ঢাকা শনিবার, ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

চারদিক

দুই চাকার গতি, প্রজন্মের ঝুঁকি

দুই চাকার গতি, প্রজন্মের ঝুঁকি
×

রাসেল আহমদ

প্রকাশ: ১৩ আগস্ট ২০২৬ | ০৭:২২

| প্রিন্ট সংস্করণ

রূপকথার দুষ্ট পরীর গল্পে মানুষ তার মোহে পড়ে বিপদের দিকে এগিয়ে যেত। বাস্তবে সেই পরী নেই, কিন্তু মোহ আছে। তার নতুন রূপের নাম গতি। সেই গতির সবচেয়ে সহজ বাহন হয়ে উঠেছে মোটরসাইকেল। কিশোর-তরুণদের কাছে এটি স্বাধীনতার প্রতীক; দ্রুত চলার সুযোগ; কখনওবা আত্মপ্রকাশের মাধ্যম। কিন্তু দায়িত্বহীন হাতে সেই স্বাধীনতাই মুহূর্তে পরিণত হতে পারে মৃত্যুফাঁদে।
দেশে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার সাম্প্রতিক চিত্র তাই আর উপেক্ষা করার মতো নয়। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সাল থেকে চলতি বছরের জুলাই পর্যন্ত দেশে ১৬ হাজার ৬৫টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ১৫ হাজার ৭১২ জন; আহত ১৪ হাজার ১৪৩ জন। আক্রান্তদের ৫৮ শতাংশের বয়স ১৩ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে। সংখ্যাগুলো শুধু দুর্ঘটনার হিসাব নয়। এগুলো আমাদের তরুণ প্রজন্মের একটি বিপজ্জনক ক্ষয়চিত্র।

১৫ হাজার ৭১২ জনের মৃত্যু মানে ১৫ হাজারের বেশি অসমাপ্ত জীবন। প্রতিটি মৃত্যুর সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটি পরিবার, কিছু স্বপ্ন, কয়েকজন অপেক্ষমাণ মানুষ। একজন তরুণের মৃত্যুতে শুধু একটি জীবন থেমে যায় না। থেমে যায় একটি পরিবারের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনারও বড় একটি অংশ। অথচ আমরা প্রতিদিন দুর্ঘটনার খবর পড়তে পড়তে এমন পর্যায়ে পৌঁছেছি, অনেক সময় একটি মৃত্যুও আর আমাদের থামিয়ে ভাবায় না। মৃত্যুর এই স্বাভাবিকীকরণই হয়তো সংকটের সবচেয়ে ভয়ংকর দিক।

মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার পেছনে অতিরিক্ত গতি ও চালকের নিয়ন্ত্রণ হারানোর বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।
সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী, ৩৪.২১ শতাংশ দুর্ঘটনার সঙ্গে চালকের নিয়ন্ত্রণ হারানোর সম্পর্ক রয়েছে। কিন্তু সমস্যাকে শুধু ‘বেপরোয়া তরুণ’ দিয়ে ব্যাখ্যা করলে আমরা মূল জায়গাটি এড়িয়ে যাব। একজন চালক কেন বেপরোয়া হন; কেন গতি তাঁর কাছে দক্ষতার পরিচয় হয়ে ওঠে; কেন আইন অমান্য করেও পার পাওয়ার সংস্কৃতি তৈরি হয়– সেসব প্রশ্নও করতে হবে।
আমাদের সামাজিক পরিবেশে গতি ক্রমেই এক ধরনের প্রদর্শনীতে পরিণত হয়েছে। সামাজিক মাধ্যমে দ্রুতগতির ভিডিও, বাইক শো-অফ, রাজনৈতিক কর্মসূচিতে মোটরসাইকেলের বহর এবং নানা ধরনের গতিনির্ভর প্রচারণা তরুণদের মানসিকতায় প্রভাব ফেলে। যে বয়সে নিরাপদ চালনার অভ্যাস তৈরি হওয়ার কথা, সে বয়সেই যদি গতি ও ঝুঁকিকে সাহসের মাপকাঠি হিসেবে শেখানো হয়, তাহলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়বেই।

এখানে পরিবারের ভূমিকাও অস্বীকার করা যায় না। সন্তানকে মোটরসাইকেল কিনে দেওয়া এখন অনেক পরিবারের কাছে আর্থিক সক্ষমতার প্রকাশ। কিন্তু চাবি তুলে দেওয়ার সঙ্গে দায়িত্ববোধও তুলে দেওয়া হচ্ছে কি? রাষ্ট্রের দায় আরও স্পষ্ট। লাইসেন্স প্রদান ও নবায়ন প্রক্রিয়া কতটা কার্যকর; চালকের প্রকৃত দক্ষতা কতটা যাচাই করা হয়; বয়স যাচাই কতটা নির্ভরযোগ্য; সড়কে গতি নিয়ন্ত্রণে প্রযুক্তির ব্যবহার কতটা বিস্তৃত– এসব প্রশ্নের উত্তরেই বোঝা যায় আমাদের সড়ক নিরাপত্তা ব্যবস্থা কতটা প্রস্তুত। আইন থাকলেই হয় না; আইন ভাঙলে শাস্তি হবে– এই নিশ্চয়তাও থাকতে হয়। আমাদের বাস্তবতায় এই জায়গাটি এখনও দুর্বল।

তবে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার দায় শুধু বাইকারের ওপর চাপিয়ে দিলে সমস্যার বড় একটি অংশ আড়ালেই থেকে যাবে।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, ৩৯.৩০ শতাংশ দুর্ঘটনা ভারী যানবাহনের ধাক্কার সঙ্গে সম্পর্কিত। পণ্যবাহী যান ও বাসের বেপরোয়া চলাচল মোটরসাইকেল আরোহীদের জন্য বিশেষ ঝুঁকি তৈরি করে। একটি মোটরসাইকেল ও একটি ভারী যানবাহনের সংঘর্ষে ভুল যারই হোক, প্রাণ হারানোর আশঙ্কা থাকে দুর্বল পক্ষটিরই। তাই ভারী যানবাহনের চালকদের লাইসেন্স, প্রশিক্ষণ, কর্মঘণ্টা, গতি এবং সড়ক আচরণের ওপর নজরদারি ছাড়া মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা কমানোর উদ্যোগ অসম্পূর্ণ। দুই চাকা আমাদের শত্রু নয়। শত্রু হলো সেই সংস্কৃতি, যেখানে গতি সাহসের পরিচয়, আর মৃত্যু যেন কেবল আরেকটি সংখ্যা।

রাসেল আহমদ: সাংবাদিক
 

আরও পড়ুন

×