সাদা কালো
রাজনৈতিক ভারসাম্য পুনঃপ্রতিষ্ঠায় নজর দিতে হবে
সাইফুর রহমান তপন
সাইফুর রহমান তপন
প্রকাশ: ০৬ আগস্ট ২০২৬ | ০৭:৫৬ | আপডেট: ০৬ আগস্ট ২০২৬ | ১১:২৯
| প্রিন্ট সংস্করণ
বাংলাদেশের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দুই বছর পূর্তিতে জনজীবনে চলমান সংকটগুলোর কথা ভাবতে গিয়ে রুশ বিপ্লবের নায়ক ভ্লাদিমির ইলিচ লেনিনের অমোঘ বাণীটা মনে পড়ল– ‘রাজনীতি হলো অর্থনীতির ঘনীভূত রূপ’।
মার্ক্সবাদে একটা দেশের উৎপাদন পদ্ধতি বা অর্থনীতিকে সবকিছুর ভিত্তি বা মূল ধরা হয়। রাজনীতিসহ বাকি সব ওপর কাঠামোর অংশ। এ তত্ত্বের ভিত্তিতে এমন একটা সমীকরণ টানা হয়, অর্থনীতিই ঠিক করে দেয় রাজনীতি, সংস্কৃতি ইত্যাদি কেমন হবে। কিন্তু লেনিন এটাকে মার্ক্সবাদের যান্ত্রিক উপলব্ধি মনে করতেন। তাঁর মতে, বিক্রিয়াটা একমুখী নয়, উভমুখী। অর্থাৎ রাজনীতিও অর্থনীতিকে প্রভাবিত করে। একটা দেশের আধিপত্যশীল রাজনীতিই বলে দেয় তার অর্থনীতি কেমন হবে।
বিষয়টি নিয়ে দলের অন্যতম প্রভাবশালী দুই নেতা ট্রটস্কি ও বুখারিনের সঙ্গে বিতর্কের অংশ হিসেবে লেনিন ১৯২১ সালে ‘ওয়ান্স এগেইন অন দ্য ট্রেড ইউনিয়নস, দ্য প্রেজেন্ট সিচুয়েশন অ্যান্ড দ্য মিসটেকস অব ট্রটস্কি অ্যান্ড বুখারিন’ গ্রন্থটি লেখেন। সেখানেই ওই বিখ্যাত বাক্যটি আছে। এর মানে হলো, অর্থনীতি রাজনীতির রূপ নির্ধারণ করলেও অনেক সময় রাজনীতিই অর্তনীতিকে পথ দেখায়। ওই বইয়ে লেনিন তাঁর কথার ব্যাখ্যা হিসেবে বলেছিলেন, ‘পলিটিকস মাস্ট টেক প্রিসিডেন্স ওভার ইকোনমিক্স’ (রাজনীতিই অর্থনীতির গতিপ্রকৃতি ঠিক করবে)।
জুলাই গণঅভ্যুত্থান ছিল দেশের ইতিহাসে প্রলয়ঙ্করী রাজনৈতিক ঘটনাবলির একটি। বিশেষত শিশু-কিশোর, গৃহিণীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার নারীর ব্যাপক অংশগ্রহণ সবাইকেই নাড়া দিয়েছিল। তাই এই রাজনৈতিক পালাবদলের পর পুরোনো সব হিসাবনিকাশ ভুলে সবকিছু নতুনভাবে শুরু করা হবে, এমন প্রত্যাশা জোরালো হয়েছিল। বিশেষত রাজনীতি ও অর্থনীতিতে আসবে গুণগত পরিবর্তন। বাস্তবে তা দেখা যাচ্ছে না।
অস্বীকারের জো নেই, আমাদের রাজনীতি এখনও পুরোনো বিষাক্ত বৃত্তেই ঘুরপাক খাচ্ছে। সেই আগের মতোই যে কোনো ঘটনায় পরস্পর দোষারোপের খেলা চলছে। এমনকি ক্ষমতাসীন এবং ক্ষমতাপ্রত্যাশীদের মধ্যে সংঘর্ষ-হানাহানিও বন্ধ হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের সঙ্গে সরকারি প্রশাসন এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান দখলের অভিযান, পাল্টা অভিযানও চলছে। অথচ বলা হয়েছিল, গণঅভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারী বিএনপিসহ বর্তমানে সক্রিয় প্রায় সব ডান-বাম-মধ্যপন্থি দল নিজেদের সাধারণ প্রতিপক্ষ আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে দলগুলো ‘নতুন রাজনীতি’ উপহার দেবে। এখন সেটা অদূর ভবিষ্যতেও দেখা যাবে বলে মনে হচ্ছে না।
আওয়ামী লীগকে বাইরে রেখে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো। এ নির্বাচনের পর সমমনা হওয়া সত্ত্বেও দলগুলোর প্রতিক্রিয়া এক রকম হলো না। বিরোধী পক্ষ ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং করে তাদের জেতা বহু আসন ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগ তুলেই যাচ্ছে। সরকারি দলও নির্বাচনের পরপর রীতিমতো সংবাদ সম্মেলন করে বলেছে, বিরোধীরা ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং না করলে তাদের আসন আরও বাড়ত। সরকারি দলের অনেক নেতা এমনও বলেছেন, ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে জামায়াত-এনসিপিকে আসন ‘উপহার’ দিয়েছে বিএনপি।
তারপরও সাধারণ মানুষ নির্বাচনকে মেনে নিয়েছেন। তারা তাকিয়ে ছিলেন সংসদের দিকে, সেখানে হয়তো জনগণের প্রকৃত রাজনীতি ভাষা পাবে। তবে সত্যি বলতে কি, ইতোমধ্যে সমাপ্ত সংসদের দুটো অধিবেশন দেখে অনেকে হতাশ। বিশেষত বিরোধী পক্ষের বক্তব্য শুনলে মনে হয় না, তাদের কেউ সংসদের রীতিনীতি জানেন। সংসদে কোন ভাষা ও শব্দ উচ্চারণ করা যায়, কোনটা যায় না, তাদের তা শেখাতে হচ্ছে। সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয়, জনগুরুত্বপূর্ণ কোনো বিষয়ই সংসদে আলোচনা হয়নি। বিরোধী দল যেন প্রায় সব ইস্যুতেই হিজ মাস্টার্স ভয়েস। ‘গঠনমূলক বিরোধী দল’ হতে গিয়ে সরকারের জবাবিদিহি ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার মূল কাজটিই তারা এড়িয়ে যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটা প্রশ্নবিদ্ধ বাণিজ্য চুক্তি হয়েছে পুরো গোপনে। সেটা নিয়ে সংসদে টুঁ শব্দটি করল না বিরোধী পক্ষ। কেউ যদি এ সংসদে আগের দুই সংসদের ছায়া দেখতে পায়, দোষ দেওয়া যাবে?
এ অবস্থায় রাষ্ট্র সংস্কারের বহুল আলোচিত ইস্যুর ভাগ্যে যা ঘটার তাই ঘটেছে। দলগুলোর মধ্যে এসব নিয়ে মতভেদও চরমে। বিরোধীরা সংস্কারের দাবিতে বাইরে মিছিল-মিটিং করছে বটে, তবে তা গ্যালারি শোর চেয়ে বেশি কিছু নয়। মানুষ ভেবেছিল, অন্তত বিচার বিভাগের স্বতন্ত্র সচিবালয়; স্বাধীন কমিশনের অধীনে দিয়ে পুলিশের আইনের মধ্যে থেকে দায়িত্ব পালন নিশ্চিত করা; দুদকের পাশাপাশি জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দেওয়া ইত্যাদি সংস্কার দেখা যাবে। সে আশার গুড়ে সম্ভবত বালিই পড়তে যাচ্ছে।
এদিকে অর্থনীতির সংকট যেমন দিন দিন বাড়ছে, তেমনি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিও নিম্নমুখী। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বিদ্যুৎ ও জ্বালানির তীব্র সংকট, আয়-উপার্জনের পথের সংকোচনের সঙ্গে জননিরাপত্তা সংকট যুক্ত হয়ে মানুষকে ত্রাহি মধুসূদন রব তুলতে বাধ্য করছে। অন্যদিকে, সরকার একের পর এক আশার বাণী শোনাচ্ছে, বিশেষত অর্থনীতি ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি নিয়ে। জনসাধারণ সে আশার বাণীতে ভরসা রাখতে পারছে বলে মনে হয় না।

নিবিড় পর্যবেক্ষণ করলে বোঝা যায়, আওয়ামী লীগ আমলের তথাকথিত রাষ্ট্র দর্শনই বিদ্যমান। তখন রাজনীতির বদলে অর্থনীতিরই ওপর বেশি জোর দেওয়া হয়েছিল। এখন কি তার চেয়ে ভিন্ন কিছু হচ্ছে? হ্যাঁ, এখন ঘোষণা নেই– গণতন্ত্রের চেয়ে উন্নয়ন বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু অস্বীকার করা যাবে, নানা অপকৌশল ও নিবর্তনমূলক পদক্ষেপের মাধ্যমে আগের মতোই বিরোধী রাজনীতিকে খোপের মধ্যে আটকানোর প্রয়াস এখনও চলছে? প্রশাসনের দলীয়করণ কি কম হচ্ছে? এই যে শিক্ষাঙ্গনে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে সংঘর্ষ চলছে, এর লক্ষ্য আগের মতোই শিক্ষাঙ্গনে দখলদারিত্ব কায়েম করা বা বজায় রাখা। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকদের গায়ে আওয়ামী দোসর তকমা লাগিয়ে পদচ্যুতি বা বহিষ্কারের লক্ষ্যও কি একই নয়?
কথাটা আগেও বলেছি– আওয়ামী লীগের মতো একটা বিপুল জনসমর্থনপুষ্ট দলকে গায়ের জোরে ময়দানের বাইরে রাখার ফলে রাজনীতি ভারসাম্যহীন হয়ে পড়েছে। বিএনপির সঙ্গে অন্যদের শক্তির পার্থক্য এতটাই যে, মাঠে মোকাবিলার সামর্থ্য কার্যত নেই। এ কারণেই ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অন্তর্ভুক্তিমূলক করার কথা উঠেছিল। এখনও অন্তর্ভুক্তির কার্যকর উপায় বের করা জরুরি।
স্মরণ করা যেতে পারে, আওয়ামী লীগ কথিত উন্নয়নকে গণতন্ত্রের ওপর প্রাধান্য দিয়ে কয়েক বছর রাজনীতির মাঠ নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারলেও শেষ পর্যন্ত সে দাওয়াই কাজে লাগেনি। এমনকি তাদের শাসনের শেষ দিকে উন্নয়নও মুখ থুবড়ে পড়েছিল। অর্থনীতিতে অলিগার্কদের দৌরাত্ম্য, অর্থ পাচার দিন দিন বাড়ছিল। বিশেষত করোনা মহামারির পর থেকে অর্থনীতির যে দুর্দশা শুরু হয়েছিল, তার মূল উৎস কিন্তু করোনা বা রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ ছিল না। মূলত রাজনীতি বা গণতন্ত্রহীনতার সংকটই অর্থনীতির আজকের অচলাবস্থার সূচনা করেছিল।
তাই, নিবন্ধের সূচনায় উদ্ধৃত লেনিনের কথাটা আজও প্রাসঙ্গিক। অর্থনীতি ও অন্য সব বিষয় ঠিক করতে হলে আগে রাজনীতি ঠিক করতে হবে। তা শুরু হতে হবে অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক ব্যবস্থা পুনঃপ্রচলনের মাধ্যমে। নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানের পর যেভাবে জাতীয় পার্টিকে নিয়েই নির্বাচন ও রাজনীতি শুরু হয়েছিল।
সাইফুর রহমান তপন: সহকারী সম্পাদক, সমকাল; সাবেক ছাত্রনেতা
- বিষয় :
- সাইফুর রহমান তপন