অধিকার
স্মৃতি কিসকুর মায়েরা যে কারণে গ্রাম ছাড়েন
পাভেল পার্থ
পাভেল পার্থ
প্রকাশ: ১১ আগস্ট ২০২৬ | ০৭:১৮
| প্রিন্ট সংস্করণ
এক অসাধারণ ঘটনা ঘটেছে। ফুটবলার স্মৃতি কিসকুর মা মাতিমাই হেমরনকে খুঁজে পেয়েছে সরকার। যদিও এর আগে কোনো দিন মাতিমাইদের খোঁজার দায় বোধ করেনি রাষ্ট্র। কিন্তু এখন করতে হয়েছে। মা ও মেয়েকে একত্র করতে রাষ্ট্রকে তিন মাস ধরে হন্যে হতে হয়েছে। কারণ রংপুরের এক গরিব সাঁওতাল পরিবারের এই মেয়েটি ২০২৫-২৬ মৌসুমের নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস প্রতিযোগিতায় ফুটবলে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। আট গোল করে সর্বোচ্চ গোলদাতাও হয়েছে। এই দেশসেরা ফুটবলারের মা কি নিখোঁজ হয়ে থাকবে?
প্রতিযোগিতায় রংপুর অঞ্চলকে জেতানোর পর বাড়ি ফিরে স্মৃতি মাকে পায়নি। জানতে পারে, কাজের খোঁজে মা গেছেন ঢাকায়। মায়ের কাছে ছিল না মোবাইল ফোন। ছিল না কোনো যোগাযোগের ঠিকানা বা নম্বর। তবে এটা অস্বাভাবিক ছিল না। দেশের প্রায় ১৬ লাখ আদিবাসী পরিবারে এটাই ঘটে। অনুশীলনের জন্য স্মৃতিকেও ঢাকায় চলে আসতে হয়। তিন মাস ধরে আর যোগাযোগ হয় না মায়ের সঙ্গে। মা ও মেয়ে কেউ জানতে পারেন না– কে কোথায়। বাধ্য হয়ে দেশবাসীর কাছে মায়ের খোঁজ চায় এই দেশসেরা ফুটবলার। তৎপর হয় ক্রীড়া মন্ত্রণালয়। গাজীপুরের ১৭ নম্বর ওয়ার্ডের মোগরখালের মতো এক ঘিঞ্জি এলাকায় খুঁজে পাওয়া যায় মাতিমাইকে। স্থানীয় এক পোশাক কারখানায় প্রশিক্ষণের কাজ পেয়েছিলেন তিনি। ক্রীড়া মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তিন মাস ধরে মায়ের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেনি স্মৃতি। কিন্তু মাতিমাইকে খুঁজে পাওয়ার এই আশাজাগানিয়া সংবাদ পরিবেশনে গণমাধ্যম অসংবেদনশীল ভাষা ব্যবহার করেছে। অনেকে লিখেছে, ‘তাঁকে উদ্ধার করে ঢাকায় নেওয়া হচ্ছে’। এই ঘটনা প্রমাণ করেছে– রাষ্ট্র মাতিমাইদের খবর রাখে না। একই সঙ্গে প্রমাণ হয়েছে– রাষ্ট্র চাইলেই মাতিমাইদের নাগাল পেতে পারে।
মাতিমাইকে খুঁজে বের করার ঘটনা হয়তো ফুটবলার স্মৃতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু কেন তাঁকে খুঁজে বের করতে হলো, এ বিষয়ে সরকারের বার্তাটি তার চেয়ে বেশি গুরুত্ববহ। এ ঘটনায় যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব গণমাধ্যমে জানান, স্মৃতি কিসকুর ফুটবল প্রতিভা বিকাশে পারিবারিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। সেই বিবেচনাতেই সরকারের নির্দেশনায় তার মাকে ঢাকায় আনা হয়েছে এবং পরিবারটির জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তা বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
রাষ্ট্র সন্তানের মেধা বিকাশে পরিবারের সান্নিধ্যের জরুরত বুঝতে পারছে। এই প্রবণতা ধরে রাখা দরকার এবং কেবল স্মৃতি কিসকুর ক্ষেত্রে নয়, দেশের সর্বত্র এই নির্দেশনার বিস্তার ঘটানো জরুরি।
মাতিমাইদের গ্রাম ছাড়তে হয়। এটা কোনো নতুন ও বাস্তবতা নয়। বাবা সোবহান হাসঁদার মৃত্যুর পর পরিবারের দায়িত্ব আসে মাতিমাইয়ের ওপর। পরিবারের অভাব দূর করতে মানুষের বাড়িতে গৃহকর্মীর কাজ করতেন তিনি। অন্যের জমিতে মৌসুমি শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন। এমন বাস্তবতা দেশের প্রায় সকল আদিবাসী জীবনেই বহমান। বিশেষ করে মাতিমাইদের মতো সমতলের আদিবাসী, যারা কার্যত ভূমিহীন। দেখা যায় আসমুদ্রহিমাচলসম দারিদ্র্য, কাঠামোগত বৈষম্য আর বাঙালি জুলুম সামাল দিয়েই আদিবাসী পরিবারে একেকজন স্মৃতি কিসকু ঘাড় সোজা করে দাঁড়ায়। আর এই তুমুল দাঁড়ানোর পেছনে থাকে মাতিমাইদের রক্ত জল করা নিদারুণ ঘামের দাগ। আমরা শুধু স্মৃতি কিসকুদের দুরন্ত ক্রীড়ানৈপুণ্য দেখি মাঠের ভেতর। জানতে চাই না এই নৈপুণ্যের জন্য আরেক কোনো মাঠঘাটে লড়ছে তাদের মাতিমাইয়েরা।
শৈশবে পরিবার ও পাড়াতেই ফুটবলে হাতেখড়ি স্মৃতি কিসকুর। তারপর রংপুর একাডেমিতে শিখেছে। স্মৃতিদের দেশসেরা ফুটবলার হওয়ার পেছনে কেবল পরিবার ও গ্রাম নয়; বহু বাঙালির ভূমিকা আছে। যারা এলাকার কোনো ক্রীড়ামোদী মানুষ, শিক্ষক, উৎসাহী ব্যক্তি, এমনকি কোচ। স্মৃতি বারবার তার কোচ স্যারের কথা বলেছে। সাতক্ষীরার শ্যামনগর এবং গাজীপুরের কালিয়াকৈরে মুন্ডা ও বর্মণ আদিবাসী মেয়েদের জন্য স্থানীয় বহু বাঙালি উৎসাহী মানুষ নিজেরাই চাঁদা দিয়ে তাদের দল গঠন করে খেলাধুলার অনুশীলন করান। জাতিগত সংহতি এবং রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক রূপান্তরে এদের ভূমিকা ও অবদান অগ্রগণ্য।
জাতীয় স্বাস্থ্যনীতি, জাতীয় শিক্ষানীতিতে ‘আদিবাসী’ পরিচয়ের স্বীকৃতি থাকলেও এই পরিচয় রাষ্ট্র ব্যবহার করে না। কেন করে না– এর কোনো ব্যাখ্যাও নেই। বলা হয়, এই শব্দ সংবিধানে নেই। কিন্তু সংবিধানে ‘ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী’ শব্দটিও নেই। এর পরও রাষ্ট্রের একটি আইন, সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ও প্রকল্পগুলো এই নামটিই ব্যবহার করে। বরং ‘ক্ষুদ্র সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান আইনে’ আদিবাসী শব্দের স্বীকৃতি আছে। দেশসেরা এই ফুটবলাররা তাদের জাতিগত আত্মপরিচয়ের স্বীকৃতি চায়। ‘ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী’র মতো একটি ঔপনিবেশিক ও বর্ণবাদী পরিচয়ে তারা বড় হতে চায় না। রাষ্ট্র স্মৃতি কিসকুর মা নিখোঁজের যন্ত্রণাকে বুঝতে পেরেছে। আশা করি, আত্মপরিচয়ের যন্ত্রণাকেও রাষ্ট্র বুকের দরদ দিয়ে বুঝবে।
গ্রামে কেন মানুষের কাজ নেই– এই প্রশ্ন রাষ্ট্রের মৌলিক জিজ্ঞাসা হওয়া জরুরি। কেবল মাতিমাই নয়; দেশজুড়ে মানুষকে জীবিকার তাগিদে গ্রাম ছাড়তে হচ্ছে। কাঠামোগত বৈষম্য আর উৎপাদন সম্পর্কের পরিবর্তনশীলতার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জলবায়ু সংকট। গ্রাম ছেড়ে শহরে আসার পর তাদের কর্মক্ষেত্র নিরাপদ হচ্ছে না। হয় রানা প্লাজা ধসে পড়ছে বা ফরিদপুরের চরভদ্রাসনের দীপালির মতো লেবাননে গিয়ে ইসরায়েলের বোমা হামলায় মরতে হচ্ছে বা মাতিমাইয়ের মতো মেয়ে থেকেও নিখোঁজ হয়ে থাকতে হচ্ছে।
গ্রামে যত বেশি নিরাপদ ও বৈষম্যহীন কর্মক্ষেত্র তৈরি হবে; পরিবেশ ও প্রকৃতি সুরক্ষিত হবে; নাগরিক সেবায় সকলের প্রবেশাধিকার নিশ্চিত হবে; পর্যাপ্ত খেলার মাঠ ও পাবলিক পরিসর উন্মুক্ত থাকবে, তত বেশি আমাদের গ্রামে গ্রামে স্মৃতি কিসকুদের জন্ম হবে। এটাই সত্যিকারের রাষ্ট্রীয় সংস্কারের প্রবণতা।
পাভেল পার্থ: লেখক ও গবেষক
- বিষয় :
- পাভেল পার্থ