সমকালীন প্রসঙ্গ
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনেও জারি থাকুক সংস্কারের আলোচনা
হাসান মামুন
হাসান মামুন
প্রকাশ: ১২ আগস্ট ২০২৬ | ০৭:৩২ | আপডেট: ১২ আগস্ট ২০২৬ | ১০:০৬
| প্রিন্ট সংস্করণ
নতুন রাষ্ট্রপতি পেতে বেশি দিন অপেক্ষা করতে হবে না। এর মধ্যে পূর্ণ হচ্ছে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারের ছয় মাস। মন্ত্রিসভায় কিছু রদবদল হবে বলেও শোনা যাচ্ছে। ২০ আগস্ট রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে সংসদ সদস্যদের ভোট দেওয়ার কথা। একাধিক প্রার্থী না থাকলে অবশ্য এর প্রয়োজন হবে না। ইতোমধ্যে বিরোধী দল থেকে প্রার্থী দেওয়ায় ভোট এবার হচ্ছে বোধ হয়। তবে সবাই অপেক্ষায়– প্রধানমন্ত্রী কাকে মনোনয়ন দেন। বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটি তাঁর ওপরেই দায়িত্ব অর্পণ করেছে। এমনটাই হয়ে আসছে বহু দশক যাবৎ।
ভোটের অঙ্কে ব্যাপকভাবে এগিয়ে থাকায় ক্ষমতাসীন বিএনপি থেকে মনোনীত ব্যক্তিই হবেন রাষ্ট্রপতি। এটা সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদ, যদিও চলমান ব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতি মূলত ‘আলংকারিক’। প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান বিচারপতি নিয়োগ ছাড়া আর কোনো ক্ষেত্রে এককভাবে ভূমিকা রাখার সুযোগ তাঁর নেই। জাতীয় সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন লাভকারী দলের নেতাকে তিনি প্রধানমন্ত্রীর পদ গ্রহণ করতে বলেন। এ ক্ষেত্রে ভিন্ন কিছু করার সুযোগও নেই তাঁর পক্ষে। কার্যত প্রধান বিচারপতি পদেও তিনি নিয়োগ দিয়ে থাকেন প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শে। তবে এমন পরিস্থিতিতেও সীমিত ক্ষমতার মধ্যে কোনো কোনো রাষ্ট্রপতি স্বতন্ত্র অবস্থান প্রকাশ করতে চেয়েছিলেন। তাতে অভিজ্ঞতা সুখকর হয়নি। রাষ্ট্রপতি বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে ক্ষমতাসীনরা সেটা মনে রাখবেন– এটা ধরেই নেওয়া যায়।
সংকটকালে, বিশেষত রাজনৈতিক সরকারের অনুপস্থিতিতে রাষ্ট্রপতির ভূমিকা বেড়ে যেতেও দেখা যায়। এক-এগারোর সময় এবং নিকট অতীতে দুই পরস্পরবিরোধী দলের দুজন রাষ্ট্রপতিকে জটিল থেকে জটিলতর পরিস্থিতি সামলে মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার আগেই বিদায় নিতে হয়েছে। আশা করা যায়, তেমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে না। তবে জাতীয় নির্বাচনকালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা থাকলে রাষ্ট্রপতির ভূমিকা আবারও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠার সম্ভাবনা রয়েছে। সর্বোচ্চ আদালতে নিষ্পত্তির পর সংসদে এ বিষয়ে বিল আনা হবে। তাতে রাষ্ট্রপতির কী ভূমিকা রাখা হয়, সেটা দেখতে হবে। চলমান ব্যবস্থা সংসদীয় হলেও ওই সময়ে এটি এক ধরনের রাষ্ট্রপতি শাসিত ব্যবস্থা হয়ে পড়ে বলে মত রয়েছে। এ কারণেও রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়ন দেওয়ার কাজটি অসতর্কভাবে সম্পাদনের সুযোগ আর নেই।
২০ আগস্ট যিনি রাষ্ট্রপতি হবেন; মাঝে ভিন্ন কিছু না ঘটলে তিনিই এ পদে থাকবেন পরবর্তী জাতীয় নির্বাচনের সময়। নির্বাচন আয়োজন ও অনুষ্ঠানে পরবর্তী তত্ত্বাবধায়ক সরকার আর নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা মুখ্য হলেও এর অভিভাবকত্ব করতে হবে রাষ্ট্রপতিকেই। দলীয়ভাবে মনোনীত হলেও জাতি আশা করে থাকবে, তিনি তখন দলনিরপেক্ষ ভূমিকা রাখবেন। ক্ষমতার শান্তিপূর্ণ হস্তান্তর প্রক্রিয়াটি এখানে টেকসই হচ্ছে না– এটা মর্মান্তিক বাস্তবতা। এটা অতিক্রম করে যেতে হবে। গণতন্ত্রকে সফল করতে আরও কিছু উপাদান প্রয়োজন। তবে নির্বাচন বিতর্কমুক্ত হওয়া এ ক্ষেত্রে ন্যূনতম শর্ত। নতুন রাষ্ট্রপতি দায়িত্ব গ্রহণের পর স্থানীয় সরকার নির্বাচন হবে ধাপে ধাপে। সেটা সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার দায়িত্ব অবশ্য দলীয় সরকারের। রাষ্ট্রপতির এখানে কিছু করার থাকবে না। স্থানীয় নির্বাচন সুষ্ঠু না হলে আর এতে তিনি নৈতিকভাবে বিব্রত হলেও সেটা প্রকাশ্যে বলতে পারবেন না।
গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে আসা জুলাই সনদে অবশ্য রাষ্ট্রপতিকে নতুন কিছু দায়িত্ব দিয়ে শাসন ক্ষমতায় ‘ভারসাম্য’ আনার প্রস্তাব করা হয়েছে। ১৯৯১ সালে ফিরে আসা সংসদীয় ব্যবস্থায় প্রধানমন্ত্রীকে একচ্ছত্র ক্ষমতার অধিকারী করা হয়েছে– সে বিষয়ে প্রায় সবাই একমত। ‘প্রধানমন্ত্রীর একনায়কতন্ত্র’ প্রতিষ্ঠার সুযোগ যে সংবিধানেই রয়েছে, সেটা ইতোমধ্যে আলোচিত। বিএনপিও অনেক আগে ঘোষিত রাষ্ট্র মেরামতের ৩১ দফায় রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। এ ক্ষেত্রে নতুন কী করা যেতে পারে, তা স্পষ্টভাবেই রয়েছে জুলাই সনদে। বিএনপি অবশ্য বলছে, জুলাই সনদ, ৩১ দফা এবং নতুন পরিস্থিতিতে অংশীজনদের পরামর্শ নিয়েই এসব ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনা হবে। হালে এ লক্ষ্যে সংসদীয় কমিটি গঠিত হয়েছে, তাতে অবশ্য বিরোধী দল যোগ দেয়নি। তবে সরকারপক্ষ বলছে, তাদের মতামত চাওয়া হবে।

এসব ঘটার আগেই হয়ে যাচ্ছে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন। জুলাই সনদে বলা হয়েছিল, সংসদ হবে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট এবং উভয় কক্ষের সদস্যরাই ‘গোপন ব্যালটে’ অংশ নেবেন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে। কিন্তু সংসদ এখনও আগের মতো এককক্ষবিশিষ্ট। এর সদস্যরাই অংশ নেবেন নির্বাচনে। ভোট হবে প্রকাশ্য ব্যালটে। এর সঙ্গে অধিবেশনে হাত তুলে ভোটদানের তেমন পার্থক্য নেই। এমন প্রস্তাবও একসময় আলোচিত হয়েছিল, স্থানীয় সরকারের নির্বাচিত প্রতিনিধিরাও ভোট দেবেন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে। তাতে এই পদাধিকারীর জনপ্রতিনিধিত্বের ধারণাটি জোরদার হবে। এভাবে রাষ্ট্রপতি বেছে নিয়ে তাঁর হাতে কিছু নির্বাহী ক্ষমতা তুলে দেওয়া হলে সেটা মানানসই হবে বলে মনে করা হচ্ছিল। সেসব আপাতত হচ্ছে না। তবে কখনোই হবে না, এমন মনে করার কারণ নেই। রাষ্ট্র সংস্কারের এসব আলাপ অন্তত জারি রাখা প্রয়োজন।
সংস্কারের নামে অস্থিতিশীলতা তৈরির ঝুঁকি বিষয়ে অবশ্য সতর্ক থাকতে হবে। সংসদীয় ব্যবস্থায় প্রধানমন্ত্রীর একচ্ছত্র ক্ষমতাচর্চার সমস্যা সামলাতে গিয়ে সরকার পরিচালনায় সংকট তৈরির ঝুঁকি নেওয়া যাবে না। জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত দলের নেতা হলেন প্রধানমন্ত্রী। সংসদের কাছে তাঁর জবাবদিহি নিশ্চিতের পাশাপাশি ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকতেই হবে প্রধানমন্ত্রীকে। তবে ইতোমধ্যে একাধিক প্রধানমন্ত্রীর যথেচ্ছ ক্ষমতাচর্চার কারণে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর যে ক্ষয় হয়েছে, সেখান থেকে উত্তরণেরও বিকল্প নেই। এর সঙ্গে সুশাসন মজবুত ও গণতন্ত্রকে সফল করার প্রশ্ন গভীরভাবে জড়িত। এ ধারায় জাতীয় স্বার্থও সুরক্ষিত হতে হবে। সে কারণেই কিছু গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে সার্চ কমিটি, সংসদীয় কমিটি ও রাষ্ট্রপতির ভূমিকা যুক্ত করার প্রস্তাব আনা হয়েছে। দেশের মানুষও এগুলোকে ইতিবাচকভাবে নিয়েছে বলে ধারণা। এখন দেখা যাক, বাস্তবে কী হয়। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে এ ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর বিচার-বিবেচনাই বেশি গুরুত্ব পাবে।
রাজনীতির ময়দানে অবশ্য কে রাষ্ট্রপতি হতে যাচ্ছেন, সেটাই আলোচিত হচ্ছে বেশি। ক্ষমতাসীন দলের সক্রিয় সদস্যের বাইরের কেউ বিএনপির মনোনয়ন পাচ্ছেন কিনা, সেই আলোচনা ইতোমধ্যে থেমেছে। সেটি ঘটলেও সরকারের প্রতি তাঁর রাজনৈতিক আনুগত্যে ব্যত্যয় দেখা যাবে না। বিদ্যমান বিধিবিধানে তিনি চাইলেও সরকারের কাজে ‘বিঘ্ন’ ঘটাতে পারবেন না। সামান্য দৃষ্টিভঙ্গিগত পার্থক্যও এ ক্ষেত্রে কী পরিস্থিতির সৃষ্টি করতে পারে, তা অতীতে আমরা দেখেছি। এর আসলে প্রয়োজনও নেই। রাষ্ট্রপতিকে ‘ইমপিচ’ বা অভিশংসনের মতো পরিস্থিতি কখনও তৈরি না হোক, সেটাই চাইব আমরা। তাঁর সঙ্গে তাৎপর্যপূর্ণ কিছু ক্ষমতা ভাগাভাগি করে প্রধানমন্ত্রী এ পদকে অর্থবহ করে তুলবেন, এমন প্রত্যাশাও থাকবে। তাতে সুষ্ঠুভাবে সরকার পরিচালনার পথ সুগম হবে বলে ধারণা। কিছু ক্ষেত্রে প্রধান বিচারপতির পরামর্শমূলক ভূমিকাকে যুক্ত করেও প্রধানমন্ত্রী খানিকটা ভারমুক্ত হতে পারেন।
হাসান মামুন: সাংবাদিক, কলাম লেখক
- বিষয় :
- হাসান মামুন
- রাষ্ট্রপতি
- সংস্কার