ঢাকা শনিবার, ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

চারদিক

মাছে স্বয়ংসম্পূর্ণতা

মাছে স্বয়ংসম্পূর্ণতা
×

মো. মামুন হাসান

প্রকাশ: ১৬ আগস্ট ২০২৬ | ০৭:২০

| প্রিন্ট সংস্করণ

‘রুপালি মৎস্যে স্বনির্ভর দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ’ প্রতিপাদ্য নিয়ে ১৬ থেকে ৩০ আগস্ট দেশে পালিত হচ্ছে জাতীয় মৎস্য পক্ষ-২০২৬। এবারের মৎস্য পক্ষ শুধু উৎপাদনে অর্জিত সাফল্য উদযাপনের আয়োজন নয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জলজ সম্পদ সংরক্ষণ, জেলেদের জীবন-জীবিকা সুরক্ষা, নিরাপদ মাছ উৎপাদন, রপ্তানি সম্প্রসারণ এবং সুনীল অর্থনীতির সম্ভাবনা কাজে লাগানোর প্রত্যয়।
উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতার সাফল্য পেরিয়ে এখন এ খাতের সামনে নতুন লক্ষ্য– নিরাপদ, পরিবেশবান্ধব, প্রযুক্তিনির্ভর ও টেকসই সমৃদ্ধি। দেশের অভ্যন্তরীণ মুক্ত জলাশয়ের পরিমাণ প্রায় ৩৮ দশমিক ৬ লাখ হেক্টর এবং বদ্ধ জলাশয় রয়েছে ৮ দশমিক ৫ লাখ হেক্টর।

বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা ২০২৫ অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে মোট মৎস্য উৎপাদন ৫২ দশমিক ৫৫ লাখ টনে উন্নীত হয়েছে। আমাদের খাদ্যে প্রাপ্ত প্রাণিজ আমিষের প্রায় ৬০ শতাংশ জোগান দেয় মাছ। মাথাপিছু দৈনিক মাছ গ্রহণের পরিমাণ নির্ধারিত চাহিদা ৬০ গ্রাম চাহিদার বিপরীতে বৃদ্ধি পেয়ে ৬৭ দশমিক ৮০ গ্রামে উন্নীত হয়েছে। ফলে দেশের মানুষের পুষ্টি ও প্রাণিজ আমিষের চাহিদা পূরণে মৎস্য খাতের অবদান আরও দৃঢ় হয়েছে। 

উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি জলজ জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। অভ্যন্তরীণ মুক্ত জলাশয়ে ৮২৭টি অভয়াশ্রম স্থাপন করা হয়েছে। মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ১৮১ দশমিক ৬০ লাখ টাকা ব্যয়ে ৪৫৪টি অভয়াশ্রমের ব্যবস্থাপনা ও মেরামত করা হয়েছে। দেশীয় প্রজাতির মাছ ও শামুক সংরক্ষণ প্রকল্পের আওতায় স্থাপন করা হয়েছে ১২০টি প্রদর্শনী খামার ও ৩২টি অভয়াশ্রম। জলাশয় সংকোচন, দূষণ, অতিরিক্ত আহরণ ও প্রাকৃতিক আবাসস্থলের পরিবর্তনের কারণে অনেক দেশীয় মাছ অস্তিত্বের ঝুঁকিতে পড়েছে। ফলে মাছ উৎপাদনের পাশাপাশি প্রাকৃতিক প্রজননক্ষেত্র ও আবাসস্থল রক্ষা এখন মৎস্য ব্যবস্থাপনার অপরিহার্য অংশ।

বাংলাদেশের জাতীয় মাছ ইলিশ মৎস্য খাতের সাফল্যের অন্যতম প্রতীক। অতি আহরণ, নির্বিচারে জাটকা নিধন ও জলবায়ু পরিবর্তন ইলিশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। ২০০৩-০৪ সালে প্রণীত ‘হিলশা ম্যানেজমেন্ট অ্যাকশন প্ল্যান’-এর ভিত্তিতে সংরক্ষণ কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অভয়াশ্রম, নিষেধাজ্ঞা, নজরদারি, জেলেদের সহায়তা ও বিকল্প কর্মসংস্থান। 

রপ্তানিমুখী মৎস্যপণ্যের মধ্যে চিংড়ি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে চিংড়ি উৎপাদন হয়েছে ২ দশমিক ৯৯ লাখ টন এবং এসপিএফ বাগদা চিংড়ির পিএল উৎপাদন হয়েছে ১৮১ কোটি। চিংড়ি চাষে ক্লাস্টারভিত্তিক ব্যবস্থাপনা চালু করা হয়েছে। কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলায় চিংড়ি এস্টেটের জন্য মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়নসহ বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কার্যক্রম চলছে।
উপকূলীয় চিংড়ি চাষকে পরিবেশ সহনশীল করতে স্যালিনিটি ম্যাপিং, হাইড্রোলজিক্যাল সার্ভে এবং চিংড়ি খামার-সংলগ্ন ৩৪টি খাল পুনর্খননের কাজ চলছে। লক্ষ্য উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের চিংড়ির গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানো।

বাংলাদেশের মৎস্য খাতের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার বড় অংশ রয়েছে বঙ্গোপসাগরে। প্রতিবছর ৫৮ দিন সব ধরনের সামুদ্রিক মৎস্য আহরণে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করা হচ্ছে। আর.ভি. মীন সন্ধানী দিয়ে ৬২টি সমুদ্র জরিপ সম্পন্ন হয়েছে। 

বাংলাদেশের মৎস্য খাত এখন গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে। লক্ষ্য শুধু বেশি মাছ উৎপাদন নয়; লক্ষ্য নিরাপদ মাছ, সুস্থ জলজ পরিবেশ, সুরক্ষিত জেলে, আধুনিক প্রযুক্তি ও প্রতিযোগিতামূলক রপ্তানি। নদী, হাওর, বিল, প্লাবন ভূমি ও বঙ্গোপসাগরের জলজ সম্পদকে সুরক্ষিত রেখে বিজ্ঞানভিত্তিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে উৎপাদন বাড়াতে পারলে মৎস্য খাত ভবিষ্যতে খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তার পাশাপাশি কর্মসংস্থান, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির বড় চালিকাশক্তি হয়ে উঠবে।
মাছে স্বয়ংসম্পূর্ণতার অর্জনকে এবার টেকসই সমৃদ্ধিতে রূপ দেওয়াই সময়ের দাবি। রাষ্ট্র, গবেষক, উদ্যোক্তা, ব্যবসায়ী, মাছচাষি, জেলে এবং সাধারণ মানুষের সম্মিলিত ও দায়িত্বশীল অংশগ্রহণেই সে লক্ষ্য অর্জন সম্ভব।

মো. মামুন হাসান: সিনিয়র তথ্য অফিসার, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়
 

আরও পড়ুন

×