ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

দুর্ঘটনা

জাহাজ ভাঙা শিল্প কবে নিরাপদ হবে

জাহাজ ভাঙা শিল্প কবে নিরাপদ হবে
×

এ. এস. এম. সাইফুল্লাহ

এ. এস. এম. সাইফুল্লাহ

প্রকাশ: ১৬ আগস্ট ২০২৬ | ০৭:৩২ | আপডেট: ১৬ আগস্ট ২০২৬ | ১১:২৬

| প্রিন্ট সংস্করণ

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের একটি জাহাজ ভাঙা কারখানায় স্ক্র্যাপ জাহাজ কাটার সময় ‘বিষাক্ত গ্যাসে’ মৃত্যু হয়েছে আট শ্রমিকের। প্রায়ই ঘটে এমন হৃদয়বিদারক ঘটনা। কিছু প্রকাশিত হয় বড় কলেবরে, কিছু খবর অপ্রকাশিতই থেকে যায়।  

সীতাকুণ্ড থানায় শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডগুলোতে বলা চলে সব ধরনের জাহাজ ভাঙা হয়। এর মধ্যে রয়েছে সাধারণ কার্গো, ট্যাঙ্কার, খনিজ বহনকারী, গাড়ি বহনকারী, মাছ ধরার বিশাল আকৃতির জাহাজ। সব ধরনের জাহাজ ও তেলের ট্যাঙ্কারে থাকে তলানি, জং ও ইস্পাত, যাতে গ্যাস জমে আগুন ধরে। মাছ ধরার জাহাজে কোল্ডস্টোরে পাইপগুলো খুলতে গিয়ে গ্যাসে আক্রান্ত হয়ে মারা যায় শ্রমিক। তেলের ট্যাঙ্কারগুলোতে থাকে পেট্রোলিয়াম জাতীয় পদার্থ। এই পেট্রোলিয়ামের সঙ্গে আস্তে আস্তে গ্যাস জমা হয়। ফলে ট্যাঙ্কার কাটার সময় অগ্নিকাণ্ড ও বিস্ফোরণ ঘটে। জাহাজে তাপরোধক হিসেবে ব্যবহার করা হয় অ্যাসবেস্টস। অ্যাসবেস্টস ক্যান্সার সৃষ্টির জন্য দায়ী। জাহাজে থাকে পোড়া ও ব্যবহৃত তেল পানি, যা মাটিতে মিশে পানি ও মাটি দুই-ই দূষিত করে। কিছু ট্যাঙ্কে ফ্লোরিন, কার্বন মনোক্সাইড, কার্বন ডাই-অক্সাইড থাকতে পারে। এগুলো খুবই বিষাক্ত। কারখানা কর্তৃপক্ষ ট্যাঙ্ক গ্যাসমুক্ত না করে কাটার কারণে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে কারখানার নিরাপত্তা ব্যবস্থা খুবই দুর্বল থাকে। 

সম্প্রতি যে এলএনজিবাহী জাহাজটি কাটতে গিয়ে দুর্ঘটনা ঘটল, সেখানে কার্বন ডাই-অক্সাইড, হাইড্রোজেন সালফাইডসহ অন্যান্য গ্যাস মিলে একটা বিষাক্ত পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে। সীতাকুণ্ডের কদম রসুল এলাকায় ভয়াবহ বয়লার বিস্ফোরণে অনেক শ্রমিক ছিন্নভিন্ন হয়ে মারা গিয়েছিল এবং বিষাক্ত ধোঁয়ায় আশপাশে ভয়াবহ পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়ায় মানুষ বাড়িঘর ছেড়ে পালিয়ে গিয়েছিল।  
বাংলাদেশ ইতোমধ্যে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম জাহাজ ভাঙা দেশ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। বর্তমান বিশ্বের বৃহৎ অয়েল ট্যাঙ্কারের অধিকাংশই বাংলাদেশে আসছে ভাঙার জন্য এবং এগুলো চট্টগ্রামের উপকূলীয় অঞ্চলে ভাঙা হচ্ছে। 

এ শিল্প থেকে বাংলাদেশ সরকার আমদানি কর, স্থানীয় পর্যায়ে রাজস্ব, বেলাভূমি থেকে কর বাবদ বিশাল অর্থ পাচ্ছে এবং কিছু যন্ত্রপাতি পুনঃরপ্তানি করে বৈদেশিক মুদ্রা আয় করছে। বৃহৎ জনসংখ্যার দেশ হিসেবে লাখ লাখ লোক এ শিল্প থেকে সরাসরি লাভবান হচ্ছে। এসব ইতিবাচক দিক থাকার পরও এ শিল্প প্রাণ-প্রকৃতির জন্য হুমকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। 
এখানে বেশির ভাগ শ্রমিক আসে দেশের উত্তরাঞ্চল থেকে, যাদের নিজ এলাকায় তেমন কর্মসংস্থান নেই। এই শ্রমিকদের মজুরিও খুব কম। যারা দক্ষতা অর্জন করে তাদের মজুরি একটু বেশি। তবে শ্রমিকরা এ কাজের ঝুঁকির দিকগুলো সম্পর্কে অবগত নয়। ফৌজদারহাট থেকে বাড়বকুণ্ড পর্যন্ত দীর্ঘ এলাকাজুড়ে ইয়ার্ডগুলোতে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটছে। আহত হচ্ছে অনেকেই। কেউ হয়তো সারাজীবনের জন্য পঙ্গু হয়েছে। এদের জন্য ক্ষতিপূরণের কোনো ব্যবস্থা আছে বলে শ্রমিকদের কাছে জানা যায়নি। ২০০৩ সালে আমরা জাহাজ ভাঙার স্বাস্থ্য সুবিধা দিতে স্বাস্থ্য ক্যাম্পের আয়োজন করেছিলাম। সেখানে দেখা যায় অধিকাংশ শ্রমিক চোখের রোগ, চর্মরোগসহ নানা রোগে আক্রান্ত, যেগুলোর অধিকাংশই তাদের কাজের ক্ষেত্র থেকে পাওয়া।   

জাহাজ ভাঙার কাজে শ্রমিক নিয়োগ হয় দৈনিক ভিত্তিতে এবং এটা এখন নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। এতে সুবিধা হয়েছে মালিকপক্ষের। তাদের দাপটও একচেটিয়া। এখানে শ্রমিকের অধিকাংশের বয়স ১৮ থেকে ৩৭ বছর। শ্রমিকদের ১৫ থেকে ২৫ জনের দলের দায়িত্বে থাকে ‘মাঝি’। তিন-চারজন মাঝির দল বা ৫০ থেকে ৬০ জন শ্রমিকের নেতৃত্বে থাকে ‘ফোরম্যান’। ফোরম্যানসহ পুরো শ্রমিক দলের নেতৃত্বে থাকে কন্ট্রাক্টর। এরাই চুক্তিভিত্তিক শ্রমিক নিয়োগ করে। মূলত শ্রমিকরা যে মজুরি পায় তার একটা অংশ মাঝি আর ফোরম্যানদের কাছেই চলে যায়। 

একটি জাহাজ ভাঙার সময় ফিটার গ্রুপ বা মেশিনারিজ খোলার শ্রমিক থাকে ৩০-৩৫ জন। এ কাজে ১২ জন কর্টারম্যানকে সাহায্য করে আরও ২৪ জন শ্রমিক। প্লেট ক্যারিয়ার ভারী গ্রুপে ১৫-২০ শ্রমিক কাজ করে। প্লেট ক্যারিয়ার হালকা গ্রুপে মূলত কিশোর শ্রমিক কাজ করে। ওয়্যার গ্রুপ বা উইনসের মাধ্যমে ভারী কিছু টানার কাজে নিয়োজিত থাকে ২০-৩০ জন শ্রমিক। শ্রমিকদের এখানে কঠিন ঝুঁকিপূর্ণ কায়িক শ্রম দিতে হয়। ৩৫০ কেজি থেকে ৬০০ কেজি ওজনের একটি প্লেট ১৫ থেকে ২০ জনে বহন করে নিয়ে যায় ১০০-১৫০ ফুট দূরে ট্রাক পর্যন্ত। হালকা প্লেটের ওজনও একেবারে কম নয়। ১০০-১১৫ কেজি ওজনের প্লেট তৈলাক্ত হওয়ায় বা অসতর্কতার কারণে কাঁধ থেকে প্লেট পড়ে গিয়ে প্রায় সময়ই শ্রমিক আহত হয়। হাত-পা কাটা পড়ে ভেঙে যায়। 

জাহাজে পোড়া ও ব্যবহৃত তেল প্রচুর পরিমাণে জমা থাকে, যা জাহাজ ভাঙার কর্মকাণ্ডের ফলে উপকূলীয় অঞ্চলের পানিতে ছড়িয়ে পড়ে। ফলে পানি ভীষণভাবে দূষিত হয়। তেলের আস্তরণ বায়ু ও সমুদ্রের মধ্যে অক্সিজেন ও কার্বন ডাই-অক্সাইডের বিনিময়ে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। উপকূলে নিঃসরিত বর্জ্যের পরিমাণ ও গুণগত মান পরিমাপ হয় না বললেই চলে। 
জাহাজ ভাঙা কর্মকাণ্ড স্টিল ও রিরোলিং কারখানার কাঁচামালের সরবরাহ ঠিক রাখলেও এটিকে শ্রমিক ও পরিবেশের জন্য নিরাপদ করার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সবাই যেন নীরব। জাহাজ ভাঙা কর্মকাণ্ডকে শুধু আয়ের উৎস নয়; বরং এর সঙ্গে জড়িত শ্রমিকদের জন্য নিরাপদ ও পরিবেশসম্মত করে তোলা প্রয়োজন।
 
ড. এ. এস. এম. সাইফুল্লাহ: অধ্যাপক, এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স অ্যান্ড রিসোর্স
ম্যানেজমেন্ট বিভাগ, মাওলানা ভাসানী
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected] 
 

আরও পড়ুন

×