অর্থনীতি
জ্বালানি সংকট ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
সাকিব বিন আমিন
সাকিব বিন আমিন
প্রকাশ: ১৬ আগস্ট ২০২৬ | ০৭:২৩ | আপডেট: ১৬ আগস্ট ২০২৬ | ১২:৫৯
| প্রিন্ট সংস্করণ
বাংলাদেশ গত দুই দশকে অনেকটাই ‘এনার্জি অ্যাকসেস’-এর লড়াইয়ে জিতেছে। এখন তাকে ‘এনার্জি সিকিউরিটি’র লড়াইয়ে জিততে হবে। এ জন্য প্রাপ্যতা (অ্যাভেইলেবিলিটি), সাশ্রয় ক্ষমতা (অ্যাফোরডেবিলিটি), প্রযুক্তিগত উপযোগিতা (অ্যাপলিকেবিলিটি) এবং সামাজিক ও পরিবেশগত গ্রহণযোগ্যতা (অ্যাকসেপ্টিবিলিটি)– এই ৪-এ কাঠামোর সমন্বিত প্রয়োগ প্রয়োজন।
পেট্রোবাংলার তথ্য উদ্ধৃত করে ২৮ জুলাই প্রকাশিত বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে জানানো হয়, দেশীয় গ্যাসের দৈনিক গড় উৎপাদন প্রতিবছর ১৫ কোটি ঘনফুটের বেশি কমছে। ২০১৭ সালে দৈনিক দেশীয় উৎপাদন ছিল প্রায় ২৭০ কোটি ঘনফুট; বর্তমানে দেশীয় গ্যাস ও আমদানি মিলিয়েও সর্বোচ্চ প্রায় একই পরিমাণ সরবরাহ করা যায়। উপরন্তু একটি টার্মিনাল বন্ধ থাকায় সরবরাহ ৫০ কোটি ঘনফুটের নিচে নেমে গেছে। এটি নিরাপদ জ্বালানি ব্যবস্থার লক্ষণ নয়।
এই বাস্তবতায় শিল্পে নতুন গ্যাস সংযোগ সাময়িক স্থগিত রাখা বোধগম্য। তবে ডিমান্ড নোটের অর্থ পরিশোধ, ব্যাংকঋণ গ্রহণ এবং কারখানা নির্মাণে বিপুল বিনিয়োগের পরও যেসব উদ্যোক্তা উৎপাদন শুরু করতে পারছেন না, তাদের আর্থিক দায়, কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগ ঝুঁকি বিবেচনায় নিতে হবে। তাই রাজনৈতিক বা ব্যক্তিনির্ভর বিবেচনার পরিবর্তে রপ্তানি সম্ভাবনা, কর্মসংস্থান, জ্বালানি দক্ষতা, বিনিয়োগের প্রস্তুতি ও অর্থনৈতিক অবদানের ভিত্তিতে স্বচ্ছ অগ্রাধিকার তালিকা প্রণয়ন জরুরি।
স্বল্প মেয়াদে এলএনজি আমদানি অনিবার্য হলেও এটি দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি কৌশলের স্থায়ী ভিত্তি হতে পারে না। আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতায় ২০২৬ সালে বাংলাদেশকে প্রতি এমএমবিটিইউ ২০ ডলারের বেশি দামে স্পট এলএনজি কিনতে হয়েছে, যেখানে বছরের শুরুতে দাম ছিল প্রায় ১০ ডলার। এতে বোঝা যায়, আমদানি-নির্ভরতা কীভাবে ভর্তুকি, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ ও উৎপাদন ব্যয় বাড়ায়। আবার শুধু নতুন টার্মিনাল নির্মাণ করলেই সমাধান হবে না। মহেশখালী থেকে আনোয়ারা পর্যন্ত পাইপলাইনের সক্ষমতা বেশি হলেও পরবর্তী সরু পাইপলাইন সরবরাহ সীমিত করে। তাই টার্মিনালের সঙ্গে সঞ্চালন পাইপলাইন, সংরক্ষণ ব্যবস্থা, বিকল্প সরবরাহ পথ ও দুর্যোগকালীন ব্যাকআপ পরিকল্পনাও গড়ে তুলতে হবে। দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি, বহুমুখী সরবরাহকারী ও সীমিত স্পট ক্রয়ের মধ্যে ভারসাম্য জরুরি।
দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের প্রথম ভিত্তি দেশীয় গ্যাস। স্থলভাগ ও বঙ্গোপসাগরে আধুনিক সিসমিক জরিপ, অনুসন্ধান ও উন্নয়ন কূপ এবং পুরোনো ক্ষেত্রে উন্নত পুনরুদ্ধার প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে। বাপেক্সকে শুধু দায়িত্ব দিলেই হবে না; প্রয়োজনীয় অর্থ, প্রযুক্তি, দক্ষ জনবল ও আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্বের সুযোগ দিয়ে প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করতে হবে। একই সঙ্গে পুরোনো পাইপলাইন প্রতিস্থাপন, লিকেজ শনাক্তকরণ, স্মার্ট মিটার ও অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে সিস্টেম লস কমাতে হবে। নতুন গ্যাস আবিষ্কার সময়সাপেক্ষ। কিন্তু অনুসন্ধান বিলম্বিত করার মূল্য আরও বেশি।
বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতে একটি বড় বৈপরীত্য রয়েছে। গত ১৩ জুলাই পর্যন্ত ক্যাপটিভ ও নবায়নযোগ্য উৎসসহ স্থাপিত উৎপাদনক্ষমতা ছিল ৩৩ হাজার ৯২ মেগাওয়াট। অথচ সর্বোচ্চ উৎপাদন ছিল ১৭ হাজার ২০১ মেগাওয়াট। এ ব্যবধান স্পষ্ট করে– শুধু বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণই যথেষ্ট নয়; নির্ভরযোগ্য জ্বালানি সরবরাহ, শক্তিশালী সঞ্চালন ব্যবস্থা, বাস্তবসম্মত চাহিদার পূর্বাভাস এবং টেকসই আর্থিক ব্যবস্থাপনাও সমান জরুরি।
জ্বালানি নিরাপত্তা শুধু সরবরাহ বাড়ানোর বিষয় নয়; দক্ষ চাহিদা ব্যবস্থাপনাও এর অংশ। শিল্পে বাধ্যতামূলক জ্বালানি নিরীক্ষা, দক্ষ বয়লার ও মোটর, স্মার্ট মিটার, সময়ভিত্তিক ট্যারিফ এবং ভবনে জ্বালানি-সাশ্রয়ী শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা চালু করা গেলে আমদানি ও উৎপাদন ব্যয় কমবে। আগামী পাঁচ বছরে ৪-এ কাঠামোর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে সাশ্রয় ক্ষমতা। কারণ উচ্চ আমদানি ব্যয় ভর্তুকি, মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ ও শিল্পের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।
নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে পরিপূরক নয়, মূলধারার অংশ করতে হবে। শিল্প ও সরকারি ভবনে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ, ভাসমান সৌর প্রকল্প, সৌর সেচ, উপকূলীয় বায়ুবিদ্যুৎ, ব্যাটারি সংরক্ষণ এবং আঞ্চলিক জলবিদ্যুৎ বাণিজ্যকে সমন্বিতভাবে এগিয়ে নিতে হবে। নেট মিটারিং সহজ করা, আমদানি শুল্ক যৌক্তিক করা, স্রেডার সক্ষমতা বাড়ানো ও গ্রিড আধুনিকায়ন ছাড়া উচ্চাভিলাষী নবায়নযোগ্য লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়ন সম্ভব নয়।
সব শেষে প্রয়োজন সুশাসন ও সমন্বিত পরিকল্পনা। বাস্তবসম্মত অঞ্চল ও খাতভিত্তিক চাহিদার পূর্বাভাস, স্বচ্ছ ক্রয় ও চুক্তি, অব্যবহৃত উৎপাদন ক্ষমতার বিপরীতে পরিশোধিত ক্যাপাসিটি চার্জের যৌক্তিকতা, স্বাধীন পর্যালোচনা এবং শক্তিশালী বিইআরসি ছাড়া আর্থিক স্থিতিশীলতা ফিরবে না। একটি জাতীয় জ্বালানি তথ্যকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করে উৎপাদন, চাহিদা, ব্যয়, ভর্তুকি ও বড় চুক্তির নির্ভরযোগ্য তথ্য নিয়মিত প্রকাশ করা দরকার।
সাফল্য শুধু মেগাওয়াট বা সংযোগ দিয়ে নয়; নির্ভরযোগ্য সরবরাহ, সহনীয় মূল্য, শিল্পের উৎপাদনশীলতা এবং বৈশ্বিক অভিঘাত মোকাবিলার সক্ষমতা দিয়ে মাপতে হবে। লক্ষ্য হওয়া উচিত এনার্জি অ্যাকসেস থেকে এনার্জি সিকিউরিটি এবং শেষ পর্যন্ত জ্বালানি সার্বভৌমত্বের দিকে অগ্রসর হওয়া।
ড. সাকিব বিন আমিন: অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি