রতিশ্রুতি ছিল, গত ১৫ বছরে সংঘটিত মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রকৃত ঘটনার উন্মোচন ও নিরাময়। এর মাধ্যমে পুনর্মিলনের নতুন পর্ব শুরু হবে। এনসিপির নির্বাচনী ইশতেহারে ‘ট্রুথ ও রিকনসিলিয়েশন’ বা ‘সত্য উদ্ঘাটন বা পুনঃসমঝোতা’ কমিশন গঠনের কথা ছিল। আওয়ামী লীগ আমলের অপরাধের বিচারের পাশাপাশি যারা ফৌজদারি অপরাধে যুক্ত নন, তাদের অপরাধ ও সম্পৃক্ততা স্বীকার ও ক্ষমা প্রার্থনা সাপেক্ষে সমাজের মূল স্রোতে ফিরিয়ে আনবার প্রতিশ্রুতি ছিল। ইশতেহারের এই ‘পুনঃসমঝোতা’ বা ‘রিকনসিলিয়েশন’ নির্বাচনের পর কেউ মুখেই আনছে না। রাজনীতিতে দম্ভ ও সহিংসতা ফিরে আসবার অনুরণন যেন এই সম্মিলিত বিস্মরণ।
আওয়ামী লীগসহ যে কোনো দলের অপরাজনীতি মোকাবিলার শক্তি নৈতিকতা ও আদর্শের রাজনীতি। অথচ গেল দুই বছরে বিচারহীনতার সংস্কৃতি আরও বিস্তৃত হয়েছে। কেবল আওয়ামী লীগের রাজনীতি করার ‘অপরাধে’ অভিযোগহীন অবস্থায় দিনের পর দিন জেলে কাটছে তৃণমূলের অজস্র নেতাকর্মীর, যাদের কার বিরুদ্ধে কী অভিযোগ, অনেকেই জানেন না। অথচ দেশ সকলের, সরকারও তাই। নির্বাচিত সরকার জনগণের রাতের ঘুম নিশ্চিত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
কুৎসা রটিয়ে বিরুদ্ধমতকে নস্যাৎ করবার পুরোনো রীতি সমাজে শুধু ক্রিয়াশীলই নয়, আরও বেশি শক্তিশালী হয়েছে। সমাজকে সহনশীল ও বাস-উপযোগী অবস্থানে নিতে হলে পারস্পরিক সমঝোতার বিকল্প নেই। আজ আপনি টেবিলের এ-প্রান্তে; তাই হাসিমুখে প্রতিপক্ষকে নিপীড়ন করবেন। কিন্তু টেবিলের প্রান্ত বদল হবেই– এই সত্য চিরায়ত। রাজনীতিকরা এই সত্য মানলে শান্তিপূর্ণ ও সমঝোতামূলক সমাজ নির্মাণ অবশ্যই সম্ভব।
মাহবুব আজীজ: উপসম্পাদক, সমকাল; সাহিত্যিক
[email protected]
- বিষয় :
- মাহবুব আজীজ