সমাজ
মধ্যবিত্তের নিরন্তর অথচ নীরব যন্ত্রণার গল্প
মোশতাক আহমেদ
মোশতাক আহমেদ
প্রকাশ: ০৭ আগস্ট ২০২৬ | ০৭:৫৬ | আপডেট: ০৭ আগস্ট ২০২৬ | ১৩:৫৫
| প্রিন্ট সংস্করণ
সংকটটা সবারই। তবে মধ্যবিত্তের ক্ষেত্রে তা প্রকটতর। একসময় যারা ছিল আর্থিকভাবে স্বনির্ভর, তারাই আজ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধির চাপে দিশেহারা। জীবনের মান রক্ষা দূরের কথা, বেঁচে থাকাই এখন কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। আগে যারা মাস শেষে কিছু সঞ্চয় করে সন্তানের ভবিষ্যতের কথা ভাবতেন, তারাই এখন মাসের শেষ দিকে দোকানে বাকি করছেন। কেননা, আয় অপরিবর্তিত, ব্যয় প্রতিনিয়ত ঊর্ধ্বমুখী। দিন দিন বাড়ছে আয় ও ব্যয়ের ব্যবধান; সৃষ্টি হচ্ছে নির্মম দহন– মধ্যবিত্তের জীবনে। আর এই দহনের যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে অনেকেই বেছে নিচ্ছেন আত্মহননের পথ। ঠিক যেমনটি করেছেন গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ার প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক বিদ্যুৎ কান্তি রায়। নির্ধারিত কিন্তু সীমিত আয়ে সংসার চালাতে গিয়ে জর্জরিত হয়ে পড়েছিলেন ঋণে। একসময় আর সইতে না পেরে ভেঙে পড়লেন মানসিকভাবে। চুকিয়ে দিলেন জীবনের পাট গলায় ফাঁস দিয়ে (দৈনিক যুগান্তর, ২১ জুন ২০২৬)।
যিনি সারাজীবন ছাত্রছাত্রীদের পাঠদান করেছেন; শিখিয়েছেন কীভাবে জীবন সংগ্রামে টিকে থাকতে হয়; তিনিই নিজের জীবনের পাট সাঙ্গ করলেন নিজেকে কামরাঙা গাছের ডালে ঝুলিয়ে! এই কাহিনি শুধু বিদ্যুৎ কান্তির নয়, কমবেশি সব মধ্যবিত্তের।
ঋণের ভারে জর্জরিত, জীবনযুদ্ধে পরাজিত, অবসন্ন আর ক্লান্ত সব মানুষ। বিদ্যুৎ কান্তি নিজেকে ঝুলিয়ে ভবলীলা সাঙ্গ করেছেন। অনেক বিদ্যুৎ কান্তি আমাদের আশপাশেই বেঁচে রয়েছেন ধুঁকে ধুঁকে। নীরবে জীবনের বোঝা টেনে নিয়ে বেড়ান। তাদের গল্প হয়তো কেউ কেউ জানেন; অনেকেই জানেন না। জানলেও সেই সব লেখা হয় না। তারা নীরব যন্ত্রণায় জীবন্মৃত অবস্থায় সংসারের ঘানি টেনে টেনে টিকে থাকেন।
দেশে ঘানি টানা মধ্যবিত্তের সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। অনেক সংস্থার মতে, প্রতিবছর প্রায় ২০ লাখ মানুষ এই কাতারে যুক্ত হচ্ছে। বিআইডিএসের ২০১৫ সালের এক গবেষণামতে, সেই সময় মোট জনসংখ্যার ২০ শতাংশ ছিল মধ্যবিত্ত; বর্তমানে এই হার ২৫ থেকে ৩০ শতাংশে পৌঁছেছে বলে কারও কারও ধারণা। অথচ ষাটের দশকেও দেশে মধ্যবিত্তের হার ছিল মাত্র ৫ শতাংশ।
একসময় ক্রমবিকাশমান মধ্যবিত্ত শ্রেণির হাতেই ছিল রাজনীতির নিয়ন্ত্রণ। আন্দোলন-সংগ্রাম সবকিছুতেই তারা ছিল সামনের সারিতে। এখনও তারাই আছে। কিন্তু দেশে মুক্তবাজার অর্থনীতির দ্রুতলয়ে বিকাশের ফলে নেতৃত্বের নিয়ন্ত্রণটা চলে গেছে পুঁজির নিয়ন্ত্রক উচ্চবিত্তদের কাছে। ফলে জাতীয় সংসদ থেকে সরকারের নীতিনির্ধারণী; সব জায়গা থেকেই ক্রমে ছিটকে পড়ছে এই শ্রেণির মানুষ।
অবশ্য শ্রেণির ভেতরেও শ্রেণি থাকে। সমাজে এখন দুই ধরনের মধ্যবিত্ত আছেন; সীমিত আয়ের মধ্যবিত্ত, আর আয়হীন বা বিত্তহীন মধ্যবিত্ত। দ্বিতীয় ক্যাটেগরির সংখ্যাটা গ্রাম এলাকাতেই বেশি; তবে শহরেও আছে। প্রজন্ম পরম্পরায়, বিশেষ করে দুই বা তিন প্রজন্ম ধরেই এরা মধ্যবিত্ত। এদের সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। একসময় বাংলাদেশের গ্রামে জমাজমি কিংবা সম্পদের মানদণ্ডে যারা ছিলেন সচ্ছল উচ্চবিত্ত; যাদের বাড়িতে থাকত বছরচুক্তি কামলা; কালের বিবর্তনে তাদের অনেকেই আজ জমাজমি হারিয়ে সর্বস্বান্ত। কিন্তু পারিবারিক আভিজাত্যের স্মৃতিকে ধরে রেখে তারা এখনও ধুঁকে ধুঁকে চলছে। এরা এখন নিঃস্বপ্রায়। কিন্তু মনে মনে এই নিঃস্বতাকে এরা মেনে নিতে পারে না। তাই তো পারে না একটা পারিবারিক বা কৃষি কার্ডের জন্য গ্রামের ওয়ার্ড মেম্বারের কাছে গিয়ে ধরনা দিতে। এরা না পারে গার্মেন্টস কারখানায় কাজ করতে; না পারে রিকশা নিয়ে রাস্তায় নামতে। সন্তানদের এরা লেখাপড়া করাতে চায়, কিন্তু সামর্থ্য নেই। সেই সঙ্গে আছে অসুখ-বিসুখ। রাতের আঁধারে মুখ ঢেকে এরা মহাজনি সুদে ধার করার জন্য তাদের কাছেই যায়, যারা একসময় তাদের বাড়িতেই দিনমজুর হিসেবে কাজ করেছে। এরা নিজেদের নিম্নবিত্ত বা বিত্তহীন বলতে চান না; পরিচয় দেন মধ্যবিত্ত হিসেবে। বলা চলে, এরা ‘সিউডো মিডল ক্লাস’ বা মেকি মধ্যবিত্ত। অন্য শ্রেণিটি গত কয়েক দশকে নিম্নবিত্ত শ্রেণি থেকে নিজেদের মধ্যবিত্ত শ্রেণিতে উত্তরণ ঘটিয়েছে। বলা বাহুল্য, আজকে মধ্যবিত্ত শ্রেণির যে সংকট; প্রজন্ম পরম্পরায় যারা মধ্যবিত্ত তাদের মাঝেই তা প্রকটতর।

গত কয়েক বছরে, বিশেষত করোনা মহামারির পর থেকে চাল-ডাল-তেল, সবজিসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম যেভাবে বেড়ে চলেছে, সে তুলনায় বাড়েনি মধ্যবিত্তের আয়।
পিপিআরসির পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রায় ৮০ শতাংশ পরিবার প্রয়োজন অনুযায়ী আয় করতে পারছে না। এক-তৃতীয়াংশ পরিবার সংসার চালাতে গিয়ে নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে ঋণের ওপর। খাদ্যের পেছনেই ব্যয় হচ্ছে মাসিক আয়ের ৫৫ শতাংশ। শিক্ষা, চিকিৎসা ও বাসা ভাড়ার মতো মৌলিক খাতেও ব্যয় বাড়ছে লাফিয়ে। এই অবস্থার অভিঘাত নির্মমভাবে আঘাত হানছে নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠীর ওপর। তবে অপেক্ষাকৃত বেশি অসহায়ত্বের শিকার হচ্ছে মধ্যবিত্ত শ্রেণি।
মধ্যবিত্তের যারা চাকরি বা ব্যবসার প্রয়োজনে শহরে বসবাস করেন, তাদের মাসিক আয়ের ৪০-৫০ শতাংশ শুধু বাসা ভাড়াতেই চলে যায়। আছে সন্তানের শিক্ষার কথাও। সন্তানের ভালো শিক্ষার জন্য মধ্যবিত্ত পরিবার যা করে, তা রীতিমতো আত্মত্যাগের গল্প। স্কুলের বেতন, প্রাইভেট টিউটর, কোচিং সেন্টার– এসবের খরচ প্রতিবছর বাড়ছেই। অনেক অভিভাবক সন্তানের ভালো শিক্ষা নিশ্চিত করার জন্য নিজ জীবনের সবকিছু ঢেলে দেন। কারণ তারা মনে করেন, এটাই একমাত্র পথ যার মাধ্যমে পরবর্তী প্রজন্ম আরও ভালো অবস্থানে যেতে পারবে। কিন্তু এই বিনিয়োগের প্রতিদান সবসময় নিশ্চিত হয় না। উচ্চশিক্ষা শেষ করেও চাকরির বাজারে প্রতিযোগিতা এত তীব্র যে, অনেক তরুণ-তরুণী উপযুক্ত কর্মসংস্থান পান না।
চিকিৎসা খরচ বৃদ্ধির কথা বলাই বাহুল্য। সঙ্গে রয়েছে সামাজিক মর্যাদার চাপ। বিয়ে, জন্মদিন, ঈদ বা অন্যান্য সামাজিক অনুষ্ঠানে ‘নির্দিষ্ট মান’ বজায় রাখতে হয়। নাহলে সমাজের চোখে ‘পিছিয়ে পড়া’ মনে হয়। এই সামাজিক প্রতিযোগিতাও অনেক সময় পারিবারিক বাজেটে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে। তাদের ঋণ করে হলেও সামাজিক মর্যাদা রক্ষার চেষ্টা দীর্ঘ মেয়াদে আর্থিক অস্থিতিশীলতা বাড়ায়। সব মিলিয়ে মধ্যবিত্তের এখন নাভিশ্বাস।
যুগে যুগে সময়ের প্রয়োজনে মধ্যবিত্তরাই আন্দোলন করে, সরকার বদলায়। কিন্তু নিজেদের ভাগ্যটা বদলাতেই শুধু ব্যর্থ। এই যে চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান ঘটে গেল, তাতেও সবচেয়ে বেশি অংশগ্রহণ ছিল মধ্যবিত্ত শ্রেণির। অথচ এই শ্রেণির মানুষই আজ সবচেয়ে অসহায়; বেশিই চাপে। তারা প্রতিদিন পিষ্ট হচ্ছে মূল্যস্ফীতি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের ব্যয়ভার, আবাসন সংকট এবং সামাজিক প্রত্যাশার চাপে। তাদের সমস্যাগুলো নিয়ে যদি নীতিনির্ধারকরা এখনই মনোযোগী না হন, তাহলে এই ‘নীরব সংকট’ ভবিষ্যতে আরও গভীরতর সামাজিক অস্থিরতার জন্ম দিতে পারে। বিদ্যুৎ কান্তির আত্মহনন সেই কথাটি স্মরণ করিয়ে দেয়।
মোশতাক আহমেদ: কলাম লেখক; সাবেক জাতিসংঘ কর্মকর্তা
- বিষয় :
- মোশতাক আহমেদ