উচ্চারণের বিপরীতে
জুলাই ‘সবার’ হলে এত রাজনীতিকরণ কেন
মাহবুব আজীজ
মাহবুব আজীজ
প্রকাশ: ১১ আগস্ট ২০২৬ | ০৭:২৫ | আপডেট: ১১ আগস্ট ২০২৬ | ০৭:২৬
| প্রিন্ট সংস্করণ
জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান গত বুধবার ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে ‘দ্রোহের জুলাই’ অনুষ্ঠানে বলেছেন, ‘এই জুলাই আমাদের সকলের যদি হয়, তাহলে জুলাইকে আমরা কেন রাজনীতিকরণ করব’ (প্রথম আলো, ৬ আগস্ট, ২৬)।
যথার্থ প্রশ্ন– চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান ডান-বাম-মধ্য রাজনৈতিক দলগুলোর আদর্শিক বিভাজন মুছে মেরুপ্রতিম দূরত্বের সকলকে এক মোহনায় মিলিয়ে দিয়েছিল। চব্বিশের জুলাই-আগস্ট মাসে আন্দোলনকারীর শ্রেণি, লিঙ্গ, পেশা, নৃতত্ত্ব, ধর্মের কোনো প্রশ্ন কোথাও উচ্চারিত হয়নি। ‘গাছের একটি পাতাও ছেঁড়া যাবে না’ গ্রাফিতিতে উৎকর্ণ রাজপথে ছিল মুক্তিযুদ্ধের জাগরণের গানের মিছিল। ছিল মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের আগুনঝরা স্লোগান– ‘বঙ্গবন্ধুর বাংলায় বৈষম্যের ঠাঁই নাই’।
এই স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলন যেভাবে গ্রাফিতি, স্লোগান, সংগীতে মুখর হয়ে উঠেছিল; নারীর বিপুল অংশগ্রহণে সর্বপ্লাবী হয়ে উঠেছিল, তা অতুলনীয়। রিকশাচালক থেকে গার্মেন্টকর্মী, দিনমজুর থেকে মুটে-কুলি সকলে সার বেঁধে দাঁড়িয়ে গিয়েছিল প্রতিরোধে। বৈষম্যহীনতার স্মারক এই গণঅভ্যুত্থান ৫ আগস্টের পরপরই নানা কূট-রাজনীতিতে ছিন্নবিচ্ছিন্ন হতে শুরু করে।
অন্তর্বর্তী সরকারের একাংশের পৃষ্ঠপোষতকতা ও সর্বাংশের দুর্বলতায় সমাজে উগ্রবাদী শক্তি মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। মব সন্ত্রাস হয়ে ওঠে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতীকী পরিচয়। নীতিনির্ধারণী ক্ষেত্র থেকে সংস্কার কমিশন– কোথাও নারীর ভূমিকা স্বীকৃত হয় না। বরং নারী সংস্কার কমিশনের নেতৃবৃন্দের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে অশালীন বক্তব্য দেওয়া হয়। সরকার এর প্রতিবাদের বদলে নারী সংস্কার কমিশনের কথাই ভুলে যায়। গণমাধ্যম কমিশন, দুদক, পুলিশ, জনপ্রশাসনসহ অন্য কোনো কমিশনের রিপোর্ট নিয়েও পরিস্থিতি তথৈবচ।
অন্তর্বর্তী সরকারের অদক্ষতা কিংবা অনাগ্রহে গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে দেশের গণতান্ত্রিক রূপান্তরের বড় সম্ভাবনার জায়গাগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সমাজের প্রগতিশীল অংশের চিন্তাচর্চাকে অস্বীকার করে উগ্রপন্থার সঙ্গে গাঁটছড়া বাঁধে অন্তর্বর্তী সরকার। যে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশের অভ্যুদয়; গণঅভ্যুত্থানের পরপর সেই মুক্তিযুদ্ধকে অনবরত বিতর্কিত করা হতে থাকে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ মুক্তিযুদ্ধের প্রধান নেতৃবৃন্দকে নিয়ে অশ্রদ্ধা, কটূক্তির সংঘবদ্ধ অপপ্রয়াস শুরু হয়। গণঅভ্যুত্থানের পাঁচ মাস পর এসে অন্তর্বর্তী সরকারের কয়েকজন উপদেষ্টার উস্কানিতে ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের ঐতিহাসিক বাড়ি তিন দিন ধরে বুলডোজার দিয়ে ভাঙা হতে থাকে। সব মিলিয়ে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী পক্ষ গায়ের জোর দেখাতে থাকে, যা কোনোভাবেই চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষার পরিপূরক নয়।
২.
জনগণের ভোটের অধিকার জনগণের হাতে ফিরিয়ে আনাই ছিল জুলাই আন্দোলনের প্রধানতম আকাঙ্ক্ষা। সেই লক্ষ্যে ৯ মাস ধরে ৩০টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে আলোচনার মধ্য দিয়ে রচিত হয় ‘জুলাই জাতীয় সনদ’। ৩০টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে সর্বজন-গ্রহণযোগ্য সর্বশেষ চারটি নির্বাচনে কমবেশি ৪০ শতাংশ ভোট পাওয়া আওয়ামী লীগ ছিল না। সর্বজন- গ্রহণযোগ্য সর্বশেষ চারটি নির্বাচনে সংসদের তৃতীয় বৃহত্তম দল জাতীয় পার্টিকে শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে অংশ নিতে দিলেও আলোচনায় ডাকা হয়নি। ১৪ দলীয় জোটের শরিক দলগুলোকেও ‘ফ্যাসিবাদের দোসর’ আখ্যা দিয়ে আলোচনা ও নির্বাচনে বাতিল করা হয় আনুষ্ঠানিক ঘোষণা ছাড়াই। কোন আইনের বলে এটা করা হয়– এর ব্যাখ্যা নেই।
সত্য যে, চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নিপীড়নের বিরুদ্ধে মানুষ রাজপথে রুখে দাঁড়িয়েছিল। এটাও সত্য যে, সেই মানুষের হাতেই ক্ষমতা ছিল ভোটের মাধ্যমে আওয়ামী লীগকে লাল কার্ড দেখিয়ে রাজনীতি থেকে বিদায় করে দেওয়ার। আবার যারা বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মী হত্যা-খুনের সঙ্গে জড়িত নন, তাদের রাজনৈতিক অধিকার কেড়ে নেওয়ার যুক্তি কী? বিপুল একটি রাজনৈতিক শক্তিকে নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণার পাশাপাশি বিনা বিচারে অগণিত নেতাকর্মীকে কারাগারে দীর্ঘ দুই বছরের বেশি সময় আটকে রাখাও চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষার মুক্ত গণতান্ত্রিক সমাজ গড়বার অন্তরায়। রাষ্ট্রের সব নাগরিকের অধিকার সমান। ভিন্ন মতাবলম্বনের জন্য কাউকে বিনা বিচারে কারাগারে আটক রাখা গণতন্ত্রের জন্য উপহাস বটে। দোষীদের বিচার অবশ্যই হতে হবে; কিন্তু স্বচ্ছ বিচার করা সরকারের কর্তব্য।

৩.
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দুই বছর পূর্তি উপলক্ষে গত বুধবার আয়োজিত রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে প্রদর্শিত তথ্যচিত্র নিয়ে বিতর্ক ও হট্টগোল হয়েছে। তথ্যচিত্রটি শেষ হওয়ার পরপরই দর্শক সারি থেকে ‘ভুয়া, ভুয়া’ স্লোগান ওঠে। অনুষ্ঠানে উপস্থিত রাষ্ট্রপতি এ ঘটনায় মর্মাহত হন; অভ্যাগত কূটনীতিক সকলেই বের হয়ে যান। মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে জুলাইয়ের কৃতিত্ব নিয়ে এই কাদা ছোড়াছুড়ি অনেক প্রশ্ন সামনে নিয়ে আসে। ইতিহাস কি জোর করে গুরুত্বপূর্ণ করে তোলা যায় বা সম্ভব? এই কাজটিই করে চলেছেন এক দল সুযোগসন্ধানী।
প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন গণভবনকে ‘জুলাই জাদুঘর’ হিসেবে উদ্বোধন করা হয়েছে। যদিও রাজধানীর প্রাণকেন্দ্রে এত সুবিশাল এলাকা নিয়ে জাদুঘর প্রতিষ্ঠার যৌক্তিকতা প্রশ্নবিদ্ধ থেকেই যাবে। গণভবন শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত বাসভবন ছিল না; প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন। যেমন রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর সরকারি অফিসসহ আরও নানা কার্যালয়। এমনকি জাতীয় সংসদ ভবন। যেখানে ‘রাতের ভোটের সংসদ’ কার্যকর ছিল, আমি-ডামির সিলও পড়েছে। স্বৈরাচারের প্রতীক বলতে শুধু গণভবনকে সামনে আনার যুক্তি কী? লক্ষণীয়, মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আমাদের দেশে সরকারি আয়োজনে জাদুঘর নেই। রয়েছে ব্যক্তি উদ্যোগে ট্রাস্টের জাদুঘর, তিলে তিলে গড়া। মূল জাতীয় জাদুঘরের একটি অংশেই জুলাই জাদুঘর তৈরি সম্ভব ছিল।
অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কৃতি উপদেষ্টা জানিয়েছেন, জুলাই জাদুঘরে ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সালের ‘আওয়ামী ফ্যাসিবাদী’ শাসনের চিহ্ন রয়েছে। এই ‘উপদলগত’ চেষ্টাই আসলে চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানকে রাজনীতিকরণ করে ফেলেছে!
আমরা যেন ভুলে না যাই– পাক-ভারত উপমহাদেশে প্রতিটি দেশেই রাষ্ট্রপ্রধান বা সরকারপ্রধান খুনের শিকার হয়েছেন। এদের মধ্যে কেবল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকেই তাঁর ১০ বছরের শিশুপুত্র, স্ত্রী, আরও দুই পুত্রসহ মোট ২২ জনকে এক রাতে হত্যা করা হয়। কেন এই নির্মমতা? মুক্তিযুদ্ধের নেতৃবৃন্দের প্রতি কাদের এত ক্ষোভ? ব্যাপকভাবে সমালোচিত ‘বাকশাল’ গঠন করা হয় ১৯৭৫ সালের ৬ জুন; বঙ্গবন্ধু নিহত হন ওই বছরের ১৫ আগস্ট। মাত্র দুই মাস ৯ দিনের মধ্যে তিনি বাকশালের মাধ্যমে সারাদেশে মানুষ মেরে ফেললেন? সেই মানুষ, যাদের জন্য তিনি নিজের জীবনের এক-তৃতীয়াংশ কারাগারেই কাটিয়েছেন!
ইতিহাসের খণ্ডিতকরণ অথবা উদ্দেশ্যমূলক বয়ান কোনোভাবেই রাষ্ট্রীয় জাদুঘরের অংশ হতে পারে না। সাতচল্লিশের দেশভাগের কথা আজকাল ফলাও করে অনেকে বলছেন। কিন্তু বলছেন না চল্লিশের লাহোর প্রস্তাবের কথা। যে প্রস্তাবে সুস্পষ্টভাবে বলা ছিল, পাকিস্তানের দুই অংশ সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমান, দুটি পৃথক স্বাধীন রাষ্ট্র হবে। পশ্চিম পাকিস্তান সেটি মানেনি, পূর্ব পাকিস্তানকে তারা উপনিবেশ বানিয়ে নিয়েছিল।
বীরের অযুত রক্তস্রোত, মাতার বিপন্ন অশ্রুধারা– এ দেশের মানুষ বীরত্বের সঙ্গে জীবন দিয়েছে দেশের জন্য, গণতন্ত্রের জন্য। কিন্তু সুযোগ পেলেই যারা গায়ের জোরে নিজেদের গোষ্ঠীতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে চায়, তারা নিজেদের মতো ইতিহাস লিখে নেওয়ার চেষ্টা করে। তারই নিদর্শন জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর আমরা দেখতে পাই। তবে ইতিহাস বলে, সময়ের কষ্টিপাথরে সত্যই টিকে থাকে কেবল। মিথ্যা কয়েকদিন চিৎকার করে বটে, তবে তা হাওয়ায় মিলায়।
মাহবুব আজীজ: উপসম্পাদক, সমকাল; সাহিত্যিক
[email protected]
- বিষয় :
- মাহবুব আজীজ