ঢাকা শুক্রবার, ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

চারদিক

বজ্রপাতে জীবনঝুঁকি

বজ্রপাতে জীবনঝুঁকি
×

মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম

প্রকাশ: ১০ আগস্ট ২০২৬ | ১১:০২ | আপডেট: ১০ আগস্ট ২০২৬ | ১৬:৫৯

বাংলাদেশ বজ্রপাতের অন্যতম হটস্পট হওয়ায় ইতোমধ্যে সরকারিভাবে এটি দুর্যোগ হিসেবে ঘোষিত হয়েছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বছরে ৮০-১২০ দিন বজ্রপাত হয় এবং বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চল ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলোতে বজ্রপাতে মৃত্যুহার সর্বাধিক। বাংলাদেশে সাধারণত এপ্রিল থেকে জুলাই পর্যন্ত বজ্রপাতের প্রকোপ বেশি থাকে। এ বজ্রপাতের মূল কারণ ভৌগোলিক অবস্থান। বাংলাদেশের এক পাশে বঙ্গোপসাগর ও ভারত মহাসাগর, অন্যদিকে কিছু দূরেই রয়েছে পাহাড়ি এলাকা ও হিমালয়।

দুঃখের বিষয়, আমাদের দেশে বেশি বজ্রপাতের শিকার হয় দরিদ্র কৃষক, যারা নিজেদের পরিবার এবং আমাদের মুখে অন্ন তুলে দেওয়ার জন্য জীবনের ঝুঁকি নিয়ে প্রতিকূল আবহাওয়ায় ফসলের মাঠে কাজ করতে যান। মজার বিষয়, বজ্রপাত শুধু অপকার করে এমন নয়। জমিতে নাইট্রোজেন সমতা এনে মাটির উর্বরতা বৃদ্ধি করে এবং কৃষি, বনায়ন ও প্রাকৃতিক ইকোসিস্টেমের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

সচেতনতাই প্রাণহানি কমানোর প্রধান উপায়। তাই কিছু বিষয় প্রচারে বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়া উচিত। যেমন বজ্রপাত শুরু হলে সঙ্গে সঙ্গে নিরাপদ পাকা ভবনে আশ্রয় নেওয়া। খোলা মাঠ, জলাশয়, উঁচু গাছ, বৈদ্যুতিক খুঁটি ও ধাতব বস্তু থেকে দূরে থাকা। কৃষকদের আবহাওয়ার পূর্বাভাস দেখে মাঠে কাজের পরিকল্পনা করা। বজ্রপাতের সময় মাছ ধরা, নৌকা চালানো বা মোবাইল চার্জে লাগিয়ে ব্যবহার এড়ানো। 

সচেতনতা বাড়াতে বজ্রপাতপ্রবণ জেলাগুলোতে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে প্রাক-বর্ষা থেকে বর্ষা মৌসুমের শেষ পর্যন্ত জুমার নামাজের খুতবার পাশাপাশি বজ্রপাত থেকে রক্ষা পেতে করণীয় বিষয় তুলে ধরে সচেতন করা প্রয়োজন। ইমাম প্রশিক্ষণ ও ধর্মীয় সমাবেশের মাধ্যমে বজ্রপাতের বৈজ্ঞানিক কারণ, সতর্কতামূলক আচরণ এবং মানুষের জীবন রক্ষায় ইসলামী নির্দেশনামূলক বার্তা পৌঁছানো প্রয়োজন। একইভাবে মন্দির, গির্জা এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।

তা ছাড়া বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির আওতায় খাসজমির উপযোগী জায়গাগুলোতে গুরুত্ব আরোপের মাধ্যমে তালগাছ ও সুপারি গাছ রোপণের ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। উল্লেখ্য, তালগাছের চেয়ে সুপারি গাছ অনেক বেশি বর্ধনশীল। এসব গাছ অনেক ক্ষেত্রে বজ্রপাতের আঘাত নিজের দিকে নিতে পারে। পাশাপাশি পরিবেশ সংরক্ষণ, জীববৈচিত্র্য বৃদ্ধি ও জলবায়ু সহনশীলতা তৈরিতেও তালগাছ ও সুপারি গাছ অবদান রাখে। তবে এগুলো বজ্রপাত সম্পূর্ণ প্রতিরোধ করতে পারে না। এর পরও জমির ফাঁকা জায়গাগুলোতে বেশি বেশি এ ধরনের বৃক্ষ রোপণে জনগণকে উদ্বুদ্ধ করা প্রয়োজন।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের মাধ্যমে আগেভাগেই বজ্রপাতের আশঙ্কাজনক স্থানগুলোয় মোবাইল ফোন ব্যবহারকারীদের মেসেজের মাধ্যমে জানিয়ে দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। ভবিষ্যতে আরও উন্নত লোকেশনভিত্তিক আগাম সতর্কবার্তা, মোবাইল এসএমএস, কৃষকদের জন্য বিশেষ সতর্কতামূলক এবং বজ্রপাতের রিয়েল টাইম পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন। এ ছাড়া বিজ্ঞানসম্মতভাবে সতর্কবার্তা ও ডায়াগ্রাম এঁকে প্রাথমিক শিক্ষার পাঠ্যবইয়ে এ বিষয়ে বিস্তারিত অধ্যায় রাখা যেতে পারে।

সরকার সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে বজ্রপাতে করণীয় বিষয়ে লিফলেট বিতরণ করে থাকে। মাঠ, হাওর-বাঁওড়ের ফাঁকা কৃষিকাজের এলাকায় আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে গ্রামীণ অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ, কাবিটা ও উপজেলা পরিষদ উন্নয়ন তহবিল থেকে বিভিন্ন এনজিওর কর্মসূচির মাধ্যমে বজ্রনিরোধক শেড নির্মাণের সংখ্যা বহু গুণ করা যেতে পারে।

জেলা তথ্য অফিস উঠান বৈঠক, আলোচনা সভা, মাইকিং, সড়কে প্রচার, পোস্টার, লিফলেট, প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন ও সামাজিক মাধ্যমে সচেতনতামূলক বার্তা প্রচার করে থাকে, যা আরও বেশি দৃশ্যমান হওয়া জরুরি। এ ক্ষেত্রে জেলা ও উপজেলা প্রশাসন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।

বজ্রপাত নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। তবে  বিজ্ঞানভিত্তিক পূর্বাভাস, সমন্বিত সরকারি উদ্যোগ এবং জনসচেতনতার মাধ্যমে অধিকাংশ প্রাণনাশই এড়ানো সম্ভব।

মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম: জেলা প্রশাসক, নওগাঁ

আরও পড়ুন

×